বনে দুর্দশা, খাঁচায় কষ্ট

প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ০৩ মার্চ ২২ । ২০:৩৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

জাহিদুর রহমান

গাজীপুরের শ্রীপুরে এখন যেখানে বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক, বহুকাল আগে সেখানটায় ছিল পত্রঝরা বন। বাঘ, হাতি, হরিণ, বানর, ভালুকে পদমুখর ছিল সেই বন। ছিল বুনো প্রাণিকুলের নিরাপদ আবাস ও বিচরণক্ষেত্র। সেই পত্রঝরা বনের প্রাণী নানা কারণে বিলুপ্তির পথে হাঁটতে থাকায় ২০১৩ সালে এই বনকে সাফারি পার্কে রূপ দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল, হারিয়ে যাওয়া বুনো প্রাণী সংরক্ষণ করে প্রজনন বাড়ানো।


২০২২ সালে এসে গাজীপুরের এই বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক নিয়মিতই দিয়ে যাচ্ছে দুঃসংবাদ। সাম্প্রতিক সময়ে এই পার্কে একে একে মারা গেছে ১১টি জেব্রা, একটি করে সিংহ ও বাঘ। মৃত্যু এখনও থেমে নেই। সর্বশেষ গত শনিবার মারা গেছে বিপন্ন একটি 'লেমুর'। শুধু গাজীপুরে নয়; তিন মাসের ব্যবধানে রাজধানীর মিরপুর চিড়িয়াখানায় মারা গেছে বাঘ-সিংহসহ আটটি প্রাণী। মৃত্যুদূত পৌঁছে গেছে চকরিয়ার সাফারি পার্ক ও রংপুর চিড়িয়াখানায়ও। কোনো কোনো সময় প্রাণী মারা যাওয়ার খবর লুকানোও হচ্ছে। একের পর এক প্রাণীর মৃত্যুতে দেশের সাফারি পার্কের সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।


সরকার বলছে, সাফারি পার্ক স্থাপনের ফলে অবৈধ দখল থেকে রক্ষা পাচ্ছে বনভূমি। জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের মানোন্নয়নে নেওয়া হচ্ছে ব্যবস্থা। ফলে বাড়ছে প্রজনন। সাফারি পার্ক ও চিড়িয়াখানায় গিয়ে বিভিন্ন ধরনের দেশি-বিদেশি প্রাণীর সঙ্গে পরিচিত হতে পারছে দর্শনার্থী।


অন্যদিকে গাছপালা ধ্বংস করে জনবসতি, নির্বিচারে প্রাণী নিধন, উন্নয়নকাজ, নানামুখী অব্যবস্থাপনার কারণে প্রাকৃতিক বনেও সুখ নেই বুনো প্রাণীর। বনের প্রাণীদের আবাসস্থল আশঙ্কাজনক হারে কমছে। মানুষের বাড়াবাড়িতে বন থেকে বেরিয়ে লোকালয়ে এসে প্রাণ হারাচ্ছে অনেক প্রাণী।


এ রকম প্রেক্ষাপটে আজ বৃহস্পতিবার 'বিপন্ন বন্যপ্রাণী রক্ষা করি- প্রতিবেশ পুনরুদ্ধারে এগিয়ে আসি' প্রতিপাদ্যে পালিত হচ্ছে বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবস। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করা হচ্ছে।

চিড়িয়াখানা ও সাফারি পার্কে ধুঁকছে বুনো প্রাণী :রাজধানীর মিরপুরে জাতীয় চিড়িয়াখানাসহ সাফারি পার্কের অনুপম নিসর্গ পরিবেশেও ভালো নেই বনের প্রাণী।


