বৃষ্টির পানি শেষ হলে পুকুর-ডোবায় নির্ভরশীল অর্ধলাখ মানুষ

প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২২ । ১৪:৩৭ | আপডেট: ৩১ মার্চ ২২ । ১৭:০৯

ফারুক হোসেন খান, কাঁঠালিয়া (ঝালকাঠি)

রান্না, থালাবাসন ধোয়া ও গোসল— সবই চলে পুকুরের পানিতে

ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া উপজেলার ৬ ইউনিয়নের মধ্যে চেঁচরী রামপুর, পাটিখালঘাটা ও আমুয়া ইউনিয়নের বসানো যাচ্ছে না গভীর নলকূপ, তাই বাধ্য হয়েই বৃষ্টির পানি, পুকুর ও ডোবার পানি পান করছেন মানুষ। রান্না, থালাবাসন ধোয়া, গোসলসহ আনুসাঙ্গিক কাজ করতে হচ্ছে নোনা পানিতে। এ তিন ইউনিয়নের অর্ধলাখ মানুষ বছরের পর বছর ধরে সুপেয় পানির অভাবে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। এতে বছরজুড়েই লেগেই আছে পানিবাহিত রোগব্যাধি।

জানা গেছে, উপকূলীয় জেলা ঝালকাঠির সর্ব দক্ষিণের কাঁঠালিয়া উপজেলার এই ৩ ইউনিয়ন সাগরের কাছাকাছি হওয়ায় নলকূপে পানি ওঠে লবণাক্ত। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বরিশাল জোনালল্যাব একটি ইউনিয়নে পরীক্ষা চালিয়ে আড়াই হাজার থেকে ৩০০০ পিপিএম পর্যন্ত লবণাক্ততা শনাক্ত করে, যা মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর।

১০০০ থেকে ১৫০০ পিপিএম পর্যন্ত লবণাক্ত পানি মানব দেহে সহনশীল। তাই স্থানীয় বাসিন্দারা বৃষ্টির মৌসুমে পানি ধরে রাখেন বড় ট্যাংকে। সেই পানি শেষ হয়ে গেলে শুরু হয় সুপেয় পানির অভাব। দুর্গম এই এলাকার অল্প আয়ের মানুষ বছরের পর বছর ধরেই পুকুর ও ডেবার পানিতে ফিটকিরি অথবা ওষুধ দিয়ে পরিষ্কার করে পান করেন। যাদের সামর্থ নেই, তারা এ নোনা পানি দিয়ে রান্না, থালাবাসন ধোয়া ও গোসলের কাজ সারেন। 

উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী সাইফুর রহমান জানান, তিনটি ইউনিয়নে অগভীর নলকূপ রয়েছে ৯৬টি, এর মধ্যে অকেজো রয়েছে ৮টি। আশির দশক থেকে এ পর্যন্ত সরকারিভাবে পুকুর পাড়ে পানির ফিল্টার (পিএসএফ) স্থাপন করা হয় ১৭২টি। এগুলোর প্রায় সবই অকেজো। পরে লবণাক্ত দূরীকরণ প্লান্ট স্থাপন করে ৪টি, তাও নষ্টের পথে।

তিনি আরও জানান, পানির সমস্যা সমাধানের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। তবে আশার কথা, উপজেলাবাসীকে সুপেয় পানি সরবরাহে সরকার পাইপ লাইন চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে। পর্যায়ক্রমে এটা শহর থেকে গ্রামেও পৌঁছানো হবে। তিনটি ইউনিয়নে সুপেয় পানির স্থায়ী ব্যবস্থায় দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ এবং এর বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

চেঁচরী রামপুর ইউনিয়নের বানাই গ্রামের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য লাভলী বেগম বলেন, আমাদের ইউনিয়নে গভীর নলকূপ বসানো যাচ্ছে না, দু-একটি বসানো গেলেও নোনা পানি ওঠে। আমরা বৃষ্টির পানি ধরে রেখে তা পান করি। এই পানি শেষ হয়ে গেলে পুকুর ও ডোবার পানি ফিটকিরি অথবা বিশুদ্ধকরণ ওষুধ দিয়ে ব্যবহার করি। অনেক সময় এসব পানি নষ্টও হয়ে যায়। যাদের সামর্থ নেই, তারা নোংড়া পানিই ব্যবহার করে। ফলে পানিবাহিত রোগব্যাধি লেগেই থাকে।

পাটিখালঘাটা ইউনিয়নের আবদুর রশীদ মোল্লা বলেন, আমি তিনবার ইউপি সদস্য ছিলাম। সারাজীবনই বৃষ্টির পানি অথবা পুকুরের পানি পান করেছি, প্রতিবেশীদেরও এটা করতে দেখেছি। গোলস ও রান্নার কাজও করতে হচ্ছে এই পানি দিয়ে। সুপেয় পানির স্থায়ী ব্যবস্থার দাবি জানাচ্ছি সরকারের কাছে।

পাটিখালঘাটা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শিশির দাস বলেন, অনেক আগে আমাদের ইউনিয়নে গভীর নলকূপ বসানোর পরীক্ষা করা হয়েছে। আমার মনে হচ্ছে এখন যদি আবার পরীক্ষা করা হয়, তাহলে সুপেয় পানি আসে কি না, দেখা যেতো। সবাই আসলে এখনো বৃষ্টির পানি পান করছে, কেউ আবার পুকুর ও ডোবার পানির ওপরই নির্ভরশীল। এটা অত্যন্ত কষ্টদায়ক।

চেঁচরী রামপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান হারুন অর রশীদ বলেন, আমাদের ইউনিয়নে কোথাও গভীর নলকূপ বসানো যাচ্ছে না। সরকারের পক্ষ থেকে যেসব পিএসএফ ও লবণাক্ত দূরীকরণ প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে, তার বেশিরভাগই অকেজো। আমরা জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সরকারে উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ করেছি, সুপেয় পানির ব্যবস্থার জন্য। লবণাক্ত দূরীকরণ প্লান্ট সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি, এটা প্রতি ওয়ার্ডে দুটি করে স্থাপন করা হলে জনগণের পানির সমস্যা দূর হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুফল চন্দ্র গোলদার বলেন, উপজেলার তিনটি ইউনিয়নেই সুপেয় পানির অভাব রয়েছে। মানুষ এখনো বৃষ্টির পানি ও পুকুরের পানি পান করাসহ অন্যান্য কাজে ব্যবহার করছেন। আমাদের পক্ষ থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করার নতুন একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এটি প্রথমে উপজেলা সদর ইউনিয়নে বসানো হবে। পর্যায়ক্রমে এখান থেকে পানি বিভিন্ন ইউনিয়নে সরবরাহ করা হবে। তবে এ পানি নিতে হলে গ্রাহকদের সামান্য বিল দিতে হবে।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com