‘পাঠ্যবইয়ে মুক্তিযুদ্ধের তথ্য বিভ্রান্তি, অসঙ্গতি আর কবে দূর হবে’

প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২২ । ২১:১০ | আপডেট: ০২ এপ্রিল ২২ । ২১:১০

সমকাল প্রতিবেদক

ছবি: সমকাল

রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় বক্তারা বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার টানা ১৩ বছর ক্ষমতায় রয়েছে। তারপরও প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকে মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে নানা তথ্য বিভ্রান্তি, বিভ্রাট ও অসঙ্গতি রয়েছে। এগুলো আর কবে দূর হবে? তারা সব শ্রেণিতে ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’ নামে পৃথক একটি বই রাখার দাবি জানান।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ল' অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যফেয়ার্স (বিলিয়া) আয়োজিত ‘বিজয়ের ৫০ বছর: পাঠ্যপুস্তকে মুক্তিযুদ্ধ বাস্তবতা ও করণীয়’ আলোচনা সভায় শনিবার বিকেলে এ দাবি উঠে আসে। ধানমন্ডিতে বিলিয়া অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত এ আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন বিলিয়ার চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার এম আমীর উল ইসলাম। অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন তত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল, মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক মো. মশিউজ্জামান, আইন বিচার ও সংসদ বিয়ক মন্ত্রণালয়ের যুক্ত সচিব কাজী আরিফুজ্জামান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিলিয়ার পরিচালক অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান। অনুষ্ঠানে গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিলিয়ার গবেষক আফতাব।

গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়, প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত ‘বাংলাদেশ পরিচিতি’/‘মুক্তিযুদ্ধ’ বিষয়ক কোনো পাঠ্যপুস্তক বা পাঠ উপকরণ নির্ধারিত নেই। একইভাবে নবম, দশম, একাদশ এবং দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্যও ‘বাংলাদেশ পরিচিতি’/‘মুক্তিযুদ্ধ’ বিষয়ক কোনো পাঠ্যপুস্তক বা পাঠ উপকরণ নির্ধারিত নেই। সব শিক্ষার্থীর জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক জ্ঞানার্জনের সুযোগ তৃতীয় থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। কেননা, শুধুমাত্র এই ৬টি শ্রেণিতে (তৃতীয় থেকে অষ্টম পর্যন্ত) ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ শিরোনামে একটা পাঠ্যপুস্তক নির্ধারিত আছে। এই পুস্তকে অন্যান্য বহু বিষয় বিস্তৃত পরিসরে আলোচিত হলেও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ঘটনাবলি শুধুই উল্লেখ করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক আলোচনা তথ্যবহুল নয়। অত্যন্ত ভাসা-ভাসা আলোচনা করা হয়েছে। ২৬ মার্চ থেকে সরাসরি ১৬ ডিসেম্বর সংক্রান্ত আলোচনায় চলে যাওয়া হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস সংক্রান্ত কোনো আলোচনা করা হয়নি। এসব বইয়ে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ে কোনো আলোচনা করা হয়নি। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র সংক্রান্ত আলোচনা কোথাও নেই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং মূল আদর্শসমুহ কোথাও আলোচিত হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক আলোচনার সুনির্দিষ্ট কোনো রূপরেখা ও ধারাবাহিকতা নেই। একেক বইয়ে একেক রকম আলোচনা করা হয়েছে এবং ঘুরেফিরে একই কথা বারবার বলা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, গবেষণাকালে মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে প্রায়োগিক বাস্তবতা জানতে টঙ্গি এলাকার সাতটি শিক্ষাপ্রতিষ্টানের ১০৫ জন শিক্ষার্থীর ওপর একটি জরিপ চালানো হয়। এতে মুক্তিযুদ্ধ কতসালে সংঘঠিত হয় প্রশ্নের উত্তর ১২ শতাংশ ছাত্রছাত্রী দিতে পারেনি, কেউ বলেছে ১৯৫২ সালে, কেউ বলেছে ১৯৪৭ সালে। মুক্তিযুদ্ধের সময়কাল জানা নেই ৬ শতাংশ শিক্ষার্থীর, ভুল উত্তরে তারা কেউ বলেছে ১ বছর, কেউ বলেছে ২৩ বছর। এই যুদ্ধে কতজন শহীদ হন প্রশ্নের জবাবে ৭৬ শতাংশ ভুল উত্তর দিয়েছে। কেউ বলেছে ৫ জন, কেউ ১ লাখ, কেউ ৩ লাখ।

অনুষ্ঠানে বক্তৃতাকালে রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, আমার মনে প্রশ্ন জাগে, পাঠ্যবইয়ে এতো ভুলভ্রান্তি, বিতর্কিত তথ্য সম্বলিত বই মুদ্রণের দায় করা? বইয়ে তো অনেক বিজ্ঞজনের নাম দেখি। ভুলগুলো তাহলে কারা করে, কোথা থেকে হয়? শিক্ষা পরিবারের একজন কর্মী হিসেবে এ প্রশ্নই কবার বার মনে জাগে। তিনি বলেন, জাতীয় শিক্ষানীতিতে বলা আছে, ৫টি মৌলিক বিষয় নুন্যতম অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সবাই পড়বে। সেটা কি আদৌ হচ্ছে, কেউ কি আছে তা মনিটর করার? করোনাকালে মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ৫ শতাংশ থেকে ১২-১৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এই শিক্ষার্থীরা মুল শিক্ষাধারা থেকে ছিটকে পড়েছে।

ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, শিক্ষানীতিতে আমরা ২টি পরীক্ষা রেখে চুড়ান্ত করে এসেছিলাম। কয়েকদিন পরে দেখি ৪টি পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। নীতি পরে খুলে দেখি, সেখানে তিনটি পরীক্ষার কথা বলা আছে। বাস্তবে প্রয়োগ হচ্ছিল ৪টি। আমাদের আমলাদের একটি অংশ মনে করেন, তারা সব বিষয়েই ভালো জানেন। সমস্যা অনেক আছে। এগুলো মোকাবেলা করেই এগিয়ে যেতে হবে সামনে। আমি আশাবাদী মানুষ।

সভাপতির বক্তব্যে ব্যারিস্টার এম আমীর উল ইসলাম বলেন, জরিপে শিশুরা যেভাবে ভুল উত্তর দিয়েছে তা আশংকাজনক। শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় মাপের সংস্কার দরকার বলে মনে করি।

মফিদুল হক বলেন, পাঠ্যপুস্তক জাতির জ্ঞান সৃষ্টিতে ও মানসগঠনে কাজে আসে। প্রাথমিকের ৫টি শ্রেণি একটি মালার মত করে গেঁথে ধারাবাহিক মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শিশুদের শেখাতে হবে। অধ্যাপক মশিউজ্জামান বলেন, পাঠ্যপুস্তক লেখার বিশেষ কৌশল রয়েছেছ এ বিষয়ে দক্ষ লোকের অভাব আমাদের দেশে। বিদেশ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আশা লোকও কম।

অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন অ্যরোমা দত্ত এমপি, এনসিটিবির সাবেক সদস্য অধ্যাপক রতন সিদ্দিকী, প্রথম আলোর যুগ্ম-সম্পাদক কবি সোহরাব হোসাইন।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com