বন দাপিয়ে বেড়ানো সিংহ জাতীয় চিড়িয়াখানায় আকারের চেয়ে ছোট খাঁচার মধ্যে পরিমিত খাবার, পুষ্টি আর যত্নের অভাবে এখন হাড্ডিসার। শুধু সিংহ নয়; প্রতিটি প্রাণীরই প্রায় একই অবস্থা। বহু প্রাণী সঙ্গী ছাড়া করছে নিঃসঙ্গ যাপন। রোগাক্রান্ত প্রাণীর চিকিৎসায়ও নেই ভালো ব্যবস্থা। প্রাণীদের চিকিৎসার ভেটেরিনারি হাসপাতালও জরাজীর্ণ। যন্ত্রপাতিতে জমেছে ধুলা। চিড়িয়াখানার তিন হাজার ১০০ প্রাণীর জন্য চিকিৎসক মাত্র একজন। চিড়িয়াখানার পরিচালক মো. আবদুল লতিফ বলেন, চিড়িয়াখানায় শাখাভিত্তিক হলেও আলাদা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রয়োজন। তবে চিড়িয়াখানা নিয়ে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দক্ষ জনবল বাড়ানো সম্ভব হবে।


তবে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিড়িয়াখানা ও সাফারি পার্কগুলোতে প্রাণীদের চাহিদার নূ্যনতম খাদ্য, পুষ্টি, চিকিৎসা, যত্ন, থাকার জায়গা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে সরকার। যেসব প্রাণীর বন্য পরিবেশে মুক্ত থাকার কথা, তাদের জোর করে খাঁচায় বন্দি করে স্বাভাবিক আচরণের বাইরে অসহনীয় পরিবেশে রাখা হচ্ছে। বাণিজ্যিক স্বার্থে স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে বারবার প্রজনন করানো হয়, যা একরকম নিষ্ঠুরতা। পরিবেশবিদরা মনে করেন, জীববৈচিত্র্যপূর্ণ বনভূমিতে সাফারি পার্ক নির্মাণ পরিবেশবিধ্বংসী সিদ্ধান্ত।


গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত আফ্রিকা থেকে ২৫টি জেব্রা কেনা হয়। একই সময়ে ১১টির মৃত্যু হয়। ২০১৭ সালের ১৪ মে পার্কে জেব্রার প্রথম শাবক জন্ম হয়। ২০১৭ থেকে ২০২১ সালের ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ২৫টি জেব্রার শাবক জন্ম হয়। ২০১৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১০টি জেব্রা মারা যায়।


২০০১ সালের ১৯ জানুয়ারি কক্সবাজারের চকরিয়ায় দুই হাজার ২৫০ একর বনাঞ্চলে গড়ে তোলা হয় দেশের প্রথম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক। এর আগে ১৯৮০ সালে এটি ছিল হরিণ প্রজননকেন্দ্র। সেখানে অযত্ন আর অবহেলায় মারা গেছে অনেক প্রাণী। সর্বশেষ ২৩ ফেব্রুয়ারি মারা যায় সিংহরাজ 'সোহেল'।


রংপুর চিড়িয়াখানায় সঙ্গী না থাকায় অনেক বন্যপ্রাণীর প্রজনন ঘটছে না। এই চিড়িয়াখানার ডেপুটি কিউরেটর ডা. মো. আমবার আলী তালুকদার বলেন, চিড়িয়াখানায় তিনজন অ্যানিম্যাল কেয়ারটেকারের পদ থাকলেও কর্মরত একজন, ছয়টি গার্ডের পোস্ট থাকলেও কর্মরত দু'জন।


চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় জায়গার স্বল্পতায় প্রজননে বাধার সৃষ্টি হচ্ছে। চিড়িয়াখানায় জন্মের পর তিনটি বাঘ শাবকের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়াও বানর, চিত্রা উটপাখি, জেব্রা, পাখি ও ঘোড়া মারা গেছে।

কুমিল্লায় অধিকাংশ খাঁচা শূন্য। যে ক'টি আছে, তাও মুমূর্ষু। একটু বৃষ্টি হলে চিড়িয়াখানা ডুবে যায়। ২০১৭ সালের ১১ ডিসেম্বর রাতে চিড়িয়াখানায় থাকা সিংহ 'যুবরাজ' মারা যায়।


