প্রাক-বাজেট আলোচনায় অর্থনীতিবিদরা

করের হার কমিয়ে আওতা বাড়াতে হবে

প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২২ । ১০:৫৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

সমকাল প্রতিবেদক

রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াতে সবক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু এবং নতুন নতুন খাতকে করের আওতায় আনার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রচুর বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। ফলে বিনিয়োগ উদ্বুদ্ধ করতে করহার কমানো দরকার। অন্যদিকে উন্নয়ন চাহিদা পূরণে সরকারের রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াতে হবে। এ অবস্থায় কর ফাঁকি বন্ধ এবং করের আওতা বাড়ানোতেই জোর দেওয়া দরকার।

গতকাল বুধবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট আলোচনায় তারা এসব কথা বলেন। এতে অর্থনীতিবিদদের সংগঠন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি, সরকারি গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস), বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি), পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) এবং পরামর্শক প্রতিষ্ঠান পিডব্লিউসি ও স্নেহাশীষ অ্যান্ড মাহমুদের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এনবিআর প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় সংস্থাটির সদস্য (কাস্টমস নীতি) মো. মাসুদ সাদিক সভাপতিত্ব করেন। এ সময় সদস্য (আয়কর নীতি) সামস উদ্দিন আহমেদ, সদস্য (ভ্যাট নীতি) জাকিয়া সুলতানাসহ অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

পিআরআইর পক্ষে প্রস্তাব তুলে ধরেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, শিগগির বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হবে। এতে রপ্তানিতে অনেক সুযোগ-সুবিধা থাকবে না। ওই সময়ে অনেক খাতকে কর সুবিধা দিয়ে টিকিয়ে রাখতে হবে। ওই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।

তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের করপোরেট করহার প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বেশি। করপোরেট কর কমানো না হলে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে না। তিনি আরও বলেন, কর সংগ্রহ পদ্ধতি স্বয়ংক্রিয় করতে হবে। রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থাপনায় লোকবল বাড়াতে হবে। এ সময় তিনি গণহারে ভর্তুকি না দিয়ে এটি যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার পরামর্শও দেন।

অর্থনীতি সমিতির প্রস্তাব তুলে ধরেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মো. আইনুল ইসলাম। তিনি বলেন, দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষকে করের বোঝা থেকে রেহাই দিতে হবে। ধনীদের থেকে কর নিতে হবে। অনেকে সম্পদ, আয়, মুনাফা কম দেখান। এনবিআরকে এই ফাঁকি বন্ধের উদ্যোগ নিতে হবে। পরোক্ষ কর কমিয়ে প্রত্যক্ষ কর বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব করেন তিনি।

অর্থনীতি সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ড. জামালউদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিগুলোর লাইসেন্স নবায়ন ফি পর্যন্ত নেওয়া হয় না। অন্য অনেক ধরনের ছাড় রয়েছে বড় বড় ব্যবসায়। এই ছাড়ের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার প্রস্তাব করেন তিনি। পাশাপাশি ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিগুলোর ওপর টার্নওভার কর বসানোর পরামর্শ দেন।

বিআইডিএসের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. মোহাম্মদ ইউনুস বলেন, ৭০ লাখ টিআইএনধারী থাকলেও রিটার্ন দাখিল করছেন মাত্র ২৪ লাখের মতো। বাকিরা কেন কর দিচ্ছেন না, তা নিয়ে গবেষণা হওয়া দরকার। করের বিষয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সবক্ষেত্রে সমানভাবে হওয়া উচিত। কারণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে কর হারানোর অনেক উদাহরণ রয়েছে। এ সময় তিনি বলেন, গাজীপুরের হোল্ডিং ট্যাক্স ঢাকার গুলশানের চেয়ে বেশি। এটা কোনোভাবেই যৌক্তিক না।

সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট মুনতাসির কামাল বলেন, কর ব্যবস্থা শুধু আর্থিক বিবেচনায় হলে হবে না। সামাজিক বিবেচনায়ও হতে হবে। ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলের ফিসের ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট রয়েছে, যা ন্যায়সংগত নয়। তিনি এই ভ্যাট প্রত্যাহারের সুপারিশ করেন। পাশাপাশি সিগারেটের কর দাম বা স্লাবের ভিত্তিতে নির্ধারণের পরিবর্তে শলাকা ভিত্তিতে নির্ধারণের প্রস্তাব করেন। তিনি বলেন, প্রতি ১০ শলাকার প্যাকেটে ১০০ টাকা কর ধরা যেতে পারে। বর্তমানে চারটি স্ল্যাব করে কর নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রতি বছর তামাক ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে, কম দামের সিগারেটে আসক্ত লোকের সংখ্যা বাড়ছে।

সিপিডির আরেক সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট সৈয়দ ইউসুফ সাদাত বলেন, করমুক্ত ব্যক্তির আয়সীমা তিন লাখ থেকে বাড়িয়ে সাড়ে তিন লাখ টাকা করা দরকার। তিনি নিত্যপণ্যের আমদানি কর কমানোরও প্রস্তাব করেন। পাশাপাশি কালো টাকা সাদা করার সুযোগ না দেওয়া এবং ট্রান্সফার প্রাইসিং কার্যকর করার সুপারিশ করেন।

পিডব্লিউসির ম্যানেজিং পার্টনার মামুন রশিদ বলেন, আন্তর্জাতিক পরামর্শক সংস্থার কাছ থেকে ৪৩ দশমিক ৭ শতাংশ হারে কর নেওয়া হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে আসার উৎসাহ পায় না। তাই এই কর কমানো প্রয়োজন।

স্নেহাশীষ অ্যান্ড মাহমুদ কোম্পানির ম্যানেজিং পার্টনার স্নেহাশীষ বড়ূয়া বলেন, সিটি করপোরেশনগুলোতে হোল্ডিং ট্যাক্সের সঙ্গে টিআইএন বাধ্যতামূলক করা দরকার।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com