সরব সাম্প্রদায়িকতায় নীরব রাজনীতি

প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২২ । ০২:৩৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

সমকাল প্রতিবেদক

প্রতীকী ছবি

দেশে মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন ধরনের সাম্প্রদায়িক উস্কানি ও স্থানীয় পর্যায়ে সহিংসতার ঘটনায় সামাজিক স্তরে নিন্দা-প্রতিবাদ উঠলেও মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোকে নীরব থাকতে বা দৃশ্যমান ভূমিকায় না আসতে দেখা যাচ্ছে। বাম-প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক ছোট দলগুলো প্রতিবাদ-প্রতিরোধে সোচ্চার হলেও কিছুই যেন করার নেই বড় দলগুলোর। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও সরকারবিরোধী প্রধান দল বিএনপির ভূমিকা দৃশ্যমান নয়, সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টিও তাই। বড় রাজনৈতিক দলগুলোর এ ক্ষেত্রে নিষ্ফ্ক্রিয় ও নীরব অবস্থান সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে সাহসী করে তুলছে বলে আশঙ্কা করছে দেশের বুদ্ধিজীবী ও নাগরিক সমাজ।

সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সর্বশেষ উদাহরণ হচ্ছে ফেসবুক পোস্টে ইসলাম ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে গত সোমবার রাতে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের আমুরবুনিয়া গ্রামের রমনী বিশ্বাস নামে এক হিন্দু ধর্মাবলম্বীর বসতঘর ভাঙচুর, খড়ের গাদায় অগ্নিসংযোগ ও মন্দির ভাঙচুরের ঘটনা। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনাসহ সহিংসতায় জড়িত ২০ জন গ্রেপ্তার হয়। কিন্তু সহিংসতার বিরুদ্ধে বা আক্রান্তদের পাশে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের এগিয়ে আসতে দেখা যায়নি।

গত ২২ মার্চ মুন্সীগঞ্জের বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মণ্ডল গ্রেপ্তারসহ সাম্প্রতিক সময়ে সংখ্যালঘু নির্যাতনের বেশ কয়েকটি ঘটনায়ও অনেক রাজনৈতিক দলই সরব ছিল না। শিক্ষক হৃদয় মণ্ডলকে নিগ্রহ ও জেলে পাঠানোর ঘটনায় শুধু বাম ঘরানার রাজনৈতিক দল ও সংগঠন সোচ্চার ছিল। তারা রাজধানীর শাহবাগসহ বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে। কিন্তু দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে এই ইস্যুতে সরব ভূমিকা দেখা যায়নি। এর আগে টিপ পরায় রাজধানীর তেজগাঁও কলেজের থিয়েটার অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের প্রভাষক ড. লতা সমাদ্দারকে অপদস্ত করার ঘটনায়ও নীরব এসব রাজনৈতিক দল। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল সমালোচনার মধ্য দিয়ে একটি শক্ত প্রতিবাদ গড়ে ওঠে এবং তাতে প্রশাসনের দ্বারা ভুক্তভোগী পরিবারগুলো প্রতিকার পায়।

বিশ্নেষকরা বলছেন, কেবল সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোই নয়, নিকট অতীতে দেশে যতগুলো সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক দলগুলোর এমন নীরব-নিস্ক্রিয় ভূমিকা দেখা গেছে। সহিংসতার শিকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য ও তাদের পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে দেখা যায়নি নেতাকর্মীদের। এমনকি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বিশেষ করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলো থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য, উপজেলা-ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বার-কাউন্সিলররা কয়েকটি ক্ষেত্রে ঘটনাস্থল পরিদর্শনেও যাননি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা ধর্মীয় সংখ্যালঘু হওয়ায় মূলত ভোটের হিসাব মাথায় থাকার কারণেই রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিরা নীরব অবস্থান নিচ্ছেন- এমন অভিযোগ তুলেছেন অনেকেই।

তারা আরও বলছেন, দেশে যে কোনো সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনার পর তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও রাজনীতি হয়, কিন্তু বিচার হয় না। ফলে থামছে না নির্যাতনের ঘটনাও। ২০১২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বরে রামুতে বৌদ্ধপল্লীতে হামলার ঘটনা ঘটে। দশ বছর পার হলেও কোনো বিচার এখনও হয়নি। এই ঘটনায় মোট ১৯টি মামলা হয়েছিল। মাত্র একটি মামলার চার্জশিট হলেও বিচার শুরু হয়নি। ২০১৬ সালের ২৯ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দু বসতিতে হামলার তদন্ত ছয় বছরেও শেষ হয়নি। ওই সময় যাদের আটক করা হয়েছিল তারাও জামিনে মুক্ত। একইভাবে গত বছর ১৩ অক্টোবর কুমিল্লার নানুয়াদীঘির পাড়ের পূজাম পে হামলা চালানো হয়। এরপর আরও বেশকিছু পূজাম পে হামলা করা হয়। কিন্তু সেসব ঘটনারও তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। একইভাবে রংপুর, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও ভোলায় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার তদন্ত শেষ হয়নি।

ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী অবশ্য সমকালকে বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের সাম্প্রদায়িক ঘটনাগুলো আওয়ামী লীগ বা বিএনপির বিষয় নয়। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের সঙ্গে এসব ঘটনা জড়িত। আর এসব ঘটনা ঘটিয়ে ওইসব স্বার্থান্বেষী মহল সুযোগ খুঁজতে থাকে।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত বলেন, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বিএনপি-জামায়াত আমলে যা ছিল, এখন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও সেটাই আছে। বরং মনে হচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে এটা আরও বেড়ে গেছে। আর আওয়ামী লীগ বা বিএনপি কোনো আমলেই সাম্প্রদায়িক সহিংসতা প্রতিরোধে কোনো ভূমিকা নেওয়া হয় না। ফলে আজকে দেশের সংখ্যালঘুরা অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে সরকারকে দৃশ্যমান ভূমিকা রাখতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকেও ঐকমত্যে আসতে হবে।

অবশ্য বড় রাজনৈতিক দলগুলো থেকে সংখ্যালঘু নির্যাতন বিষয়ে নীরব থাকার অভিযোগ অস্বীকার করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, এখন পর্যন্ত যতগুলো সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, তার সবগুলোর প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ক্ষেত্রেই আওয়ামী লীগের সরব ভূমিকা ছিল। তাৎক্ষণিক নির্দেশনায় দলের নেতাকর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছেন। প্রশাসনের মাধ্যমেও সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আওয়ামী লীগ তার প্রতিষ্ঠার পর থেকেই অসাম্প্রদায়িক আদর্শ লালন-পালন করেছে। আওয়ামী লীগ সবসময় সচেতনভাবে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা তথা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে কাজ করে চলেছে।

তিনি বলেন, যে কোনো সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঘটামাত্রই আওয়ামী লীগ তার প্রতিবাদ-প্রতিরোধে তৎপর থাকে। দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে পাঠিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণসহ নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সহযোগিতা করা হয়। একইভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনকেও সহযোগিতা করা হয়। আওয়ামী লীগ সাম্প্রদায়িক অপশক্তির সঙ্গে কোনো আপস করে না, করবেও না।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সংখ্যালঘু নির্যাতন ইস্যুতে প্রতিবাদে বিএনপি বরাবরই গুরুত্ব দিয়ে থাকে। সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনাতে বিএনপি মাঠে থেকে প্রতিবাদ করেছে। গত বছর কুমিল্লায় নানুয়াদীঘির পাড়ের পূজাম পে তাণ্ডবের প্রতিবাদে তদন্ত টিম গঠন করে প্রকৃত তথ্যকে জাতির সামনে উপস্থাপন করেছে বিএনপি প্রতিবাদ করেছে।

তিনি বলেন, তবে মুন্সীগঞ্জের শিক্ষক হৃদয় মণ্ডলের ঘটনাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হলেও এটি ব্যক্তিগত ইস্যু। এখানে সাম্প্রদায়িক কোনো ঘটনা নেই। তাই ব্যক্তিগত ইস্যুতে বিএনপি কোনো ভূমিকা নেয়নি বা নেবেও না।

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি বলেন, 'আমরা তো পুরো চেষ্টা করি সাম্প্রদায়িক সহিংসতাগুলো প্রতিরোধ করে একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তোলার পথকে প্রশস্ত করতে। আমরা প্রতিনিয়ত এ নিয়ে কথাও বলছি। কিন্তু ঘটনা হচ্ছে, বড় দলগুলো বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দল ও সরকার তো এর বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয় না, কথাও বলে না। উল্টো কোথাও কোথাও ক্ষমতাসীন নেতাকর্মীরাই সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে বা অংশ নিচ্ছে। এটাই মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।'

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু এমপি বলেন, জাসদসহ অন্য প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দলগুলো সাম্প্রদায়িক সহিংসতা প্রতিরোধে যথাসাধ্য ভূমিকা রাখছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বড় দলগুলোর মধ্যে বিশেষ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মুখে অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বললেও নির্বাচনী রাজনীতির কৌশলগত মধ্যপন্থা অনুসরণ করতে গিয়ে সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড প্রশমনে উদ্দেশ্যমূলক উদাসীনতা প্রদর্শন করছে। আর বিএনপি ও তার জোটভুক্ত দলগুলো সরকার উৎখাতের জন্য সাম্প্রদায়িক উগ্রবাদী অপশক্তিগুলোকে নিজেদের কোলে টেনে নিয়েছে। এই কারণে বাধ্য হয়েই তারা উগ্রবাদী সহিংসতার ক্ষেত্রে নীরবতা পালন করছে। ফলে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা তো কমছেই না, বরং বেড়েই চলেছে।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, দেশের প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো বিশেষত বামপন্থি দলগুলো তাদের সব শক্তি দিয়ে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বহুমুখী ধারায় লড়াই অব্যাহত রেখেছে। কমিউনিস্ট পার্টির নেতাকর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিটি ঘটনায় ছুটে গিয়েছে, নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দলগুলোর এমন ভূমিকাই ভবিষ্যৎ আশার জায়গা দেখাচ্ছে। তিনি বলেন, কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, বড় দলগুলো এই সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলোকে উস্কানি দিচ্ছে, প্রশ্রয় ও মদদও দিচ্ছে। তারা কে কত বড় সাম্প্রদায়িক এটা নিয়েও নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করছে। ক্ষমতায় আসতে দেশে এখন আর ভোটের প্রয়োজন না হওয়ায় এবং যেনতেনভাবে ভোট চুরি করে ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ গড়ে ওঠায় তারা এখন আর সংখ্যালঘু কিংবা সাধারণ মানুষের স্বার্থে কোনো কাজ-ই করে না।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com