সাক্ষাৎকার: আসিফ নজরুল

'১৪ বা '১৮ সালের চেয়ে ভিন্ন কৌশল নেবে আওয়ামী লীগ

প্রকাশ: ০৯ মার্চ ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ০৯ মার্চ ২২ । ১২:০৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাশেদ মেহেদী

আসিফ নজরুল। কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক। বর্তমানে বিভাগটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। বিভিন্ন সময়ে নানা মাধ্যমে তার বক্তব্য ও লেখা আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। তার অভিমত, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনীতির গুণগত পার্থক্য এখন করা যায় না। সমকালের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন থেকে শুরু করে পরবর্তী সংসদ নির্বাচন, দেশের রাজনৈতিক বিবর্তন ও বিদ্যমান পরিস্থিতি নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাশেদ মেহেদী

সমকাল :নির্বাচন কমিশন গঠনে নতুন আইন হয়েছে। অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে কমিশনও গঠিত হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?

আসিফ নজরুল :আসলে এ আইন নতুন কিছুই নয়। আগে যে সার্চ কমিটি গঠন করা হতো, সেটিকে একটি আইনের মোড়কে আনা হয়েছে। দেখুন, অনুসন্ধান কমিটিতে এমনও ব্যক্তি ছিলেন, যিনি এক সময় আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চেয়েছেন। মূলত, আওয়ামী লীগপন্থি হিসেবে পরিচিতদের দিয়েই অনুসন্ধান কমিটি হয়। সেটিও না হয় মেনে নিলাম। তার পরের প্রক্রিয়া আরও প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ, এবার অনুসন্ধান কমিটির কাছে বিএনপি কোনো নাম দেয়নি। এর আগের বার তারা দিয়েছিল। ফলে মাহবুব তালুকদারের মতো অন্তত একজন নির্বাচন কমিশনার পাওয়া গিয়েছিল, এবার সেটাও হয়নি। এবার আওয়ামী লীগ আরও একটি কৌশল নিয়েছে। নিজেদের জোটের খুব ছোট ছোট শরিক দল, যেমন তরীকত ফেডারেশন- এ ধরনের দলগুলো দিয়ে তাদের পছন্দের নাম অনুসন্ধান কমিটিকে দিয়েছে। ফলে আইন যাই হোক, নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের পুরোনো কৌশলেই গঠন করা হয়েছে।



সমকাল :এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে আগামী জাতীয় নির্বাচন কেমন হতে পারে?

আসিফ নজরুল :আমি একটু ভিন্নভাবে বলতে চাই। আমার দেখা মতে, ১৯৯১ সালে বিচারপতি আব্দুর রউফের অধীনে যে নির্বাচন হয়েছিল, সেটিই ছিল এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভালো নির্বাচন। ১৯৯১ সালে ওই নির্বাচন কমিশন খুব ভালো নির্বাচন করল। কিন্তু ১৯৯৪ সালে একই নির্বাচন কমিশন মাগুরা উপনির্বাচনে বড় কেলেঙ্কারির জন্ম দিল। কেন? কারণ, ১৯৯১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় ছিল। ১৯৯৪ সালে দলীয় সরকার ক্ষমতায় ছিল। আবার ১৯৯৬ সালে আবু হেনা কমিশন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন খুব সফলভাবে করেছিল। এই কমিশনই পরে টাঙ্গাইলের উপনির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করতে পারেনি। এই উদাহরণগুলো দিলাম, কারণ এটা বারবার প্রমাণিত, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি, হবেও না। এ জন্যই বলতে চাচ্ছি, যে নির্বাচন কমিশন গঠন হয়েছে, তাদের অধীনেও অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতে পারে, যদি নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়। এমনকি এর আগে যে বহুল বিতর্কিত নূরুল হুদা কমিশন ছিল, তারাও হয়তো খুব ভালো নির্বাচন করতে পারত, যদি নির্বাচনটা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে হতো। আর বাংলাদেশে নিরপেক্ষ সরকার বলতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকেই বোঝায়।

সমকাল :আপনার কথায় এটা পরিস্কার যে, ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের পর তিন জোটের যে রূপরেখা ছিল, সেটা মাগুরা উপনির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপিই ভেঙেছিল...।

