গণসাক্ষরতা অভিযান, সমকাল ও নেট্‌জ-বাংলাদেশের ওয়েবিনার

সবার সমান শিক্ষার জন্য চাই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত

প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ২৯ মার্চ ২২ । ০০:৪২ | প্রিন্ট সংস্করণ

--

প্রাথমিক শিক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সব শিক্ষার্থীর জন্য সমান সুযোগ থাকতে হবে। কিন্তু দেশে সুবিধাবঞ্চিত অনেক শিশুই শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে না। করোনাকালে এ বৈষম্য আরও বেড়েছে। অসচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পরীক্ষানির্ভর, সনদসর্বস্ব শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে গুণগত শিক্ষাকে বিস্তৃত করতে হবে। সবার সমান শিক্ষার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

'সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য গুণগত শিক্ষা :কর্ম-অভিজ্ঞতা ও করণীয়' শীর্ষক ওয়েবিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। গত ২৯ ডিসেম্বর গণসাক্ষরতা অভিযান ও সমকাল আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সহায়তা করে নেট্‌জ-বাংলাদেশ। অনুষ্ঠানে নেট্‌জ-বাংলাদেশ পরিচালিত সারাদেশের ৩৪টি আনন্দলোক বিদ্যালয়ের কার্যক্রম তুলে ধরা হয়। বলা হয়, এ বিদ্যালয়ের মূল উদ্দেশ্য আনন্দের মাধ্যমে শিশুদের গুণগত শিক্ষাদান। সারাদেশে সৃজনশীল শিক্ষাদান পদ্ধতি নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের ভাবনার প্রতিফলন রয়েছে এ স্কুলের শিক্ষা কার্যক্রমে। বক্তারা এই স্কুলের শিক্ষাপদ্ধতি সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান।



রাশেদা কে চৌধুরী

অসচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। তাদের জন্য দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। ক্ষুধার্ত শিশুর কাছে মানসম্মত শিক্ষা আশা করতে পারি না। তবে সবকিছুতে সরকারের মুখাপেক্ষী হলে হবে না। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো- সুশিক্ষা, সুশাসন, সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করে সুনাগরিক গড়ে তোলা। এ ক্ষেত্রে 'আনন্দলোক বিদ্যালয়' একটি আলাদা মানদণ্ড তৈরি করেছে। কিন্তু এসব স্কুলের স্থায়িত্বশীলতা, মূলধারার সঙ্গে সমন্বয় ও সংযুক্তি নিয়ে ভাবতে হবে। সারাদেশে এ স্কুলগুলোর মতো মডেল ছড়িয়ে দিতে হবে। সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ের মাধ্যমে জাতীয় পরিকল্পনায়ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য গুণগত শিক্ষার বিষয় অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। আমরা ভালো ভালো নীতি ও আইন প্রণয়ন করলেও তা বাস্তবায়ন করতে পারি না।

সব নাগরিকের জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। পরীক্ষানির্ভর, সনদসর্বস্ব শিক্ষাব্যবস্থা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। তাই মাঠ পর্যায়ে শিক্ষার প্রকৃত অবস্থা বোঝা দরকার। সে জন্য আজকের এই আয়োজন। নীতি-নৈতিকতা শিক্ষার গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষার মাধ্যমে আমরা কোন ধরনের নাগরিক গড়ে তুলব, তা নিয়ে ভাবতে হবে। শুধু ভালো রেজাল্ট করবে; কিন্তু ভালো মানুষ হবে না, তা হবে না। আমরা দেখতে পাচ্ছি, সাইবার অপরাধসহ অনেক অপরাধ শিক্ষিত জনগোষ্ঠী করছে। সে জন্য আমাদের মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন গুণগত শিক্ষা জরুরি।

সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ের মাধ্যমে জাতীয় পরিকল্পনা নিতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ বলা হয়েছিল, প্রাথমিক শিক্ষা হবে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। কেন আমরা সেই জায়গাতে যেতে পারছি না; কেন রাষ্ট্রকে পিছু হটতে দিচ্ছি, তা ভাবনার বিষয়। আমরা আর পিছিয়ে যেতে চাই না। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সাম্যের পক্ষে না হলে আমরা বারবার হোঁচট খাব, শিক্ষার লক্ষ্য অর্জিত হবে না।


আবু সাঈদ খান

বাংলাদেশে এখনও ২০ শতাংশ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। তারা পুরোপুরি শিক্ষার আলো পাচ্ছে না। এখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে এবং এনজিওর উদ্যোগে কিছু কাজ হচ্ছে। কিন্তু এখনও অনেক শিশু শিক্ষার বাইরে আছে। সারাদেশে শিক্ষার হার বাড়লেও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হয়নি। এ ছাড়া দুর্গম এলাকায় শিক্ষার মান আরও দুর্বল হয়ে গেছে। করোনাকালে সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা আরও পিছিয়ে গেছে। গুণগত শিক্ষা এখন আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। শিশুর পেটে আহার না থাকলে তাকে কোনো শিক্ষাই দেওয়া যায় না। এ জন্য শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ক্ষুধা দূর করা। টিফিন নয়, এক বেলা পেটভরে পুষ্টিকর খাবার দেওয়া দরকার। একটি ইতিবাচক দিক হচ্ছে, এখন সবাই তার সন্তানকে শিক্ষাদানে আগ্রহী হয়েছেন। এ ক্ষেত্রে সমতা দরকার। এ জন্য রাষ্ট্রীয়, এনজিওসহ সর্বস্তরের মানুষের উদ্যোগ দরকার। দেশে এখন কেউ না খেয়ে নেই; কিন্তু অপুষ্টি দূর করা যায়নি। অপুষ্টির শিকার শিশুরা যেন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়। আমরা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার ছিল- সবার জন্য শিক্ষা, বাসস্থান ও খাদ্য। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আমাদের এই অঙ্গীকার সবার জন্য বাস্তবায়ন হওয়া দরকার।


সুলতানা কামাল

প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ব্যাপার। সার্বিকভাবে আমাদের কিছু গোষ্ঠীর কাছে রাজনীতি নতি স্বীকার করেছে। শিক্ষাক্ষেত্রেও এর কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি। শিক্ষাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই বৈষম্য তৈরি হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল বাংলাদেশ সর্বসাধারণের একটি দেশ হবে। এখানে কোনো বৈষম্য থাকবে না। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে- এটি সাম্যের দেশ হবে। সামাজিক ন্যায়বিচারের দেশ হবে। মানবিক মর্যাদার দেশ হবে। অর্থাৎ একটা অন্তর্ভুক্তিমূলক, সমতাভিত্তিক সমাজ আমরা তৈরি করব। সেটি তৈরি করার জন্য সবার আগে শিক্ষার মধ্য দিয়ে এটি প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। কারণ, শিক্ষা মানুষের মনন তৈরি করে। শিক্ষার মধ্য দিয়েই মানুষ তৈরি হয়। শিক্ষকদের মানুষ গড়ার কারিগর বলা হয়। কিন্তু মানসম্মত বিদ্যালয়ের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। সবার জন্য সমান শিক্ষা দরকার। সব মিলিয়ে একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দরকার এবং সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সে রকম রাজনৈতিক দলের ক্ষমতাসীন থাকা দরকার। আমরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির কাছে এ প্রত্যাশা করতেই পারি।


