নববর্ষ ১৪২৯

সংস্কৃতিচর্চায় পোশাক

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২২ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিপ্লব সাহা

স্বাধীনতা পরবর্তী দেশীয় পোশাকে ফ্যাশন খুঁজতে গেলে আমরা দেখতে পাই তখনকার সিনেমা থেকে পোশাক ডিজাইনের ধারণা নেওয়া হতো। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে আগে বা পরে লক্ষ্য করলে সাধারণ শ্রেণি আর উচ্চবিত্ত শ্রেণি আলাদা করা যেত। কারণ সাধারণ শ্রেণি অতি সাধারণ দিনযাপন করত। উচ্চ শ্রেণির মধ্যেও পোশাক দিয়েই যে চাকচিক্য ফুটিয়ে তুলতে হবে, এ রকম মনোভাব ছিল না। তবে তখন আভিজাত্যটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু বর্তমানে পোশাক দেখে আসলেই মানুষ কোন শ্রেণির, সেটা নির্বাচন করা যায় না। কারণ দেশের পোশাক শিল্পের উন্নয়নের ফলে এবং পোশাকের সহজলভ্যতায় সব শ্রেণির মানুষ মানসম্পন্ন পোশাক পরতে পারছে।

আগের দিনে গ্রাম, শহর থেকে শুরু করে প্রায় সব জায়গায় ছেলেরা লুঙ্গি, গেঞ্জি বড় জোর হাফ শার্ট পরতেন। যারা কৃষিকাজ করত, তাদের প্রায় সবাইকে বিশেষ কোনো উপলক্ষ ছাড়া বেশিরভাগ সময় খালি গায়ে থাকতে হতো। মানুষ খুব কম কাপড়ই ব্যবহার করতেন। দেখা যেত কোনো অনুষ্ঠান হলে একটু ভালো কাপড় পরতেন। আজকের দিনে আসলে ব্যাপারটা আর তেমন নেই। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং কাপড়ের নানাবিধ উৎপাদন থাকায় সবার ঘরেই কম বেশি একাধিক পোশাক থাকে।

ডিজাইন ও মোটিফের বৈচিত্র্যের দিক থেকে আগের তুলনায় কাপড়ের উৎপাদনে বৈচিত্র্য বেড়েছে বহু গুণ। সে সময় থেকে বিশাল একটা পরিবর্তন এসেছে। তবে নিজের দেশে শিল্পকারখানা গড়ে তোলার মন-মানসিকতা হোক বা বিনিয়োগের প্রভাবেই হোক; গার্মেন্টস শিল্প ছাড়া অন্য কোনো ক্ষেত্রে বড় কোনো উদ্যোগ নেই। আমরা যারা দেশীয় পোশাকের উৎপাদনের জন্য দেশ, দেশের মানুষ, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি- সবকিছু নিয়ে ভেবেছি, তারা প্রায় সবাই ব্যক্তিগতভাবেই ভেবেছি, উদ্যোগ গ্রহণ করেছি, পোশাকের মাধ্যমে তা ফুটিয়ে তুলেছি। গত ৩০-৩৫ বছরে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে পোশাক ডিজাইনার, গার্মেন্টস বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানই তুলে ধরেছে। মনে আছে, শৈশবে আমাকেও যে পোশাকগুলো পরানো হতো তার বেশিরভাগই ছিল চায়না পোশাক। ইন্ডিয়ান পাঞ্জাবি পরে দুর্গাপূজা করতাম। তখন আসলে টুকটাক কাজ হতো। কাপড় কিনে এমব্রয়ডারি করে পাঞ্জাবি বানাত সবাই। কিন্তু 'রেডিমেড' বিষয়টা একদম ছিল না। একটি দেশের সংস্কৃতি আসলে পোশাক দিয়েই লালন করা হয়। এই জায়গাটিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে এবং সেটা ঘটেছে ইন্ডাস্ট্রির হাত ধরে। তবে এটা ঠিক, বাঙালির ঐতিহ্যের পোশাকগুলোর মধ্যে তখন যা স্বনামে দাঁড়িয়ে ছিল, তার মধ্যে 'জামদানি' অন্যতম। কিন্তু সেই জামদানি সবার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ছিল না। যদিও এখনও অনেক 'জামদানি' সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। আপনি যখন কোনো কিছু সার্বজনীন করবেন, তখন তা সবার ক্রয়ক্ষমতায় থাকতে হবে।


বাঙালি নারীদের কাছে যে কোনো উৎসবে প্রথম পছন্দ শাড়ি। উৎসবের সঙ্গে শাড়ির সম্পর্ক সেই আদিকাল থেকে। আধুনিক ট্রেন্ড বা প্রচলনের ভিড়ে শাড়ি এখনও তার স্বকীয়তা বজায় রেখেছে। তাই যতই আধুনিক ট্রেন্ড আসুক; উৎসবে শাড়ির রয়েছে আলাদা কদর। ঐতিহ্যবাহী শাড়ির কদর সব সময়। তার ওপর প্রতিনিয়ত কাজের মধ্যে আসছে নতুনত্ব। সাধারণ থেকে শুরু করে বিশেষ ধরনের শাড়ি- সবই তৈরি হয় আমাদের দেশের তাঁতিদের হাতে। আজকাল মেশিনের শাড়িরও বিপুল সমাহার বাজারে। কলের ব্যবহারের ফলে হারাতে বসেছে তাঁতিদের হাতে বোনা সেসব শাড়ি। কভিড মহামারির সময় অনেক শিল্পী রোজগারের আশায় অন্য পেশা বেছে নিচ্ছিলেন। এটা অবশ্যই দেশীয় ফ্যাশন শিল্পের জন্য বড় হুমকির বিষয় হয়ে উঠছিল। সবচেয়ে বড় বিষয়, তারা একবার অন্য পেশায় গেলে তাদের ফিরিয়ে আনা কঠিন।

