খাদ্য সহায়তা

বিষণ্ণ মুখে এক ফালি আলো

প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ০৬ এপ্রিল ২২ । ০২:৫২ | প্রিন্ট সংস্করণ

মেরিনা লাভলী, রংপুর

রংপুরে খাদ্য সহায়তা পাওয়ায় মনোয়ারা বেগমের মুখে হাসি -সমকাল

বয়স ৮৪। জীবনের শেষবেলায় এসে ফিকে তার মুখের হাসি। শরীরটাও ভেঙে চৌচির। রংপুরের গঙ্গাচড়ার তিস্তাঘেঁষা গান্নারপাড়ে আবদুল মালেকের বাস। দুই ছেলে চার মেয়ে থাকার পরও তিনি 'একা'। এই দুর্দিনে প্রিয় সন্তানরা কেউ নেই তার পাশে। ক্ষুধা পেটে তিন বেলা অন্নের খোঁজে তাকে প্রতিদিনই নামতে হয় অন্যরকম যুদ্ধে। হোক সেটা হাঁড়কাঁপুনে শীত, আগুনঝরা দাবদাহ কিংবা ঝড়ো বারিধারা। আবহাওয়া যা থাক না কেন, মালেকের যেন নেই বিরাম।

তবে প্রতিবার মালেকের জন্য সুখবার্তা নিয়ে আসে রোজা, এবারও এলো। অন্তত এক মাস তার ভাগ্যের আকাশে জমবে না চিন্তার মেঘ! কারণ প্রতিবছরের মতো এবারও রমজানে তিস্তা চরসহ নগরীর অসচ্ছলদের মাঝে এক মাসের খাবার বিতরণ কার্যক্রম শুরু করেছে 'কছির উদ্দিন কল্যাণ ফাউন্ডেশন'। গতকাল দুপুরে তিস্তা নদীর পাড়ে মহিপুর বাজারে এই সংস্থা থেকে চাল-ডাল, ছোলাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য পেয়ে আবদুল মালেকের বিষণ্ণ মুখে নামল এক ফালি আলো। কুঁজো হয়ে সেই খাদ্যপণ্যের বস্তা ঘাড়ে চেপে একাই বাড়ির পথে হেঁটে চলেছেন মালেক। চলার পথে তুলে ধরেন তার জীবনের কষ্টকথা।

মালেক বলেন, 'তিস্তার পাড়োত বাড়ি মোর। কত কষ্ট করি ছাওয়াগুল্যাক বড় করনু। এই শেষ বয়সোত অ্যালা কায়ো মোক দেকে না। মাইষে খাবার দিলে খাই। ছাওয়াগুল্যাক বড় করি জীবনে কী পানু! মোর বাকি জীবন দুঃখ আর দুঃখ। রমজান মাসোত এবারও এক মাসের চাল, ডাল, ছোলা পানু। এইগল্যা খ্যায়া রোজা কোনা থাকবার পারমো।'

গঙ্গাচড়ার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের চর পশ্চিম ইচলীর কছির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে প্রায় দুই হাজার মানুষের আয়োজন। সবার হাতে খাদ্যপণ্যের বস্তা। নিত্যপণ্যের বাজারে আগুন। ঠিক এ সময় এক মাসের খাদ্য সহায়তা পেয়ে সবার মুখে ক্ষণিকের হাসি।

এসকেএসের বাজারের আনোয়ারার (৬৫) স্বামী মজিবুর মারা গেছেন তাও ২০ বছর। এক মেয়ে; স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে সেও থাকে মায়ের বাড়িতে। বুড়ো বয়সে মানুষের বাড়িসহ ক্ষেতে কাজ করে যা রোজগার হয়, তা দিয়ে কোনোমতে চলে তাদের সংসারের চাকা। স্কুলমাঠে খাদ্য সহায়তা নিতে আসা আনোয়ারা বলেন, 'মোর ভিতি দেখার কায়ো নাই। ওজার মাসোত তিস্তা নদীত পানি চলি আইসে। তখন চরোত কোনো কাম থাকে না। এই সময় স্যারের ঘর এক মাসের চাইল-ডাইল, ঈদের লুঙ্গি-শাড়ি দেয়। ওইগল্যা দিয়ে ঈদ-ওজা করি।' খাদ্য সহায়তা নিতে এসেছিলেন মনোয়ারা বেগমও। তিনি বলেন, '১০ বছর ধরি হামরা ওজাত (রোজায়) এইগল্যা সাহায্য পাই। ছাওয়ার ঘর কাউয়ো মোক দেখে না। মায়ের প্যাট কলসির মতন। এই প্যাট ভরে না মা। অ্যালা মাইসের বাড়িত কাম করি খাই।'

তিস্তার চর, নগরীর অসচ্ছল-অবহেলিত প্রায় চার হাজার পরিবারের মাঝে প্রতিবছর রমজানে খাদ্য সহায়তা দেয় কছির উদ্দিন কল্যাণ ফাউন্ডেশন। সংস্থার পক্ষ থেকে ঈদের আগে দেওয়া হয় শাড়ি-লুঙ্গি।

কছির উদ্দিন কল্যাণ ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামরুল হক মানিক বলেন, 'প্রতিবছর রমজানে আমরা নগরীর খেটে খাওয়া অসচ্ছল মানুষ এবং তিস্তা চরের অসচ্ছল ও অবহেলিত মানুষদের এক মাসের খাদ্য সহায়তা দিই। দু-তিন ধাপে এ সহায়তা দেওয়া হয়। অসচ্ছল ব্যক্তিদের তালিকা করে তাদের দেওয়া হয় একটি কার্ড। খাদ্য সহায়তা বিতরণের আগের দিন পুরো এলাকায় করা হয় মাইকিং। কার্ডধারীরা এসে তাদের খাদ্য সহায়তা নিয়ে যান। ভবিষ্যতেও আমাদের এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে এসব অসচ্ছল মানুষের পাশে সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে তারা স্বাচ্ছন্দ্যে রোজা ও ঈদ উদযাপন করতে পারবে।'

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com