গোলাম নবী

আনন্দলোক স্কুলের মূল উদ্দেশ্য আনন্দের মাধ্যমে শিশুদের গুণগত শিক্ষাদান। সারাদেশে সৃজনশীল শিক্ষাদান পদ্ধতি নিয়ে যারা কাজ করেছেন, তাদের ভাবনার প্রতিফলন রয়েছে আনন্দলোক স্কুলের শিক্ষা কার্যক্রমে। ২০০৮ সাল থেকে আনন্দলোক স্কুলের কার্যক্রম শুরু হয়। এটি একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। বর্তমানে সারাদেশে ৩৪টি আনন্দলোক বিদ্যালয়ে ছয় সহস্রাধিক শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে। আনন্দলোক বিদ্যালয় বদলে দিচ্ছে শিশু ও কমিউনিটিকে। এ বিদ্যালয়ের পাঁচটি বৈশিষ্ট্য, যা এলাকার অন্য স্কুল থেকে তাদের আলাদা করেছে। স্কুলের পড়া স্কুলেই তৈরি, শিক্ষার্থী-শিক্ষক সহজ সম্পর্ক, মা ও অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, স্কুলের উন্নয়নে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর অবাধ ও স্বাধীন অংশগ্রহণ করার সুযোগ এবং শিক্ষার্থীরা ব্রতচারী পদ্ধতিতে নিজেদের গড়ে তোলে। আনন্দলোক বিদ্যালয় শুধু স্কুলে পড়তে আসা ছেলেমেয়েদের জীবনে আলো ছড়ায় না, আলোকিত করে পুরো কমিউনিটিকে। এ স্কুলগুলোকে গ্রামের মানুষ বলে 'আমাদের স্কুল'। এ স্কুল ওইসব গ্রামে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যেখানে সরকারি কোনো স্কুল নেই। জমি ও ভবন গ্রামের মানুষের নিজস্ব সম্পত্তি। দেশের প্রতিটি প্রাইমারি স্কুল চাইলে আনন্দলোক স্কুলের মতো হতে পারে।

ভিডিও চিত্রে স্কুল পরিদর্শনের সময় স্থানীয় জনসাধারণের প্রতিক্রিয়া

খাটুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোফাজ্জল হোসেন শাহ বলেন, আমাদের স্কুল ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জাহানারা ইমাম আনন্দলোক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে ওই গ্রাম থেকে আমরা কোনো ছাত্রছাত্রী পেতাম না। এই একটি মাত্র স্কুলের কারণে খাটুরিয়া ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া, এলাকাবাসীর জীবনযাপন, কিশোর-কিশোরীদের জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি- সবকিছু বদলে গেছে। স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি আবদুর রহমান বলেন, অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করার পর নিজ গ্রামে প্রথম স্বাধীনতার সুফল দেখতে পাই ২০০৮ সালে। যখন এই গ্রামে আনন্দলোক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলো। কৃষক মো. দুলাল হোসেন বলেন, এই স্কুল না হলে আমার ছেলেমেয়েরা আমারই মতো নিরক্ষর চাষি হতো। আমি যেমন বাবার পাঁচ বিঘা থেকে ভাগে দুই বিঘা পেয়ে চাষাবাদ করছি, আমার ছেলেও তাই করত। আর মেয়েটাকে এতদিনে হয়তো বিয়ে দিয়ে দিতাম।


ড. এ কে এম রিয়াজুল হাসান

সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগের সমন্বয় প্রয়োজন। সরকারকে ভুল ধরিয়ে দিতে হবে, যাতে শিক্ষার মান গুণগত হয়। সবাই সম্মিলিতভাবে কাজ করলে গুণগত শিক্ষায় অনেক এগিয়ে যেতে পারব।