বন্যেরা বনে সুন্দর নেই :ওয়াইল্ড লাইফ ট্রাস্ট বাংলাদেশ ও দ্য ওয়ার্ল্ড কনজারভেশন ইউনিয়ন বাংলাদেশ শাখার এক জরিপের তথ্য থেকে জানা যায়, গত ২০০ বছরে বিলুপ্ত হয়েছে দেড়শ প্রজাতির বন্যপ্রাণী। ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড লাইফ ফান্ড এক প্রতিবেদনে জানাচ্ছে, বিশ্বে ১৯৭০ সাল থেকে এ পর্যন্ত বন্যপ্রাণীর সংখ্যা কমেছে দুই-তৃতীয়াংশ। ১০০ বছরে বাংলাদেশ থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে ৩১ প্রজাতির প্রাণী।


সরকারের বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের কারণেও বন্যপ্রাণী হুমকির মুখে বলে মনে করেন পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বলেন, বন-গ্রাম নামক কনসেপ্টে ছোট-বড় গাছের পাশাপাশি জলাধার ও প্রাণীর উপস্থিতি থাকবে। সরকারের বন ব্যবস্থাপনা কর্মসূচিতে বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষা করা যাচ্ছে না। সেখানে গাছ থাকলেও পানি, বন্যপ্রাণী, খাদ্য ও চিকিৎসার (ভেষজ) সংস্থান নেই। ২০২১ সালে এক বছরেই ৩২টি হাতি হত্যা করা হয়েছে।


আপত্তির পরও আরও সাফারি পার্ক :পরিবেশবাদীদের আপত্তি উপেক্ষা করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিনের নির্বাচনী এলাকা মৌলভীবাজারের জুড়ীর লাঠিটিলা সংরক্ষিত বনে বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক করার মহাপরিকল্পনা গত ১৪ ফেব্রুয়ারি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। জুড়ীর লাঠিটিলা সংরক্ষিত বন এলাকায় ওই পার্কে মূলত বিদেশি প্রাণী আনা হবে।


পরিবেশবিদদের প্রশ্ন, গাজীপুরের সাফারি পার্কে বিদেশি প্রাণী আনা হয়েছে, আর সেগুলো সম্প্রতি মারা যাচ্ছে। তাহলে আবারও কেন মৌলভীবাজারে সংরক্ষিত বনের মধ্যে আরেকটি সাফারি পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে? বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি জানিয়েছে, এ প্রকল্পের জন্য শুধু সড়ক নির্মাণ করলেই প্রায় ১০ হাজার গাছ কাটা পড়বে।


বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্ট নেটওয়ার্কের (বেন) প্রতিষ্ঠাতা ড. নজরুল ইসলাম বলেন, সরকারের উন্নয়নধারায় জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রকৃতি সচেতনতার অভাব যেমন রয়েছে, তেমনি প্রকল্পবাজির প্রতি তাদের আগ্রহ বেশি। একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে সাফারি পার্ক করার উদ্ভট চিন্তা তার প্রতিফলন।


বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সভাপতি সুলতানা কামাল বলেন, সংরক্ষিত বনে সাফারি পার্ক হলে বনের পরিবেশ বদলে যাবে। মানুষকে পুনর্বাসন করা সম্ভব। বনের পরিবেশ, জীবজন্তুকে পুনর্বাসন করা সম্ভব নয়। সাফারি পার্ক করতে হলে বিকল্প জায়গায় করা যেতে পারে।


আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ রেজা খান বলেন, চিড়িয়াখানা বা সাফারি পার্কে চিড়িয়াখানায় মানসম্পন্ন পরিচালন পদ্ধতি (স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর) থাকতে হবে। বন্যপ্রাণী রক্ষায় জবাবদিহি থাকতে হবে।

তবে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন বলেন, জুড়ীর সৌন্দর্য ধরে রাখতে হলে সেখানে সাফারি পার্ক নির্মাণ করতে হবে। সে লক্ষ্যে সরকার লাঠিটিলা বনে একটি সাফারি পার্ক নির্মাণ করবে, যাতে সেখানকার জীববৈচিত্র্য রক্ষা পায়।





© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com