আসিফ নজরুল :অবশ্যই। ১৯৯৪ সালে মাগুরা উপনির্বাচনে বিএনপির হস্তক্ষেপ করার কোনো দরকারই ছিল না। তারা সেটি করেছে এবং অবশ্যই সেটি তিন জোটের রূপরেখার পরিপন্থি। এ দায় বিএনপিকে নিতেই হবে। তিন জোটের রূপরেখায় কিন্তু গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, বেতার-টিভির স্বায়ত্তশাসন এসবও ছিল। এগুলোরও কোনোটি এখন পর্যন্ত অর্জিত হয়নি।

সমকাল :১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনও বিএনপি করেছিল, সেই সাদেক আলী কমিশনের নির্বাচন...।

আসিফ নজরুল :আমি অবশ্য ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনকে একটু ভিন্নভাবে দেখি। তখন বিরোধী দলগুলোর কাছ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের দাবি উঠেছিল। সে দাবি পূরণ করতে জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিকল্প ছিল না। দেখুন, সে সময় বিএনপি ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সরকার গঠনের পর কিন্তু প্রতিশ্রুতি রেখেছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আইন পাস করেই সংসদ ভেঙে দিয়ে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে। কিন্তু ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগ প্রতিশ্রুতি রাখেনি। তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে সেই ব্যবস্থাই বাতিল করেছে। ২০১৪ সালে যখন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন হলো, তখনও আওয়ামী লীগ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, এক বছরের মধ্যেই সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করবে। আওয়ামী লীগ সে প্রতিশ্রুতিও রাখেনি। বরং ২০১৮ সালে আরও বাজে নির্বাচনের দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে।

সমকাল :কিন্তু একটা কথা তো থেকেই যায়, বিএনপি রাজনীতিতে অবিশ্বাস তৈরি না করলে হয়তো পরবর্তী পরিস্থিতিগুলোর সৃষ্টি হতো না।

আসিফ নজরুল :ধরুন সেটিও মেনে নিচ্ছি, বিএনপি অবিশ্বাসের রাজনীতি শুরু করেছে। ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এসে বিএনপি তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী সরকার পরিচালনা করতে পারেনি। কিন্তু সেটি সামনে এনে আওয়ামী লীগের দুঃশাসনকে কি আড়ালে নিয়ে যাব? সেটি হতে পারে না। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া দল; বঙ্গবন্ধু যে দলের নেতা হিসেবে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করেছিলেন, জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়ে গেছেন সবসময়। সেই আওয়ামী লীগের চেহারা এখন কী! বিএনপি কিংবা জাতীয় পার্টির সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো পার্থক্য কি করা যায়? একটা পার্থক্য বলতে পারেন, আওয়ামী লীগ মুখে খুব সুন্দর করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলে। বাস্তবে আওয়ামী লীগ আমলেই সুবিধাভোগী কয়েকজন ছাড়া সাধারণ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ বেশি খারাপ থেকেছে।

সমকাল :কিন্তু বিএনপি তো সরাসরি চিহ্নিত মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, বাঙালি নিধনে নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তিদের মন্ত্রিসভার সদস্য করেছিল, সেটিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

আসিফ নজরুল :নিশ্চয়ই বিএনপি চিহ্নিত মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের মন্ত্রিসভায় নিয়ে এসে খুব বড় রাজনৈতিক ভুল করেছে, অন্যায় করেছে। এটার মাশুলও তারা দিয়েছে। এখন হয়তো বিএনপির নেতৃত্ব সেই ভুলটা বুঝতে পারছে। এ ক্ষেত্রে বিএনপির সমালোচনা করতেই হবে। কিন্তু আমি আবারও বলব, সেই সমালোচনার কারণে আওয়ামী লীগের ২০১৩ সালের পরের দুঃশাসনকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

সমকাল :২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর জঙ্গিবাদের উত্থান, দেশজুড়ে একের পর এক বোমবাজি, ২১ আগস্টের ভয়ংকর গ্রেনেড হামলাকে কি দুঃশাসন বলবেন না?