ড. মনজুর আহমদ

গুণগত শিক্ষায় নীতিগত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দরকার। শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগে ঘাটতি আছে। অধিকাংশ শিক্ষার্থী প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে গেলেও লিখতে-পড়তে পারে না। বর্তমানে আমরা বিরাট একটা সংকটে পড়েছি। এ সংকট একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় এক বছরের জন্য হয়েছিল। সেই সংকট থেকে ফিরে আসার সময় অনেক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে হয়েছে। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ পার হয়ে এসেছি, তাদের শিক্ষার একটা ঘাটতি আছে। এবার করোনার কারণে দুই বছর আমাদের শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থা সচল করতে আমাদের সবাইকে কাজ করতে হবে। নতুন করে ভাবতে হবে। সেটি করতে না পারলে একটি প্রজন্মের ওপর অভিঘাত আসবে। কীভাবে তাদের আবার শিক্ষায় নিয়ে আসতে পারব, ক্ষতি কীভাবে পূরণ হবে, আনন্দলোক শিক্ষার মডেল কীভাবে মূলধারায় নিয়ে আসা যায়, তা নিয়ে ভাবতে হবে। আমরা বলছি স্কুলবর্ষ বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু মূলধারার শিক্ষার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বিরাট আঘাত থেকে উদ্ধার বিষয়ে চিন্তা করা দরকার। সেখানে আমাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দরকার। নাগরিক সমাজকেও এ নিয়ে চিন্তা করতে হবে। আনন্দলোক মডেলের ৩৪টি স্কুল আমাদের জন্য সুন্দর উদাহরণ। আরও কিছু স্কুল ভালোভাবে চলছে। সব স্কুল এ রকম হোক।


ড. আবদুল হালিম

আনন্দলোক স্কুলগুলো আমি পরিদর্শন করেছি। কিন্তু আমাদের অন্য বহু বিদ্যালয়ে আনন্দলোক স্কুলের মতো সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য গুণগত শিক্ষা নেই। প্রকৃতপক্ষে শতভাগ সুবিধাবঞ্চিত শিশু শিক্ষার আওতায় আসেনি। করোনাকালে এসব শিশু আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে করোনাকালে মেয়ে শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়েছে। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীরা কোথায় যাচ্ছে? কাজের ফাঁকে শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়ার জন্য আলাদা সময়সূচি নির্ধারণ করতে হবে। সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারসহ সবার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। সরকারি স্কুলগুলোতে সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের শুধু প্রণোদনা দিলে হবে না; শিক্ষার্থীর পরিবারকেও অর্থনৈতিক সহায়তা দিতে হবে। ঢাকা শহরের সরকারি স্কুলে চাকরি নিতে আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়ি। কিন্তু চাকরি পাওয়ার পর শুধু রুটিন কাজ করি। শহরের সরকারি প্রাথমিক স্কুলে কিন্তু সচ্ছল পরিবারের সন্তানরা পড়ে না। অথচ গ্রামের স্কুলের চিত্র ভিন্ন। সেখানে সবার সন্তানই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে। ফলে গ্রামের সব স্কুলের শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে হবে। সবল-দুর্বল শিক্ষার্থীদের আলাদা করার দায়িত্ব শিক্ষকদের। এখান থেকেই তাদের একটা গাইডলাইন দিতে হবে শিক্ষকদের। কোন শিক্ষার্থীর আগ্রহ কোন দিকে, তা এখান থেকেই নির্ধারণ করতে হবে। তাহলে আমরা একটি দক্ষ মানবসম্পদ পাব। গুণগত শিক্ষার মান বজায় রাখতে হবে। আনন্দলোক স্কুলের শিক্ষার মডেল সারাদেশের সব স্কুলে প্রয়োগ করতে পারলে আমাদের প্রচেষ্টা সার্থক হবে।


