ইউক্রেন সংকট

চীনের সামনে বিশ্বনেতৃত্বের হাতছানি

প্রকাশ: ২২ মার্চ ২২ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

স্টিফেন এস রোচ

ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বকে অভূতপূর্ব এক অস্তিত্ব সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ শতকের শিক্ষা এবং তৎকালীন ভয়ংকর দুটো বিশ্বযুদ্ধের কথা আজকের নেতারা ভুলে গেছেন। স্নায়ুযুদ্ধ থেকে শান্তির যে ডিভিডেন্ড পাওয়া গিয়েছিল; তা হেলায় অপচয় করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও রুশ ফেডারেশন- এ দুই পরাশক্তি এখন অকল্পনীয় এক সামরিক সংঘাতের মুখোমুখি। এ সংঘাত লাগার আশঙ্কা অনেকটা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। ভুল করে পারমাণবিক যুদ্ধ বাধার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এ পরিস্থিতিতে চীন এমন এক অবস্থানে আছে যার সুযোগ নিয়ে একমাত্র সে-ই ইউক্রেনের ওপর রুশ হামলা বন্ধ করতে পারে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির ধারক দেশটি জাতীয় পুনর্জাগরণ ঘটানোর পাশাপাশি বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে; যে দুটি বিষয় চায়নিজ ড্রিমের (চীনা স্বপ্ন) মূল কথা, আবার প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও দীর্ঘদিন যাবৎ প্রচার করে আসছেন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করে সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে চীনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ আছে, যা অন্যদের নেই।

প্রথমত, নিজের মূল বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়েই সে এ কাজটা করতে পারে। ১৯৫০-এর দশকে চৌ এন লাইয়ের আমল থেকে চীন বলে আসছে, তার বিদেশনীতি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পঞ্চশীলা নীতির ওপর ভর করে চলে। এগুলোর মধ্যে আছে সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা, অনাগ্রাসন এবং অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতির প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা প্রদর্শন। ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার আক্রমণ চীনের ওই গভীর মূল্যবোধগুলোর মারাত্মক লঙ্ঘন। ন্যাটোর সম্প্রসারণ ঠেকানোর যে যুক্তি দেখিয়ে রাশিয়া ওই একতরফা হামলা চালিয়েছে, তা আজকে আলোচ্য বিষয় হতে পারে না। বরং ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বশান্তিকে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে- এটা নিয়ে ভাবিত হওয়া উচিত। চীনের ওই নীতিগুলো এ বিষয়টি বোঝার পরিস্কার সুযোগ করে দিচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, রাশিয়ার সঙ্গে চীনের একটা অংশীদারিত্ব আছে। ৪ ফেব্রুয়ারি বেইজিং উইন্টার অলিম্পিকস উদ্বোধনের সময় শি ও পুতিন একটা বড়-সড় চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন, যেখানে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এক 'নয়া যুগ'-এর প্রতি তাদের দায়বদ্ধতার কথা খুব গুরুত্বের সঙ্গে বলা হয়েছে। সেখানে যে বলা হয়েছে, 'দুই রাষ্ট্রের মধ্যকার বন্ধুত্বের কোনো সীমা নেই'- তার দ্বারা শি ও পুতিন বৃহৎ শক্তিগুলোর মাঝে ঝগড়া নয়; সহযোগিতার কথাই বুঝিয়েছেন। ইউক্রেন যুদ্ধ ওই অঙ্গীকারকে একেবারে ভেতর থেকে উল্টে দিয়েছে। বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রুশ অর্থনীতি চীনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ফলে উভয় দেশের জন্যই একটা বিশেষ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। রাশিয়ার জিডিপি বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসের যৌথ জিডিপির চেয়ে বড় নয়। এ পরিস্থিতিতে রাশিয়ার জন্য একটা বৃহৎ কনভেনশনাল যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াটা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এমনকি চীনের কাছ থেকে যে সামরিক সাহায্য সে চাচ্ছে বলে খবর বেরিয়েছে, তা পেলেও তার পক্ষে এ ধরনের যুদ্ধ সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।


অতএব, চীনের ওই নীতিমালা এবং রাশিয়ার সঙ্গে তার অংশীদারিত্ব চীনকে একটা অনন্য ও বিশ্বাসযোগ্য ক্ষমতা জোগাচ্ছে, যা ব্যবহার করে চীন এ ভয়ংকর ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে পারে। এটা যেমন চীনের জন্য আত্মশক্তির প্রতি খেয়াল করার একটা সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি বিশ্বের জন্যও চীনের শক্তির প্রতি দৃষ্টি দেওয়ার সুযোগ এনে দিয়েছে। এ ধরনের ডিসাইসিভ মুহূর্ত পৃথিবীর ইতিহাসে খুবই কম এসেছে। চীনের উচিত তিনটি ফ্রন্টে নেতৃত্ব দিয়ে এ সুযোগটি কাজে লাগানো।

