ভাষার মাস

সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনে অঙ্গীকার আছে, অগ্রগতি নেই

প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২২ । ০৩:২৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

কামরুল হাসান খান

আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আছে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, আছে সুদীর্ঘ ২৩ বছরের সংগ্রামের-ত্যাগের ও বিজয়ের ইতিহাস। সঠিক ইতিহাস প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত করা আমাদের কর্তব্য এবং দায়িত্ব। পূর্বপুরুষের মাতৃভূমির জন্য ত্যাগের ইতিহাস থেকে দেশপ্রেম জাগে আর দেশপ্রেমহীন কোনো জাতি এগোতে পারে না, দেশের কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। এ লক্ষ্য সামনে নিয়ে আমরা ১৯৯১ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের শিক্ষক সমিতি, ডক্টরস ফোরাম এবং ছাত্র সংসদ সমন্বয়ে গঠিত একুশে উদযাপন কমিটির মাধ্যমে 'ভাষাসৈনিক সমাবেশ'-এর আয়োজন করেছিলাম। অধ্যাপক একেএম আব্দুস সালামকে আহ্বায়ক এবং আমাকে ঢামেক শিক্ষক সমিতির সদস্য সচিব করে শিক্ষক, চিকিৎসক এবং ছাত্রদের সমন্বয়ে একুশে উদযাপন কমিটি গঠন করা হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল, নতুন প্রজন্মের কাছে ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য তুলে ধরা।

আমরা মাসখানেক সময় নিয়ে ব্যাপক প্রচার করেছিলাম, আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম ভাষাসৈনিকদের পাশাপাশি দেশের সুধীজনদের। দু-একজন ভাষাসৈনিক বাদে সেদিন সবাই ঢাকা মেডিকেল চত্বরে এসেছিলেন। এসেছিলেন ছাত্রসহ সব বয়সের মানুষ। নতুন প্রজন্মের ছাত্রদের উৎসাহিত করার জন্য আমরা বিশেষ প্রচারের আয়োজন করেছিলাম। ক্লাসে ক্লাসে গিয়ে তাদের উদ্বুদ্ধ করা হয়েছিল অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য। ছাপানো হয়েছিল পোস্টার, স্মরণিকা। বিশাল প্যান্ডেল দিয়ে সাজানো হয়েছিল কলেজের ভেতরের ঐতিহাসিক চত্বর।

১৯৫২ সালের পর এত ভাষাসৈনিকদের সমাবেশ আর কখনও হয়নি- এই ছিল উপস্থিত ভাষাসৈনিকদের ভাষ্য। সেদিন আমরা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক দৃষ্টান্ত তৈরি করার চেষ্টা করেছিলাম। নানা বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ করা হয়েছিল অনুষ্ঠানটি। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় কবি বেগম সুফিয়া কামাল। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা অধ্যাপক এম এ মাজেদ, বায়ান্নর শহীদ শফিউরের স্ত্রী আকলিমা খাতুন, শহীদজননী জাহানারা ইমাম, নব্বইয়ের শহীদ ডা. মিলনের মা সেলিনা আখতার। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছিলেন ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গাজীউল হক, বদরুদ্দীন উমর, ড. আনিসুজ্জামান, কবি শামসুর রাহমান, আমেরিকা প্রবাসী চিকিৎসক আলমগীর, বায়ান্নর ঢামেক ছাত্র সংসদের জিএস ডা. শারফুদ্দিন প্রমুখ। সভাপতিত্ব করেছিলেন ভাষাসৈনিক অধ্যাপক একেএম আব্দুস সালাম। কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন অভিনেত্রী ডা. তামান্না, শমী কায়সার ও ডা. মনজুর। ভাষাসৈনিক, বরেণ্য চিকিৎসক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী ও সাহিত্যিকদের উপস্থিতিতে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে মেডিকেল চত্বর। আলোচনায় সব বক্তাই '৫২ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। সেদিন কলেজের অ্যানাটমি বিভাগের পাশে উদ্বোধন করা হয়েছিল ভাষা আন্দোলন জাদুঘর। ঐতিহাসিক আমতলায় নতুন করে রোপণ করা হয়েছিল মৃত সেই আমগাছের স্থলে নতুন আমের চারা।

ওই সমাবেশে যা দাবি করা হয়েছিল- কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশে ভাষা আন্দোলন জাদুঘর স্থাপন, সর্বস্তরে বাংলা চালুর জন্য বাস্তবভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ, ভাষা আন্দোলনের বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস রচনার প্রকল্প গ্রহণ। আমরা ১৯৯১ সালে এ দাবিগুলো সরকারের কাছে উত্থাপন করেছিলাম। কিন্তু সেই দাবির অনেক কিছুই এখনও পূরণ হয়নি। স্বাধীনতার পর ইতোমধ্যে কেটে গেছে ৫০ বছরেরও বেশি সময়। আর ভাষা আন্দোলনের পর সাত দশকেরও বেশি সময়। এমন প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন জাগে, এতদিনেও বায়ান্নর যে অঙ্গীকার-প্রত্যয় ছিল তা আমরা কতটা বাস্তবায়ন করতে পেরেছি। আরও প্রশ্ন, আমরা তা মর্মেই-বা কতটা নিতে সক্ষম হয়েছি? উত্তর অনেক ক্ষেত্রেই নয়, প্রীতিকর। আমাদের উন্নয়ন-অগ্রগতি অনেক হয়েছে তা মোটেও অসত্য নয়। কিন্তু জাতিসত্তার বিকাশে আমাদের করণীয় আছে আরও অনেক কিছু তা যেন আমরা ভুলে না যাই।


