চারদিক

'পল্লি সমাজসেবা' মডেল

প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২২ । ০১:২২ | প্রিন্ট সংস্করণ

শেখ রফিকুল ইসলাম

স্বাধীনতা-উত্তরকালে ১৯৭৪ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার প্রবর্তিত রুরাল সোশ্যাল সার্ভিসেস (আরএসএস) বা পল্লি সমাজসেবা নামক ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম শুরু করে, যা ছিল একটি যুগোপযোগী ও যুগান্তকারী পল্লি উন্নয়ন মডেল। এই মডেলে কোনো গ্রামের নির্দিষ্ট সংখ্যক ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত কোনো দলকে ঋণ দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে সুদ নেওয়া হয় না, তবে ১০ শতাংশ হারে সার্ভিস চার্জ নেওয়া হয় এবং এ বাবদ গৃহীত অর্থ কখনও সরকার নেয় না। এ অর্থ গ্রাম্য তহবিল হিসেবে গ্রামে থেকে যায়। এভাবে সবার কাছ থেকে গৃহীত সার্ভিস চার্জ যখন মূল অর্থ বা যে পরিমাণ অর্থ ঋণ দেওয়া তার দ্বিগুণ হয়, তখন মূল টাকা অন্য কোনো গ্রামে স্থানান্তর করা হয়। আরএসএস মডেলে বছরের পর বছর ধরে জমাকৃত সার্ভিস চার্জের অর্থ ওই গ্রাম থেকে স্থানান্তর করা যাবে না, কোনো একজন বা সবাই একসঙ্গেও এ টাকা ভাগ করে নিতে পারবেন না। এই অর্থ ওই গ্রামের স্থায়ী পুঁজি হিসেবে থাকবে। কোনো দলে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন, সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে পারে। শুধু পুরুষ নন, নারী-পুরুষ উভয়ে এ দলের সদস্য হতে পারেন। এমনকি সদস্যদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি বিষয়ে সচেতন এবং বাল্যবিয়ের কুফল ও নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি সম্পর্কে সচেতন করা আরএসএস নীতিমালার অন্তর্ভুক্ত। শুধু তাই নয়, সদস্যদের বিভিন্ন কর্মমুখী প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিষয়ও উল্লেখ আছে।

১৯৭৪ সাল থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত এ খাতে মোট বরাদ্দ সাড়ে পাঁচশ কোটি টাকা। মোট দল সংখ্যা এক লাখ ২০ হাজার প্রায়। ৩৩ লক্ষাধিক পরিবার এর উপকারভোগী। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা পরিষদ কর্তৃক ২০১৮ সালে পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী আরএসএস ক্ষুদ্রঋণ সম্পর্কে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী অধিকাংশ ঋণগ্রহীতা যে উদ্দেশ্যে ঋণ গ্রহণ করেন, সে উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ করেন। এই ঋণ ব্যবহারের ফলে মানুষের অবস্থার উন্নতি ঘটেছে। যদিও প্রান্তিক এবং অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য আরও অধিক সহযোগিতা প্রয়োজন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ৭৬ শতাংশ মানুষ পল্লী এলাকায় বসবাস করে। ২০২০ সালে বিশ্বব্যাংকের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী ৬২ শতাংশ মানুষ পল্লী এলাকায় বসবাস করে।

আরএসএসের আওতায় প্রদত্ত ঋণ ছাড়া সব ক্ষেত্রে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের ঘাম ঝরানো আয়ের একটি বড় অংশ সুদ আকারে চলে যাচ্ছে। আরএসএসের ঋণ বাবদ দেয় ১০ শতাংশ সার্ভিস চার্জ দলীয়/গ্রাম্য/কমিউনিটি পুঁজি হিসেবে স্থায়ীভাবে গ্রামে থেকে যায়। এই পদ্ধতির সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ দিক বা রক্ষাকবজ হলো, ঘূর্ণায়মান সার্ভিজ চার্জ একীভূত হয়ে গ্রাম্য স্থায়ী পুঁজি হিসেবে/তহবিল হিসেবে জমা হচ্ছে। সব সদস্য মিলিতভাবেও এ অর্থ ভাগ করে নিতে পারবেন না বা নষ্ট করতে পারবেন না। কারণ, অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার সম্মতি প্রয়োজন এবং নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে এ তহবিল ব্যবহার করতে হবে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের মানসম্মত ও প্রয়োজনীয় জনবলের অভাব, যথাযথ মনিটরিংয়ের ঘাটতি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর্মচারীদের গাফিলতির কারণে দেশের সব অঞ্চলে ক্ষেতলালের মতো উদাহরণ সৃষ্টি হয়নি। তা ছাড়া বর্তমান পরিস্থিতিতে বাস্তবতার নিরিখে ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি করা, সার্ভিস চার্জ ১০ থেকে কমিয়ে ৮ শতাংশ করা এবং প্রশিক্ষণের ধরনে পরিবর্তনসহ ঋণ বিতরণ ও আদায়ে নীতিমালায় পরিবর্তন আনা দরকার।

এ কথা নির্দি্বধায় বলা যায়, পল্লি এলাকায় বসবাসরত দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষকে অতিরিক্ত সুদের কবল থেকে রক্ষা ও তাদের উন্নয়নের জন্য আরএসএস একটি অদ্বিতীয় ও অতুলনীয় পদ্ধতি। আরও কঠিন সত্য হচ্ছে, বর্তমান চলমান ঋণ প্রক্রিয়ার দুষ্টচক্র জিইয়ে রেখে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পরিত্রাণ ও উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই আরএসএস খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, ঋণের পরিমাণ, বিতরণ, প্রশিক্ষণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে সময়ের প্রয়োজনীয়তার নিরিখে পরিবর্তন আনা দরকার। একই সঙ্গে দরকার দক্ষ জনবল ও ঋণের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট কর্মচারীদের কর্মমূল্যায়নও। একই সঙ্গে জরুরি মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা।

মহাপরিচালক, সমাজসেবা অধিদপ্তর

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com