কাজী ফারুক আহ্‌মেদ

ষাটের দশকের মধ্যভাগে আমরা কিছু অগোছালো তরুণ সমাজ বদলের স্বপ্ন দেখেছিলাম। তখন আমারই একজন সহযোদ্ধা নারায়ণগঞ্জে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। একবার তার ছুটিতে বদলি শিক্ষক হিসেবে আমি কিছুদিন শিক্ষকতা করেছি। সেখানে পড়ানোর কায়দা আজকের সঙ্গে আকাশ-পাতাল তফাত। যেটি অপরিবর্তিত সেটি হলো, শিক্ষার্থীদের আনন্দের মধ্যে পড়ানো। আমাদের অনেক স্কুল বেড়েছে। বেড়েছে সরকারি স্কুল। নারায়ণগঞ্জের ওই স্কুলের কাছে লজেন্স কারখানা ছিল। আমি শিক্ষার্থীদের পকেট ভর্তি করে লজেন্স দিয়ে দিতাম। তখন ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক বললেন, 'আপনি তো পড়ান না, শুধু গল্প করেন।' বাস্তবে শিক্ষার্থীরা আনন্দ নিয়ে পড়েছে। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য মানসম্মত স্কুল দরকার। শুধু পরীক্ষানির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সব শিক্ষার্থীর জন্য সমান সুযোগ থাকতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আমি মূলধারা বুঝি না। আমি বুঝি- সুসময় ও দুঃসময়ে সব শিশু একই রকম সুবিধা পাবে। করোনাকালে শিক্ষায় বৈষম্য আরও বেড়েছে। যাদের টাকা-পয়সা আছে, তারা বাচ্চাদের শিক্ষা দিতে পেরেছে। কিন্তু প্রান্তিক পর্যায়ের শিশুরা বঞ্চিত হয়েছে। শিশুর শিক্ষায় অভিভাবকদের বেশি করে সম্পৃক্ত করতে হবে। ভালো কাজগুলোতে উৎসাহিত করতে হবে। জাতীয় পরিকল্পনায় নিয়ে এসে সব ভালো উদ্যোগের সমন্বয় করতে হবে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অর্জনও বৈষম্যবিরোধী। বিশ্বমানের যোগ্যতা অর্জন করতে হলে দক্ষতা অর্জন করতেই হবে। এ জন্য আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে।



তপন কুমার দাশ

গণসাক্ষরতা অভিযান সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের গুণগত শিক্ষা নিয়ে কাজ করছে। আমরা নৈতিক শিক্ষা নিয়ে কাজ করছি। সব গোত্রের মানুষ যেন সমান শিক্ষা সুবিধা পায়- তা নিয়ে অ্যাডভোকেসি করছি। আমাদের কিছু সহযোগী সংস্থাও গুণগত শিক্ষা নিয়ে কাজ করছে। আমরা সেসব ব্যতিক্রমী মডেল সবার কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি, যাতে এ থেকে অন্যরা অনুপ্রাণিত হন। এসব মডেল যেন একেবারে হারিয়ে না যায়। এগুলোকে জাগিয়ে তুলতে হবে। প্রত্যন্ত এলাকায় কীভাবে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, সেগুলো আমরা জানব। এসব মডেল সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। সব শিশু যেন শিক্ষার অধিকার অর্জন করতে পারে।



শহিদুল ইসলাম

আনন্দলোক স্কুল প্রতিষ্ঠার এক যুগ হয়ে গেল। আমরা কখনও ভাবিনি, সারাদেশে আনন্দলোক স্কুল প্রতিষ্ঠা হবে। আমরা চেষ্টা করেছি গুণগত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার। আমরা এটি দেশের জন্য একটি মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছি। আনন্দলোক স্কুল শুধু শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিষয় নয়, স্থানীয় জনগণের বিষয়। জীবনঘনিষ্ঠ ও মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন পাঠদানের চেষ্টা করেছি। আমরা এমন শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেছি, যে শিক্ষা শিশুকে বিদ্যালয়মুখী করে তুলবে। তারা নীতিবান, আদর্শবান ও দেশের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে। ১২ বছরে আমরা দেখতে চেয়েছি, বাইরের মানুষ আমাদের উদ্যোগ কীভাবে দেখে। রাষ্ট্র যদি আমাদের মডেলটি গ্রহণ করে, তাহলে আমাদের পরিশ্রম সার্থক হবে।