আসিফ নজরুল :দেখুন, বিএনপি আমলে জঙ্গিবাদের উত্থান হয়েছে, এটা সত্য। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা, ১৭ আগস্ট সারাদেশে বোমা হামলার মতো ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এ ঘটনাগুলো বিএনপির শাসন আমলকে বড় প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। এ জন্য বিএনপিকে মাশুলও দিতে হয়েছে, হচ্ছে। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে, শায়খ আব্দুর রহমান, বাংলাভাইয়ের মতো জঙ্গি নেতাদের কিন্তু বিএনপি সরকারই গ্রেপ্তার করেছিল, বিচার করেছিল।

সমকাল :আপনার বিশ্নেষণ থেকে এটা বোঝা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগ-বিএনপি কেউ-ই সুশাসন দিতে পারেনি। আর কোন দল আছে, যারা দেশ পরিচালনায় যোগ্য বিবেচিত হতে পারে?

আসিফ নজরুল :আসলে আমি এভাবে ব্যাখ্যা করতে চাচ্ছি না। আমি বলতে চাচ্ছি, ২০১৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতির যে ধারা ছিল, সেটা অনেক ভালো ছিল। কারণ এ সময় পর্যন্ত একদল একবার ক্ষমতায় গেছে, পরবর্তী নির্বাচনে সেই ক্ষমতাসীন দল পরাজিত হয়েছে। যে কারণে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি যে দলই হোক, জনকল্যাণ এবং জনগণের আস্থায় থাকার চেষ্টা করেছে। ফলে যতই ক্ষমতায় থেকে সুবিধা ভোগের চেষ্টা করুক, সেটা খুব রয়েসয়ে করেছে। কিন্তু ২০১৩ সালের পর গুম, খুন, দুর্নীতি অর্থাৎ দুঃশাসনের সব নিয়ামক খুব স্বাভাবিক হয়ে গেছে। কারণ আওয়ামী লীগ এখন আত্মবিশ্বাসী, তারা আর নির্বাচনে হারবে না। কারণ আর নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে না, এটিই তারা ধরে নিয়েছে। আমি বলতে চাই, যদি ২০১৪ সালে নিরপেক্ষ নির্বাচন হতো, বিএনপি ক্ষমতায় যেত, আবার ২০১৮ সালে বিএনপি নির্বাচনে হারত, আওয়ামী লীগ জিতত, ২০২৪ সালে আবারও বিএনপি ক্ষমতায় যেত। এভাবে চললে ক্ষমতার রাজনীতিতে, শাসন ব্যবস্থায় ভারসাম্য থাকত।

আমার মনে হয়, নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিবেশ ফিরিয়ে আনার মধ্য দিয়ে ক্ষমতার পালাবদলের গ্রহণযোগ্য অবস্থাটা আবারও ফিরিয়ে আনা গেলে সেটাই দেশের জন্য সবচেয়ে মঙ্গলজনক হবে। কিন্তু সে সম্ভাবনা তো দেখা যাচ্ছে না।

সমকাল :তাহলে কি ২০২৪ সালের নির্বাচন নিয়েও সংশয়ে আছেন?

আসিফ নজরুল :অবশ্যই সংশয়ে আছি। যেভাবে নির্বাচন কমিশন হলো, তারপর তো সংশয় না থাকার কোনো কারণ নেই। তার চেয়েও বড় কথা, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার না হলে কোনোভাবেই অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হবে না। যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকার নাও করা যায়, অন্তত নির্বাচনের সময় স্বরাষ্ট্র এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী কোনো নিরপেক্ষ ব্যক্তি যেমন সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন কিংবা সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদারের মতো ব্যক্তিদের দেওয়া হলেও নির্বাচন সুষ্ঠু করা সম্ভব হতে পারে।

তবে আমার মনে হয়, এবার ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ নতুন কোনো কৌশল প্রয়োগ করবে, যেন তারা ভালো নির্বাচন দেখাতে পারে। আমি এখানেই জোর দিচ্ছি, আওয়ামী লীগ ভালো নির্বাচন করবে না, তারা কখনোই ভালো নির্বাচন চায় না। তবে এবার তারা ভালো নির্বাচন দেখানোর জন্য নতুন কোনো কৌশল নেবে, যেটা ২০১৪ কিংবা ২০১৮ সালের কৌশলের চেয়ে আলাদা হবে।

সমকাল :আপনাকে ধন্যবাদ।

আসিফ নজরুল :আপনাকেও ধন্যবাদ।



© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com