শহর ঢাকা

পুরান ঢাকার নকশি রুটির খোঁজে

প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ০২ এপ্রিল ২২ । ১৩:৩২ | প্রিন্ট সংস্করণ

বেনজীর আহমেদ সিদ্দিকী

পুরান ঢাকার সঙ্গে বায়ান্ন বাজার তেপ্পান্ন গলির কি সম্পর্ক? পুরান ঢাকার যে কোনো গলিতে পা বাড়ালেই এর উত্তর মিলবে। অলিগলির মধ্যেই যেন জীবন তার ব্যস্ততা আর কোলাহল নিয়ে মুখর হয়ে আছে। এমনই এক জীবনের কোলাহলে মুখরিত সন্ধ্যায় পুরান ঢাকার নবাবপুরের গলি ধরে হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম রায় সাহেববাজারে। উদ্দেশ্য পবিত্র শবেবরাতের নকশি রুটি দেখা ও কেনা। আদিকাল থেকেই পুরান ঢাকার বাসিন্দারা বিশেষ মর্যাদায় শবেবরাত পালন করে থাকেন। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে শবেবরাতের আয়োজন ও আনুষ্ঠানিকতা আনন্দময়। এরই ধারাবাহিকতায় আগরবাতি, মোমবাতি, তারাবাতি জ্বালানোসহ পুরান ঢাকা সেজে ওঠে আলোকসজ্জায়। এই উদযাপনে বাড়তি মাত্রা যোগ করে ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন রকম হালুয়া ও নকশি রুটি। এই নকশি রুটিগুলো শুধু শবেবরাতকে মাথায় রেখেই বানানো হয়; যা বাংলাদেশে পুরান ঢাকা ছাড়া আর কোথাও পাওয়া যায় না।

এই রুটিকে 'শবেবরাতি রুটি' নামেও ডাকা হয় পুরান ঢাকায়। মাছ, কুমির, চাঁদ, তারা, সূর্য, পাখিসহ বিভিন্ন আকৃতি ও নকশার রুটি দেখতে ভীষণ সুন্দর। এ ছাড়া বর্গাকার, ত্রিভুজাকার, গোলাকার নকশা করা এবং ফুলের আকৃতিতে বানানো অসংখ্য নকশার রুটির দেখা যায় দোকানগুলোতে। বিভিন্ন শুকনো ফলের টুকরো, মুরব্বা ছাড়াও কাচের মার্বেল, রঙিন কাচের টুকরো, পুঁতি বসিয়ে সাজানো হয় এসব রুটিকে; যা নকশি রুটিকে করে তোলে আরও বৈচিত্র্যময়। নকশাখচিত এসব রুটিতে উৎসবের আমেজের পাশাপাশি ফুটে উঠে এই জনপদের সহজ-সরল জীবনযাপনের চিত্রও।

নকশি রুটি দেখতে দেখতে কথা হলো বেশ বয়স্ক মতো জামসেদ চাচার সঙ্গে যিনি প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে শবেবরাতে নকশি রুটি নিয়ে বসছেন জনসন রোডের বিউটি লাচ্ছি ও ফালুদার দোকানের সামনের রাস্তায়। তিনি বললেন, উনিশ শতকের শেষের দিকে ঢাকার নবাবদের হাত ধরে শবেবরাত পালনের ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়। তখন নবাবরা বেশ ঘটা করেই শবেবরাত পালন করতেন। সে সময় শবেবরাতে হালুয়া-রুটি, বিভিন্ন মিষ্টি বিতরণের পাশাপাশি আলোকসজ্জা করা হতো। এভাবেই পুরান ঢাকায় শবেবরাত পালন ধর্ম এবং সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। তিনি আরও যোগ করলেন, এই পুরান ঢাকায় মোগল আমল থেকেই শবেবরাতে রুটি-হালুয়া খাওয়ার রীতি প্রচলিত আছে। শবেবরাতে পুরান ঢাকায় নতুন জামাইরা শ্বশুরবাড়ি বড় রুটি এবং হালুয়া নিয়ে যান। একই সঙ্গে মেয়ের বাড়ি থেকেও শ্বশুরবাড়িতে রুটি ও হালুয়া পাঠানো হয়। এটা আমাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য-আবেগ নিয়ে বলে চলেছেন জামসেদ চাচা। তিনি আরও বললেন, এক সময় শবেবরাতের নকশি রুটির আয়োজনের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল চকবাজার।

চকবাজার বড় মসজিদের সামনে নকশি রুটি ছাড়াও বিভিন্ন পসরা নিয়ে বসতেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। এরপর আস্তে আস্তে পুরান ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। এখন পুরান ঢাকার প্রতিটি এলাকাতেই নকশি রুটি বিক্রির দোকান দেখা যাবে। বিশেষ করে লালবাগের হৃদয় কনফেকশনারি, হক বেকারি, চানখাঁরপুলের আলাউদ্দিন সুইটস, সাতরওজার আনন্দ বেকারি, চকবাজারের বোম্বে সুইটস, রায় সাহেববাজারের ইউসুফ বেকারি, বংশালের আল-রাজ্জাক কনফেকশনারি, ইসলামপুরের কুসুম বেকারিসহ বিভিন্ন বেকারির শবেবরাতের আয়োজন চোখে পড়ার মতো। এ ছাড়া রায় সাহেববাজার, বেচারাম দেউড়ি, নাজিরাবাজার, কলতাবাজার, নারিন্দা, নবাবগঞ্জ, বেগমগঞ্জ, চকবাজারসহ পুরো পুরান ঢাকার গলির রাস্তার ওপর গড়ে ওঠা শবেবরাত কেন্দ্রিক অস্থায়ী দোকানে একই দৃশ্য দেখা যায়। নকশি রুটির পাশাপাশি আছে বিভিন্ন ধরনের হালুয়া। যেমন- বুটের হালুয়া, বিটের হালুয়া, কাজু-পেস্তা বাদামের হালুয়া, গাজরের হালুয়া ও মালাই, লাউয়ের হালুয়া ও দুধ-লাউ, সুজির হালুয়া ইত্যাদি। এগুলো দোকানভেদে প্রতি কেজি ৪০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়। নকশি রুটিও দোকান ও নকশাভেদে প্রতি কেজি ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা করে বিক্রি হয়।

পুরান ঢাকায় অনেকেই বাসায় শবেবরাত উপলক্ষে হালুয়া রুটি তৈরি করেন। তবে নকশি বা ফেন্সি রুটি আর হালুয়া পুরান ঢাকার ঐতিহ্য। তাই বাসাবাড়িতে হালুয়া- রুটি তৈরি হলেও ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে নকশি রুটি আর হালুয়া কেনা এবং বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে দেওয়া পুরান ঢাকায় এক ধরনের বিশেষ রীতিতে পরিণত হয়েছে।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com