সোহরাব উদ্দিন মণ্ডল

২০২২ সাল থেকে আনন্দলোক ট্রাস্ট স্কুলগুলো পরিচালনা করবে বলে আশা করছি। আশা করি, এর মধ্যে স্কুলগুলোর রেজিস্ট্রেশন পেয়ে যাব। আমরা আরও দক্ষতার সঙ্গে স্কুলগুলো পরিচালনা করতে চাই।



মো. আব্দুল হামিদ সরকার

আমাদের দুর্গম চরাঞ্চলে দুটি স্কুল আছে। এখানে সরকারি কারিকুলাম অনুসরণ করা হয়। আমরা তাদের তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সহায়তা করি। বিদ্যালয়গুলোতে পাকা ভবন তৈরির অনুরোধ করছি।



মহিদুল ইসলাম

আনন্দলোক স্কুলের শিক্ষা কার্যক্রম আমার কাছে ভালো লেগেছে। স্কুলগুলোতে শিক্ষকদের সম্মানী অনেক কম। কিন্তু তারা আনন্দের সঙ্গেই পাঠদান করেন। এখানে মূল চ্যালেঞ্জ মূলধারায় সংযুক্ত করা। আনন্দলোক স্কুলের শিক্ষকদের বেতন কাঠামো ঠিক করা দরকার। এখানে দুই শিফটে মাত্র চারজন শিক্ষক। শিক্ষক বাড়ানো উচিত। সব রকম উপকরণ সরবরাহ করা হলেও ব্যাগ ও ড্রেস দেওয়া হয় না। এগুলোও যেন দেওয়া হয়।

মো. আকরাম হোসেন

আনন্দলোক স্কুলশিক্ষার্থীদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সর্বোচ্চ সেবা দিচ্ছে। শিক্ষার্থীদের যদি কোনো খাবার দিয়ে সহায়তা করা যায়, তাহলে তারা আরও উৎসাহী হবে। এসব শিক্ষার্থীর পরিবার খুবই দরিদ্র। তাদের আর্থিকভাবে সহায়তা করা গেলে শিক্ষার হার আরও বাড়বে। নারী-শিশুদের নিরাপত্তায় আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ দরকার। প্রান্তিক শিশুকে নয়, প্রান্তিক পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দিতে হবে। এতে ওই পরিবারের শিশুরা ভালো থাকবে। বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের এলাকায় সহায়তা দিতে হবে। তাহলে এ পরিবারগুলো শিক্ষায় এগিয়ে আসবে। আনন্দলোকের স্কুল শিশুদের শিক্ষার জন্য যে অবদান রাখছে, অন্যান্য স্কুল যেন এমন মডেল ব্যবহার করে। এতে শিশুরা সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে। সৃজনশীলতা ও বুদ্ধিমত্তার বিকাশ হবে। বিদ্যালয়-সংশ্নিষ্ট সবাইকে আন্তরিক হতে হবে। সরকারিভাবে যে প্রান্তিক যোগ্যতার কথা বলা হয়, সেই প্রান্তিক যোগ্যতা অর্জনের ক্ষেত্রে আনন্দলোক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভালো করছে।


সানজিদা পারভীন

২০০৮ সালে গাইবান্ধা সদরে কবি সুফিয়া কামাল আনন্দলোক বিদ্যালয় স্থাপিত হয়। ২০০৯ সাল থেকে বিদ্যালয়টি জেলা পর্যায়ে অংশ নেয়। ২০১১ সাল থেকে বিদ্যালয়টি সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। পাসের হার শতভাগ। বর্তমানে স্কুলের শিক্ষার্থী ২০৪ জন। এ বিদ্যালয়টি ভিন্ন ধরনের। বিদ্যালয়ে পাঠদানের পাশাপাশি সহশিক্ষাক্রমিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এখানে এগিয়ে থাকা ও পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের দল করা হয়। এখানে পাঠদানের পাশাপাশি লাইব্রেরি, খেলাধুলা, সংস্কৃতি, চারুকলার ক্লাস করা হয়। করোনাকালে শিক্ষার্থীদের দলীয়ভিত্তিক পাঠদান করেছি। বাড়ি বাড়ি গিয়ে গল্পের বই বিতরণ করেছি। অভিভাবকদের সঙ্গেও সব সময় যোগাযোগ রক্ষা করেছি, যাতে শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে না পড়ে। স্বাস্থ্য সচেতনমূলক বিষয়ে আলোচনা করেছি।



