অবহেলায় হারিয়ে গেছে লাখো দলিল

প্রকাশ: ২২ মার্চ ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ২২ মার্চ ২২ । ০২:১১ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজীব নূর

স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস লিখন ও মুদ্রণ প্রকল্পে সংগৃহীত হয়েছিল সাড়ে তিন লাখ পৃষ্ঠার নথিপত্র। এর মাত্র সাড়ে তিন শতাংশ প্রকাশিত হয়েছে স্বাধীনতা যুদ্ধের ১৫ খণ্ড দলিলপত্রে। বাকি সাড়ে ৯৬ শতাংশের বেশিরভাগই নষ্ট হয়ে গেছে ১৯৮৮ সালের বন্যার পানিতে। খোয়া গেছে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার মতো বিষয়ের মূল্যবান দলিলপত্রও।

টিকে যাওয়া দলিলগুলো রাখা হয়েছে জাতীয় জাদুঘরের লাইব্রেরিতে। সেগুনবাগিচায় পুরো চারটি কক্ষে স্থান সংকুলান হচ্ছিল না যে দলিলগুলোর, সেগুলো রাখতে জাতীয় জাদুঘরের চারটি আলমারি ও ১০টি ফাইল কেবিনেটের সবটুকু জায়গাও লাগেনি।

স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস লিখন ও মুদ্রণ নামে তথ্য মন্ত্রণালয়ের নেওয়া প্রকল্পটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র ও ইতিহাস সংগ্রহের দ্বিতীয় প্রকল্প। প্রথম প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মাত্র ছয় মাস পরে ১৯৭২ সালের জুলাই মাসে। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে গৃহীত প্রথম প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য গঠন করা হয় জাতীয় স্বাধীনতার ইতিহাস রচনা পরিষদ। প্রকল্পের দপ্তর ছিল বাংলা একাডেমিতে এবং পদাধিকারবলে একাডেমির সেই সময়কার মহাপরিচালক মযহারুল ইসলাম হয়েছিলেন এর চেয়ারম্যান। তাই প্রকল্পটি গবেষকদের কাছে বাংলা একাডেমির ইতিহাস প্রকল্প নামে পরিচিত।

বাংলা একাডেমির প্রকল্পের কর্মী ছিলেন সুকুমার বিশ্বাস। ২০০২ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, প্রকল্পকে কেন্দ্র করে ৩৪ জন তথ্য সংগ্রাহককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। চারটি বিভাগে পাঁচ সদস্যের কমিটি করা হয়েছিল। মহকুমা, থানা ও ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল।

সুকুমার বিশ্বাস পরে গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে যুক্ত হয়েছিলেন স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস লিখন ও মুদ্রণ প্রকল্পের দ্বিতীয় উদ্যোগেও। সর্বশেষ ১৯৯৭ সালে বাংলা একাডেমির পক্ষে নেওয়া তৃণমূল স্তরে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক তথ্যাদি সংগ্রহ ও প্রকাশ প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন তিনি। ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। কয়েকদিন পর ২৩ অক্টোবর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠিত হয় এবং তৃণমূল পর্যায়ের ইতিহাস সংগ্রহের প্রকল্পটি বাংলা একাডেমি থেকে মন্ত্রণালয়ে নেওয়া হয়। এর কিছুদিন পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় আতঙ্কিত হয়ে সুকুমার বিশ্বাস দেশত্যাগ করেন।


বাংলা একাডেমি পরিচালিত প্রথম প্রকল্পের সংগ্রহ সম্পর্কে জানতে চাইলে ওই সাক্ষাৎকারে সুকুমার বিশ্বাস জানিয়েছিলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় চার নেতা থেকে শুরু করে মন্ত্রিসভার সদস্য ও নির্বাচিত গণপ্রতিনিধি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কর্মীদের ৪৯৫টি সাক্ষাৎকার, মুক্তিযুদ্ধসংশ্নিষ্ট সমাজের সর্বস্তরের জনগণের চার হাজার ১৪১টি সাক্ষাৎকার, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক আতাউল গণি ওসমানী, জিয়াউর রহমান, খালেদ মোশাররফসহ সশস্ত্র বাহিনীর সৈনিক কর্মকর্তাদের ৩৫০টি সাক্ষাৎকার ছিল। ৫১১টি আলোকচিত্র, বিভিন্ন বধ্যভূমি থেকে পাওয়া ১০৭ জন শহীদের মাথার খুলিও ছিল। এছাড়া শিল্পী প্রাণেশ মণ্ডল তার নিজের এবং শিল্পী কামরুল হাসান ও নিতুন কুন্ডুর আঁকা মুজিবনগর সরকার প্রকাশিত ১৫টি পোস্টার দিয়েছিলেন।

স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস লিখন ও মুদ্রণ প্রকল্পের গবেষক হিসেবে সবচেয়ে পরিচিত আফসান চৌধুরী। তিনি বলেন, 'অল্প কিছু মানুষ নিজের থেকে দলিল দিয়েছেন, তাদের মধ্যে একজনের নাম বলতেই হয়, তিনি আমাদের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। অনেকে সহায়তাটুকুও করেননি। যারা করেনি তাদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। কথা দিয়েছিল তারা মুক্তিযুদ্ধের সংরক্ষিত দলিলপত্র দেবে, কিন্তু পরে একটি দলিলও দেয়নি।'


'পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে খুব অদ্ভুতভাবে আমি কিছু দলিলপত্রের সন্ধান পেয়ে যাই ১৯৭৮ সালে। একদিন মন্ত্রণালয়ের লাইব্রেরিতে গিয়ে দেখি, নতুন অফিসারদের কয়েকজন উঁচু এক বাক্সের ওপর পা রেখে গল্প করছেন। বাক্সে কী আছে জানতে চাইলে লাইব্রেরিয়ানের কী মনে হলো, বাক্সটি খুললেন। দেখলাম, মুজিবনগর থেকে আসা নানা পত্রিকার কাটিং। ভাবা যায়, সাত বছর ধরে পড়ে ছিল এগুলো! বাক্সের মধ্যে কিছু ফাইলও ছিল। আমি মনে করি, সেগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ওখানে লেখা ছিল, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কথাবার্তা। আমলাতন্ত্রের জটিলতা ডিঙ্গিয়ে সেগুলো আনতে পারিনি। কারণ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নানা গুরুত্বপূর্ণ পদের কর্মকর্তারা বিভিন্ন দেশ সম্পর্কে যেসব মন্তব্য করেছেন, সেগুলো যদি প্রকাশ হয়ে যায়; তাহলে তাদের পোস্টিং পেতে অসুবিধা হতে পারে। পোস্টিংয়ের সমস্যা থেকে বাঁচতে তারা ফাইলগুলো লুকাচ্ছিলেন। পরে আর ওই দলিলগুলো দেখিনি,' বলেন আফসান চৌধুরী।

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ স্টাডিজের চেয়ারম্যান অধ্যাপক দিব্যদ্যুতি সরকার বলেন, দলিলপত্রের ১৫ খণ্ডে আসেনি, কিন্তু সংগৃহীত হয়েছিল এমন অনেক কিছুই নেই হয়ে গেছে। অন্তত জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত ও অপ্রকাশিত দলিলগুলোর মধ্যে যে নেই তা বলা যায়। কয়েকটা আলমারিতে সেগুলো রাখা আছে। আমি নিজে ওগুলো নিয়ে কাজ করতে চেয়েছিলাম। কোনো ক্যাটালগ নেই বলে সুবিধে করতে পারিনি।



তিনি বলেন, 'খুঁজলে এখনও অনেক অজানা দলিল মিলবে। সেই জন্য প্রধানত ভারতে খুঁজতে হবে। তবে আমেরিকা থেকে ইউরোপের বহু দেশে দলিল পাওয়া সম্ভব। দেশের তৃণমূলেও কাজ করতে হবে। মানুষের স্মৃতিতেও রয়ে গেছে মুক্তিযুদ্ধের কথা।'



সরকারি উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রকল্পের তৃতীয়টি ছিল তৃণমূল পর্যায়ের ইতিহাস সংগ্রহের এবং সেই প্রকল্পে তৃণমূলের মানুষের কথা সংগ্রহ করা হচ্ছিল। ১৯৯৭ সালে বাংলা একাডেমির সেই সময়কার মহাপরিচালক অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেনের চেষ্টায় প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল। তিনি জানান, সরকার পরিবর্তনের পর এই প্রকল্পটিকে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে। তৃণমূল স্তরে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক তথ্যাদি সংগ্রহে তৃণমূলের গবেষকরাই যুক্ত হয়েছিলেন। বিনা পারিশ্রমিকে অসাধ্য সাধন করছিলেন তারা। ২০০১ সালে গঠিত মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে প্রকল্পটি হস্তান্তর করা হয় এবং 'প্রাসঙ্গিকতা যাচাই'য়ের নামে প্রকল্পের পুরো পরিকল্পনায় ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়। পরে আওয়ামী লীগ বহুদিন ধরে ক্ষমতায় থাকলেও প্রকল্পটি আর আলোর মুখ দেখেনি।



২০০২ সালে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করা ওই প্রকল্প সম্পর্কে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের কিছুই জানা নেই। তবে তিনি এ সম্পর্কে খোঁজ নেবেন বলে জানালেন।



তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইতিহাসভিত্তিক দলিল প্রকাশ ও সংরক্ষণ, মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান, যুদ্ধক্ষেত্র, বধ্যভূমি ও গণকবর চিহ্নিত করে সংরক্ষণে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তেমন কোনো কাজ নেই। অথচ 'মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস ও স্মৃতি সংরক্ষণ' মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার মূল অভিলক্ষ্য (মিশন)। এ নিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল অধ্যাপক ও গবেষক মুনতাসীর মামুনের কাছে। তিনি বলেন, 'মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় ইতিহাস ও স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য যে গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে, তা বুঝে বলে আমার মনে হয় না।'



এ বি তাজুল ইসলাম মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে চিঠি দিয়ে একটি আর্কাইভ করার অনুরোধ করেছিলেন বলে মুনতাসীর মামুন জানালেন। তখন প্রস্তাবটি আমলে নেওয়া হলেও পরে আর কিছু হয়নি।



মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক নিজেদের কিছু সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে নিয়ে বলেন, 'মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে নানান উদ্যোগ নিয়েছি আমরা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পাঠ বাধ্যতামূলক করতে মন্ত্রণালয় কাজ করে যাচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা যেমন, তেমনি রাজাকার-আলবদরদেরও তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। দলিলপত্র ও ইতিহাস সংগ্রহের কাজ আরও ত্বরান্বিত করা হবে।'

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com