১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন সরকারের আদেশ অমান্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু ছাত্র ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী মিলে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেন। ছাত্ররা একুশে ফেব্রুয়ারি সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্টস বিল্ডিং প্রাঙ্গণে ঐতিহাসিক আমতলায় জমায়েত হয়ে সিদ্ধান্ত নেন, যে কোনো মূল্যে ১৪৪ ধারা ভাঙতে হবে। সেই অঙ্গীকারের সূত্রে ১০ জন করে গ্রুপ হয়ে মিছিল করে ছাত্রছাত্রীরা ১৪৪ ধারা ভাঙার পরিকল্পনা করেন। পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে দুপুর ১২টা নাগাদ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে জমায়েত হন। ছাত্ররাই ছিলেন বেশি সেখানে। ছাত্রদের চেষ্টা ছিল পরিষদ ভবনের সামনে যাওয়া এবং ভবনটি ঘেরাও করা। লক্ষ্য ছিল পরিষদ প্রস্তাব নেবে বাংলা ভাষার পক্ষে এবং সেটা গণপরিষদে পাস করাবেন। কিন্তু ওই পর্যন্ত যাওয়া গেল না, পুলিশের শক্ত ব্যারিকেড, প্রবল লাঠিচার্জ এবং টিয়ার গ্যাসের কারণে। বিকেল ৩.২০ মিনিটে সরকারি নির্দেশে পুলিশ ২৬ রাউন্ড গুলি, মূলত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে জমায়েতের দিকে লক্ষ্য করে ছোড়ে এবং হোস্টেলের উল্টো দিকে রাস্তার ওপরে পুলিশ গুলি ছোড়ে। মিছিলটি ঢাকা মেডিকেল কলেজের কাছাকাছি এলে পুলিশ ১৪৪ ধারা অবমাননার অজুহাতে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করে। শহীদ হন রফিক, সালাম, বরকত ও আব্দুল জব্বারসহ আরও অনেকে। এ ছাড়া ১৭ জন ছাত্র-যুবক আহত হন। শহীদদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়ে ওঠে।

শোকাবহ এ ঘটনার অভিঘাতে সমগ্র পূর্ব বাংলায় তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ২১ ফেব্রুয়ারির ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে সারাদেশে বিদ্রোহের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্র, শ্রমিক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক ও সাধারণ জনতা পূর্ণ হরতাল পালন করেন এবং সভা-শোভাযাত্রা সহকারে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেন। ২২ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে শহীদ হন শফিউর রহমান শফিক, রিকশাচালক আউয়াল এবং অলিউল্লাহ নামে এক কিশোর। ২৩ ফেব্রুয়ারি ফুলবাড়িয়ায় ছাত্র-জনতার মিছিলেও পুলিশ নিপীড়ন চালায়। ভাষা আন্দোলনের শহীদ স্মৃতিকে অম্লান করে রাখার জন্য মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে রাতারাতি মেডিকেল ছাত্রদের উদ্যোগে গড়ে ওঠে শহীদ মিনার। ২৪ ফেব্রুয়ারি এর উদ্বোধন করেন শহীদ শফিউর রহমানের বাবা। ২৬ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে শহীদ মিনারের উদ্বোধন করেন দৈনিক আজাদ পত্রিকার সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন। ক্রমবর্ধমান গণআন্দোলনের মুখে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার শেষ পর্যন্ত নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয় এবং ১৯৫৪ সালের ৭ মে পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গৃহীত হয়। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রণীত হলে ২১৪ নং অনুচ্ছেদে বাংলা ও উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এত ত্যাগের বিনিময়ে আমাদের মায়ের ভাষার অর্জিত অধিকার এখনও সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর জন্য স্বাধীনতার পর থেকেই নানা সরকারি আদেশ রয়েছে; কিন্তু কার্যকরী কতটা হয়েছে, সেটা খতিয়ে দেখা দরকার। কেন বাস্তবায়ন হচ্ছে না আদেশ এ বিষয়গুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। পদ্মা-মেঘনা-যমুনা যেমন আমদের ঠিকানা, তেমনি ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত ২৪ বছর আমাদের আন্দোলন-সংগ্রাম-ত্যাগ-সংস্কৃতি-সফলতা আমাদের স্বাধীনতার ঠিকানা। '৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে কীভাবে আমরা ধাপে ধাপে মুক্তিযুদ্ধে পৌঁছে গেলাম এবং স্বাধীনতা অর্জন করলাম এর পুরো ইতিহাস নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দিতে হবে, যার ভিত্তিতে তারা এগিয়ে নিয়ে যাবে আগামীর বাংলাদেশ। আমরা ফের দাবি জানাই- সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর কার্যকরী পদক্ষেপ চাই, ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস একটি প্রকল্পের মাধ্যমে দ্রুত প্রকাশ করতে হবে, সরকারের পাশাপাশি সচেতন জনগণকে এসব বিষয়ে উদ্যোগী ও সহযোগী ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে, নানা সভা-সমাবেশ-আলোচনার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতার ইতিহাস তুলে ধরতে হবে এবং আমাদের সবাইকে অবশ্যই বাংলা ভাষা সর্বস্তরে চালুর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলনে অঙ্গীকার থাকলেও অগ্রগতি হতাশাজনক। এর নিরসন ঘটিয়ে প্রত্যয়ের বাস্তবায়ন করতেই হবে।

অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com