মিতু আক্তার

আনন্দলোক স্কুলে আসতে আমার অনেক ভালো লাগে। আমাদের গল্পের বই দেওয়া হয়। নাচ-গান করা হয়। আমরা রচনা লিখি। কিন্তু রচনা মুখস্থ করতে হয় না। রচনা লেখার জন্য আমাদের মাঠে নিয়ে যাওয়া হয়।



মো. আল আমীন মিয়া

চার কিলোমিটার সাইকেলে চড়ে আমি স্কুলে আসি। এ স্কুলে যেতে আমার ভালো লাগে। গ্রামের সব শিশু স্কুলে আসে। এখানে শিক্ষকরা অনেক ভালো। স্কুলের পড়ালেখা অনেক ভালো লাগে। গান-বাজনা ভালো লাগে। লাইব্রেরিতে বই পড়ি। আমাদের স্কুলে শহীদ মিনার, বড় একটা খেলার মাঠ ও ফুলবাগান আছে। অনেক রকম গাছপালা আছে। আমাদের স্কুলটি অনেক সাজানো। আমি চাই, এ রকম আরও স্কুল হোক।

স্বাগত বক্তব্য

আবু সাঈদ খান
উপদেষ্টা সম্পাদক
সমকাল

আলোচক

অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল
মানবাধিকারকর্মী

প্রফেসর ড. এ কে এম রিয়াজুল হাসান
সদস্য (প্রাথমিক শিক্ষাক্রম)
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)

প্রফেসর ড. আবদুল হালিম
পরিচালক
আইইআর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহ্‌মেদ
সদস্য, জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ প্রণয়ন কমিটি

ড. মনজুর আহমদ
প্রফেসর ইমেরিটাস, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
সভাপতি, বাংলাদেশ ইসিডি নেটওয়ার্ক (বেন)

শহিদুল ইসলাম
পরিচালক
নেট্‌জ-বাংলাদেশ

তপন কুমার দাশ
উপপরিচালক
গণসাক্ষরতা অভিযান

মো. আব্দুল হামিদ সরকার
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা
কাউনিয়া, রংপুর

মহিদুল ইসলাম
ইনস্ট্রাক্টর
উপজেলা রিসোর্স সেন্টার
গাইবান্ধা সদর

মো. আকরাম হোসেন
ইনস্ট্রাক্টর
উপজেলা রিসোর্স সেন্টার
ডোমার, নীলফামারী

সানজিদা পারভীন
শিক্ষক
কবি সুফিয়া কামাল আনন্দলোক বিদ্যালয়
গাইবান্ধা সদর

মিতু আক্তার
শিক্ষার্থী
কাজী নজরুল ইসলাম আনন্দলোক বিদ্যালয়
ডোমার, নীলফামারী

মো. আল আমীন মিয়া
শিক্ষার্থী
মোনাজাতউদ্দিন আনন্দলোক বিদ্যালয়
গঙ্গাচড়া, রংপুর

ভিডিও এবং তথ্যচিত্র উপস্থাপনা

গোলাম নবী
পরামর্শক
নেট্‌জ-বাংলাদেশ

সমাপনী বক্তব্য

সোহরাব উদ্দিন মণ্ডল
সদস্য, আনন্দলোক ট্রাস্ট

সঞ্চালনা ও সভাপতিত্ব

রাশেদা কে চৌধুরী
নির্বাহী পরিচালক, গণসাক্ষরতা অভিযান

অনুলিখন

জাহিদুর রহমান
স্টাফ রিপোর্টার
সমকাল

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com