ভালো শুনতে চাইলে করনীয়

প্রকাশ: ১২ মার্চ ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ১২ মার্চ ২২ । ১৪:৩৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

ডা. মো. আব্দুল হাফিজ (শাফী)

আমাদের পঞ্চেন্দ্রিয়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি হচ্ছে শ্রবণশক্তি। কান দিয়ে আমরা শুনি অথচ গুরুত্ব দিই কম এবং এই কানে শোনার যত্নে বরাবরই আমরা উদাসীন। এর ফলে বধিরতা পর্যন্ত হতে পারে। কানের যত্ন সবারই নেওয়া উচিত তবে শিশু, বৃদ্ধ ও গর্ভবতী নারীদের বিশেষ সতর্কতা নেওয়া দরকার। বিশ্বে ৫ শতাংশের বেশি মানুষের কোনো না কোনো মাত্রায় শ্রবণহীনতা রয়েছে। সমীক্ষায় দেখা যায়, আমাদের দেশের প্রায় ৯ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ বধিরতায় ভুগে থাকেন। একটু সচেতন হলেই এড়ানো যায় কানের অনেক রোগ। সচেতনতা হচ্ছে যে কোনো রোগ প্রতিরোধের প্রাথমিক পদক্ষেপ। শ্রবণশক্তি হ্রাস রোধ এবং বিশ্বজুড়ে শ্রবণশক্তির যত্ন কীভাবে নেওয়া যায়, সে সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে প্রতি বছরের ৩ মার্চ বিশ্ব শ্রবণ দিবস পালন করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে ২০০৭ সালের এই দিনে প্রথমবারের মতো পালিত হয় বিশ্ব শ্রবণ দিবস। প্রতি বছরই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) একটি নতুন স্লোগান ঘোষণা করে। ২০২২ সালের স্লোগান বা থিম হচ্ছে- 'ঞড় যবধৎ ভড়ৎ ষরভব; খরংঃবহ রিঃয পধৎব!' অর্থাৎ 'শোনায় চাই সযতন; শুনতে চাইলে আজীবন!' এই থিমের তাৎপর্য হচ্ছে- আমরা মনে করি বর্তমানে ভালো শুনতে পাচ্ছি বলে কোনো সমস্যাই হচ্ছে না বা হবে না। কিন্তু শব্দ দূষণজনিত বেশকিছু কাজ আমরা প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছি, সেগুলোর কিছু দীর্ঘমেয়াদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে এবং যার ফলে আমাদের কানের হেয়ার সেল ধ্বংস হয়ে শ্রবণের স্থায়ী ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শ্রবণশক্তি হ্রাস ঠেকাতে বা কানে কম শোনা রোধ করতে যথাযথ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। এজন্য যা করতে পারি-

-গর্ভকালীন অবস্থায় মায়ের যত্ন নেওয়া এবং সময়মতো রুবেলা, বসন্ত, হাম ইত্যাদির টিকা দেওয়া। এ সময় অটোটক্সিক বা শ্রবণে ক্ষতিকারক ওষুধ গ্রহণে বিরত থাকা। সব টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা।

- শিশুর বেড়ে ওঠার অন্যতম প্রধান উপাদান শুনতে পাওয়া। 'শোনা' শিশুর কথা বলা, সামাজিক যোগাযোগ এবং শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। শিশুটির দাঁত ওঠা, হাঁটাচলার পাশাপাশি শব্দের প্রতি সাড়া দিচ্ছে কিনা সেদিকে নজর রাখা উচিত। সাধারণত জন্মের পর তিন মাস বয়সে আপনার শিশু ঘাড় ঘোরাতে পারবে এবং আপনার কথার উত্তরে হাসতে পারবে। ছয় থেকে ১২ মাসের মধ্যে আপনার শিশু ভাঙা ভাঙা কথা বলতে শুরু করবে। ১৫ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে আপনার শিশু সহজ কয়েকটি কথা বলতে পারবে। এগুলো যদি না হয়ে থাকে, সে ক্ষেত্রে পিতামাতা একটু চিন্তিত হয়ে পড়তেই পারেন। এ ছাড়া কানে কম শুনলে শিশুও হতাশ, মনমরা হয়ে থাকবে। যদি স্বাভাবিক নিয়মে এগুলো বাচ্চার বেড়ে ওঠার মধ্যে দেখা না যায়, তখন অবশ্যই দ্রুত নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেবেন।

-গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় উচ্চ ভলিউমে গান শোনা শ্রবণশক্তি কমিয়ে দেয়; তরুণ প্রজন্মের জন্য যা অশনি সংকেত। তাই অবশ্যই হেডফোনে গান শোনার সময় বিরতি দিয়ে এবং ভলিউম কমিয়ে গান শোনা উচিত।

-একনাগাড়ে জোরালো শব্দের কারণে অন্তঃকর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে শ্রবণশক্তি হ্রাস পেতে পারে। তাই উচ্চশব্দের কলকারখানার শ্রমিকদের ক্ষেত্রে স্ট্ক্রিনিংসহ বিশেষ নজর দেওয়া সময়ের দাবি। গাড়িচালকদের অযথা হর্ন বাজানো থেকে বিরত থাকা উচিত। অপ্রয়োজনীয় শব্দদূষণ রোধে প্রয়োজনে আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করা উচিত।

-কানে কম শোনার যন্ত্র বা হেয়ারিং এইড সহজলভ্য করা এবং এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি সব সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কানের শ্রবণশক্তি পরীক্ষা বা অডিওলজি টেস্টের ব্যবস্থা সহজলভ্য করার মাধ্যমে শ্রবণশক্তি হ্রাস রোধ করা সম্ভব। কারও ইতোমধ্যে শুনতে পাওয়ার কতটুকু ক্ষতি হয়েছে তা জানতে অডিওগ্রাম নামে পরিচিত হেয়ারিং টেস্ট সম্পর্কে জনমনে ধারণা দিতে হবে। কারণ যারা শ্রবণশক্তি হারিয়েছেন তারা প্রাথমিক শনাক্তকরণ এবং উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে উপকৃত হতে পারেন।

-যদি হঠাৎ করেই কেউ কানে কম শোনার সমস্যায় আক্রান্ত হন তবে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা উচিত। যত দ্রুত সাডেন হেয়ারিং লসের রোগী তার চিকিৎসকের কাছে যাবেন তত দ্রুত আরোগ্য লাভ করার সম্ভাবনা রয়েছে।

কানের যত্নে আমাদের অবশ্য করণীয়

-অযথা ম্যাচের কাঠি, মুরগির পালক, মাথার ক্লিপ, কচুর ডাঁটি, কটনবাডস এগুলো দিয়ে কানে খোঁচাখুঁচি না করা।

-কানে যাতে পানি না যায় সে ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে।

- হাতুড়ে ডাক্তার দিয়ে কখনোই কান পরিস্কার না করানো।

-হেডফোন ব্যবহার করার সময় ৬০ শতাংশের ওপর ডিভাইসের ভলিউম ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা।

চোখে যেমন কম দেখা স্বাভাবিক, তেমনই কানে কম শোনাও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু কানে কম শোনার সমস্যা নিয়ে আমাদের সমাজে প্রায়ই হীনমন্যতায় ভুগতে লক্ষ্য করা যায়। তাই মনে রাখতে হবে, কানে কম শোনা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি প্রচলিত সমস্যা। আর তাই কানে কম শোনার সঠিক কারণ নির্ণয় এবং সমস্যা প্রতিরোধের জন্য সচেতনতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com