নিজেকেই ভাবুন নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী

প্রেরণা

প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ১৭ এপ্রিল ২২ । ১১:২১ | প্রিন্ট সংস্করণ

শাহনওেয়াজ টটিু

ইয়েলেনা ইসিনবায়েভা , [জন্ম :৩ জুন ১৯৮২; রাশিয়া] -ছবি : অনলাইন

ইয়েলেনা ইসিনবায়েভা। দু'বার অলিম্পিক স্বর্ণজয়ী ও বর্তমান বিশ্ব রেকর্ডধারী রাশিয়ান সাবেক পোল ভল্ট খেলোয়াড়। সর্বকালের সেরা এই নারী পোল ভল্টারের সাক্ষাৎকার থেকে অনুপ্রেরণামূলক অংশ অনুবাদ করেছেন শাহনেওয়াজ টিটু


প্রথম নারী খেলোয়াড়


আমার বয়স যখন পনেরো, জিমন্যাস্টিক্সের কোচ বললেন, 'পোল ভল্টে চেষ্টা করে দেখবে নাকি? কেননা, জিমন্যাস্টিক্সে মাস্টার হওয়ার কোনো সুযোগ তোমার নেই।' না বলে দিলাম। কারণ, পোল ভল্ট খেলাটা কেমন- সেটিই জানতাম না আমি। এ খেলার নামও শুনিনি তখন পর্যন্ত। কোচ বললেন, 'ঠিক আছে, একটু চেষ্টা করে দেখ। তোমার যদি ভালো না লাগে, তাহলে জিমন্যাস্টিক্সে ফিরে এসো আবার।' তিনি আমাকে ভলগোগ্রাদের তখনকার একমাত্র কোচ ইয়েভজেনি ত্রোফিমভের কাছে নিয়ে গেলেন। আমিই ছিলাম এই কোচের কাছে প্র্যাকটিস করা প্রথম নারী খেলোয়াড়।

দুই মাস পর তিনি খেয়াল করলেন, আমার মধ্যে এ খেলায় অসাধারণ কিছু করে ফেলার সম্ভাবনা রয়েছে। তাছাড়া মেয়েদের জন্য খেলাটি তখনও নতুন। ফলে পোল ভল্টে নিজের নাম ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ আসে আমার সামনে। আমিও নিজের নাম লিখিয়েছি, আর খেলে গেছি।

প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়াই প্রথম লক্ষ্য

২০০২ সালে শীত মৌসুম ভালোভাবেই শুরু করতে পেরেছিলাম আমি। কোচ ইয়েভজেনি ত্রোফিমভের তত্ত্বাবধানে খুব দ্রুতই ফল পেয়েছিলাম বলে খুশি ছিলাম আমি। আর 'ওয়ার্ল্ড ইনডোর চ্যাম্পিয়নশিপ'-এ স্বর্ণপদক জয় আমাকে এনে দিয়েছিল আসন্ন অলিম্পিক গেমসে সফল হওয়ার আত্মবিশ্বাস। স্টকহোমে আমার বিশ্ব রেকর্ড আমাকে আবারও র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে এনে দেয়। এ এমনই এক অনুভূতি, যা ভেতর থেকে প্রেরণা জোগাচ্ছিল- আমার পক্ষে ৫ মিটার কিংবা তারও বেশি উচ্চতা পার হওয়া সম্ভব। তবে বিশ্ব রেকর্ডের গুরুত্ব আমার কাছে দ্বিতীয় অবস্থানে; কেননা, কোনো প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়াটাই আমার প্রথম লক্ষ্য।

হতাশা ও হঠাৎ বিশ্রাম

বছরের পর বছর ধরে, প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে নিতে, আমার দেহ-মন ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। একটার পর একটা প্রতিযোগিতায় জিতে যাচ্ছি, অথচ নতুন বিশ্ব রেকর্ড করতে পারছি না- এ নিয়ে নিরন্তর প্রত্যাশার চাপ ছিল আমার ওপর। প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য মেয়েরা যখন উচ্চতা অতিক্রম করে উচ্ছ্বাসে মাতোয়ারা, সমান উচ্চতা পাড়ি দেওয়ার পর আমার অনুভূতি হতো বিষাদমাখা। কেননা, একই উচ্চতা তো আমি বহুবার পাড়ি দিয়েছি; ফলে প্রতিযোগিতায় জিতে গেলেও নতুন কোনো গল্প তো লেখা হলো না! ফলে ব্যাপারটা একই সঙ্গে কঠিন ও মর্মযাতনার ছিল আমার জন্য। নিজেকেই বললাম, 'ব্যাপারটাকে পাত্তা না দিয়ে, খানিকটা বিরাম নেওয়া যাক। এ সময় অন্যদের পারফর্ম দেখে কাটানো যাক সময়।' ফলে প্রতিযোগিতা, ট্রেনিং- এক কথায় পোল ভল্ট সম্পর্কিত সব ব্যস্ততা থেকে খানিকটা বিশ্রাম নিয়েছিলাম আমি।

নিজেই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী

২০১০ সালে নেওয়া সেই বিরতি সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তই হয়ে উঠেছিল আমার জন্য। আরেকটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, পুরোনো কোচ ইয়েভজেনিকে পুনঃনিযুক্ত করার। আমি মনে করি, ইয়েভজেনির সঙ্গে কাজ করা ছিল আমার জীবনের সেরা সিদ্ধান্ত। কেননা, তার ওপর আমার আস্থা ছিল; পোল ভল্টার হিসেবে আমি গড়ে উঠেছি তারই হাতে। তিনি আমাকে নিজের কন্যার মতো ভালোবাসেন। তাকে আমি স্রেফ একজন কোচ হিসেবে দেখিনি। তিনি একাধারে আমার কোচ, আমার বন্ধু এবং আমার দ্বিতীয় পিতা। তার ওপর আমার আস্থা শতভাগ। তার অধীনে নিজেকে শতভাগ আত্মবিশ্বাসী অনুভব করি আমি। প্রথম প্রথম যখন ইয়েভজেনির অধীনে কোচিং করতাম, তখন কিছুই হারাইনি আমি। মিস করিনি কোনো প্রতিযোগিতাই। সব বিশ্ব রেকর্ড ভেঙে, সব বড় প্রতিযোগিতা জিতে নিয়েছিলাম। ২০০৪ সালে আটটা বিশ্ব রেকর্ড ভাঙি আমি। এর পরের বছর ৯টা। এরপরও যদি তার সঙ্গেই থাকতাম, তাহলে হয়তো ত্রিশটি, কিংবা কে জানে, হয়তো চল্লিশটি বিশ্ব রেকর্ড ভেঙে ফেলাও সম্ভব ছিল আমার পক্ষে। নিজেকেই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে গেছি সব সময়।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com