এই দেশে অনেক সরকার পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু কখনও দেশের সংস্কৃতিকে বিশেষ করে পোশাকের সংস্কৃতিকে লালন করা বা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা কেউ করেনি, এখনও করে না। আমরা যারা পোশাকশিল্প নিয়ে কাজ করছি, আসলে নিজ উদ্যোগে ভালোবেসে করছি; শিকড়ের টানে। আজকে আমি যদি আমার নিজ হাউস বন্ধ করে দিয়ে চায়না পণ্য দিয়ে ভরিয়ে ফেলি, কেউ একবারও জিজ্ঞেস করবে না- কেন করছি? বরং আরও খুশি হয়ে সবাই পাকিস্তানি কাপড়, ইন্ডিয়ান কাপড় কবে আনব সেই খবর নিতে আসবে, কিনতে আসবে। দেশীয় সংস্কৃতি লালনের জন্য কখনও আমাদের কোনো উৎসাহ দেওয়া হয়নি। সে রকম কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি যে, এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা এ কাজে উদ্যমী হবে। ২৭ বছর আগে আমি ১০ হাজার টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলাম। কিন্তু এখন এটা সম্ভব না। এখন যে ছেলেমেয়ে ফ্যাশন ডিজাইন নিয়ে পড়ছে, কাজ করছে তাদের জন্য সরকার থেকে শুরু করে অন্য কোনো সংস্থার কোনো সহযোগিতামূলক মনোভাব নেই। সরকার থেকেও তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। করোনার পর যারা তাঁতি ছিল তাদের অনেকেই তাঁতশিল্পের কাজ ছেড়ে দিয়েছে। আমরা তাদের ফিরিয়ে আনতে পারিনি। কারণ তাদের মধ্যে জীবিকা নিয়ে হতাশা কাজ করেছে। বাংলাদেশের সংস্কৃতি পোশাক শুধু পহেলা বৈশাখ, স্বাধীনতা দিবস কিংবা একুশে ফেব্রুয়ারির ওপর নির্ভরশীল হওয়ার বিষয় নয়। ভালো সংস্কৃতি এখন আমরা আর দেখতে পাই না। গণমাধ্যমগুলোও প্রচার করে না। ভারতীয় সিনেমা, তামিলনাড়ু এসব নিয়েই আমরা ডুবে আছি। আমাদের দেশের সংস্কৃতি বিলীন হয়ে যাচ্ছে। মানুষের আয় ক্ষমতা বাড়ছে। সবই হচ্ছে। কিন্তু আমরা বাঙালি থাকতে পারছি না। আমি ছোটবেলা থেকে পহেলা বৈশাখ পালন করেছি। তখন মাকে দেখতাম সাত দিন আগে থেকে ঘর গোছাতে ব্যস্ত। বাবা ব্যবসার হালখাতা তৈরি করতেন। মাছ, মাংস এসব দিয়েই বৈশাখ কেটেছে আমার। এর পর যখন চারুকলায় ভর্তি হই, তারপরই বৈশাখটা আমার কাছে অন্যরকম হতে শুরু করে। তখন শোভাযাত্রা করতাম, বিভিন্ন মুখোশ বানাতাম। তখন বৈশাখ মানেই লাল, সাদা ছিল। এই রঙের পরিবর্তনটা আমিই করেছি। শুধু লাল, সাদার ব্যাপারটা সরিয়ে বিভিন্ন রঙের সংমিশ্রণ করেছি। কারণ একটা পোশাক যখন কেউ কিনবে একদিনের জন্য কেন পরবে? এই চিন্তা থেকেই বৈশাখে রঙিন পোশাকের উদ্ভব। প্রযুক্তির উন্নয়ন হয়েছে, এখন ডিজিটাল প্রিন্ট হচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনক হলো, এখনও পোশাকের অনেক কাঁচামাল আমাদের বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। কাঁচামাল দেশেই উৎপাদন করা গেলে পোশাক শিল্পে একটা দারুণ পরিবর্তন আসত। সব মিলিয়ে নিজের দেশের সংস্কৃতিকে ব্যবসার সফলতার সাথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারার মধ্যেই নিহিত আমাদের ভবিষ্যতের সফলতা। বাঙালিত্বের চর্চার সফলতা। সবাইকে নতুন বছরের জন্য শুভকামনা। শুভ নববর্ষ।

লেখক
চিত্রশিল্পী ও
ফ্যাশন ডিজাইনার

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com