প্রথমত, শি জিনপিং-এর উচিত জি২০ নেতাদের একটা জরুরি শীর্ষ সম্মেলন আহ্বান করা, যার মূল লক্ষ্য থাকবে ইউক্রেনে অনতিবিলম্বে নিঃশর্ত যুদ্ধবিরতি কার্যকর এবং শান্তির জন্য সমঝোতার শর্তগুলো তৈরি করা। চলমান এ সংকটকালে বিশ্বব্যাপী তৎপরতা চালানোর জন্য জি২০-ই হলো একমাত্র স্বীকৃত ফোরাম। ২০০৮ সালের শেষদিকে এর জন্ম হয়েছিল বিশ্বের নেতৃস্থানীয় অর্থনীতির দেশগুলোর সমর্থনকে একত্রিত করে বৈশ্বিক আর্থিক সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে। চীন ও রাশিয়াও এ ফোরামের সদস্য; জি২০ ওই একই ধরনের কাজ আজও করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, ইউক্রেনে মানবিক সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে চীনের নেতৃত্ব দেওয়া উচিত। ইতোমধ্যে সেখানে ৩০ লক্ষাধিক লোক উদ্বাস্তু হয়ে পড়েছে (সংখ্যাটা দ্রুত ৪০ লাখ ছাড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে), যাদের অন্তত অর্ধেক সংখ্যক শিশু। ফলে ইউক্রেনের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে মানবিক কার্যক্রম চালানোর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে কোনো বিতর্ক থাকতে পারে না। চীনের উচিত শিশুদের জন্য নিবেদিত বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংস্থা ইউনিসেফের তহবিলে শর্তহীন সহায়তা প্রদান করা। তা ছাড়া যুদ্ধের সবচেয়ে নিরীহ এ ভিকটিমদের জন্য দুনিয়ার আর সব দেশ যতটা সাহায্য দেবে; চীনের উচিত একাই তার সমপরিমাণ সাহায্য দেওয়া।

তৃতীয়ত, ইউক্রেনের পুনর্গঠনমূলক কার্যক্রমেও চীনের নেতৃত্ব দেওয়া উচিত। রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান বিক্ষিপ্ত বোমাবর্ষণের কারণে ইউক্রেনের শহুরে অবকাঠামোর একটা উল্লেখযোগ্য অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। ইউএনডিপি বলেছে, এ ক্ষতির পরিমাণ অন্তত ২০০ বিলিয়ন ডলার। সামনের দিন ও সপ্তাহগুলোতে তা নিঃসন্দেহে আরও বাড়বে। এ পুনর্গঠনমূলক কাজ চালানো একটা দেশের জন্য; ক্রয়ক্ষমতা সাম্যের নিরিখে মাথাপিছু জিডিপিতে ২০২০ সালের বিশ্বে যার অবস্থান ছিল ১২০তম, খুবই জরুরি কিন্তু অসম্ভব একটি বিষয়। আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণে চীন যে অতুলনীয় মনোযোগ দিয়ে যাচ্ছে; যুদ্ধোত্তর ইউক্রেন পুনর্গঠনেও তা ব্যবহূত হওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে চীনের বেল্ট অ্যান্ড ইনিশিয়েটিভ (২০১৭ সাল থেকে ইউক্রেন যার সদস্য) ও চীনা নেতৃত্বাধীন এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্কিত কর্মকাণ্ড চলতে পারে, তবে এগুলোতে সীমাবদ্ধ থাকা ঠিক হবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে তৈরি মার্শাল প্ল্যান বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে নেতৃত্ব দিয়েছিল; ইউক্রেনের বেলায় চীনও সে রকম দায়িত্ব নিতে পারে।

হ্যাঁ, রাশিয়া-ইউক্রেন দ্বন্দ্বের মূল কারণগুলো নিরসনের কাজটি চীন একা করতে পারবে না। তবে এ লক্ষ্যে একটা কাঠামো ও মনোভাব তৈরিতে সে ভূমিকা রাখতে পারে। শি ও পুতিনের মধ্যকার নতুন অংশীদারিত্বের বদৌলতে রুশ ফেডারেশনের ওপর চীনের যে প্রভাব জন্মেছে; তা রাশিয়ার বিরুদ্ধে দেওয়া পশ্চিমা অবরোধগুলোর চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে। সর্বোপরি, বর্তমান পরিস্থিতি একটা গভীর সংকটকালে চীনকে তার শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পঞ্চশীলা নীতি প্রয়োগ করার সুযোগ এনে দিয়েছে।

গত ৪০ বছরে বিশ্বায়ন থেকে চীন যেভাবে ফসল তুলে নিয়েছে; অন্য কোনো দেশ তা পারেনি। ওই সুযোগগুলোর উভয়মুখী ক্রিয়া করার ক্ষমতা আছে। পুতিন যেভাবে আতঙ্কজনক যুদ্ধটি টেনে নিয়ে চলেছেন এবং গোটা দুনিয়াকে নরকের কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছেন; তা চীনের জন্য বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার এক অনন্য ও জরুরি সুযোগ এনে দিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু আমাদের স্বপ্ন নয়; শি জিনপিং-এর দীর্ঘলালিত চীনা স্বপ্নও সংকটে পড়েছে। আমাদের এখন প্রয়োজন এমন সব নেতার, যারা বিশ্বায়নের পক্ষে দাঁড়াবেন; দাঁড়াবেন শান্তি ও মানবতার পক্ষে।

স্টিফেন এস রোচ: যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক; মালয়েশিয়াভিত্তিক এশিয়ান পোস্ট থেকে ভাষান্তর সাইফুর রহমান তপন।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com