দিবস

পর্যটন ঐতিহ্যের সমন্বয় চাই

প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২২ । ০২:৫১ | প্রিন্ট সংস্করণ

মো. রিফাত-উর-রহমান

ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল ফর মনুমেন্টস অ্যান্ড সাইটস ১৯৮২ সালে তিউনিসিয়ায় একটি আলোচনা সভায় ১৮ এপ্রিলকে 'ইন্টারন্যাশনাল ডে ফর মনুমেন্টস অ্যান্ড সাইটস' হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৩ সালে দিনটি 'বিশ্ব ঐতিহ্য দিবস' হিসেবে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের তাগিদ থেকে মূলত দিনটি পালন করা হয়ে থাকে এবং এবারও হচ্ছে।

বঙ্গীয় উপত্যকার গাঙ্গেয় ও নিম্ন ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় গড়ে ওঠা এই ভূমিতে হাজার বছর ধরে চলমান বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি সম্পর্কে বিশদাকারে অনুসন্ধান করার জন্য এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিজ্ঞানভিত্তিক প্রত্নতত্ত্ব চর্চার প্রয়োজন। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা এখনও প্রত্নতত্ত্ব চর্চাকে সনাতনী কায়দায় রাজনৈতিক ইতিহাসের খোলসে আবদ্ধ রেখেছি। প্রত্নতত্ত্ব বলতে শুধু রাজনৈতিক ইতিহাসের বিষয়টি কেন আমাদের ভাবনায় চলে আসে? আমরা কেন আমাদের প্রত্নস্থলকে বহুমাত্রিক ভাবনা থেকে পর্যবেক্ষণ করছি না?

প্রত্নস্থল উৎখননকে বলা হয়ে থাকে 'ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়া'। এ কারণে প্রত্নস্থল উৎখননের পরে তার যথাযথ ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিশেষজ্ঞ জ্ঞান প্রয়োগ প্রয়োজন। প্রত্নবস্তুর বিজ্ঞানভিত্তিক পরীক্ষা-নীরিক্ষার জন্য উন্নতমানের ল্যাব প্রয়োজন। একই সঙ্গে আধুনিক ও উন্নতমানের প্রযুক্তিগত জ্ঞান ছাড়া প্রত্নস্থল সংরক্ষণ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। স্বাধীনতার ৫০ বছরে এ দেশে পূর্ণাঙ্গভাবে জাহাঙ্গীরনগর ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের একাডেমিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। অপূর্ণাঙ্গভাবে রয়েছে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্বের অনেক দেশ তাদের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ইতিহাস পঠন-পাঠনের জন্য বিজ্ঞানসম্মত প্রত্নতত্ত্ব চর্চা শুরু করেছে। আর আমরা? গতানুগতিক 'চাকরি বাজার'কে লক্ষ্য ধরে পাঠ্যক্রম সাজিয়েছি।

কিছুদিন আগে মহাস্থানগড়ের প্রত্নস্থলগুলো নিয়ে একটি গবেষণা করতে গিয়ে আমরা ভীষণভাবে হতাশ। প্রায় ২৩০০ বছরের পুরোনো একটি সমৃদ্ধ নগরকেন্দ্রকে কতটা অবহেলা আর অযত্নে আমরা ফেলে রেখেছি! প্রশিক্ষিত কোনো পর্যটক গাইড নেই সেখানে। উয়ারী-বটেশ্বর কিংবা মহাস্থানগড়ের মতো বিশালাকৃতির নগরকেন্দ্র ছাড়াও বাংলাদেশে ইউনেস্কো স্বীকৃত দুটি বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে- বাগেরহাট ষাটগম্বুজ মসজিদ শহর ও সোমপুর মহাবিহার (পাহাড়পুর)। দুটি প্রত্নস্থল বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে এরই মধ্যে মর্যাদা পেয়েছে। তাহলে আমরা কেন সেগুলোর জন্য বিশেষ পরিকল্পনা প্রণয়ন করব না?

১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো সোমপুর মহাবিহারকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদা দেয়। এর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল প্রায় এক হাজার ২০০ বছর আগে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য সোমপুর মহাবিহারে আসতেন। সেটি ছিল একটি আবাসিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আপাতদৃষ্টিতে আমরা খুব গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, আমাদের সোমপুর মহাবিহার ছিল বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। এ প্রতিষ্ঠানে অনেক শিক্ষকের মধ্যে ছিলেন শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর, যার জন্ম বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রামে। আমরা কি আমাদের সোমপুর মহাবিহারকে বিশ্বদরবারে উপস্থাপন করতে পারছি?

প্রত্নস্থল সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ইউনেস্কো নীতিমালা, ভেনিস সনদ, নারা চার্টার ইত্যাদি আন্তর্জাতিক আইন রয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনগুলো প্রয়োগের আগে নিজের দেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিপ্রেক্ষিত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশে সবকিছু আইন দিয়ে বাস্তবায়ন করা অনেক দুরূহ বিষয়। পরিত্যক্ত প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণের নামে 'লিভিং হেরিটেজ'কে কোনোভাবেই ধ্বংস করা সমীচীন হবে না। পাশাপাশি, পর্যটন শিল্পের সঙ্গে এ দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহের সমন্বয় ঘটাতে হবে। শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশ হবে পর্যটকদের আকর্ষণের অন্যতম প্রধান গন্তব্য। যদি ঐতিহ্যকে বাঁচাতে চাই, ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণা করতে চাই, তাহলে অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিজ্ঞানভিত্তিক প্রত্নতত্ত্ব বিষয় চালু করতে হবে।

এ বিষয়কে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য কলেজগুলোতে স্নাতক পর্যায়ে প্রত্নতত্ত্ব রাখা প্রয়োজন, যাতে শিক্ষার্থীরা বিসিএস দিয়ে এই বিষয়ে শিক্ষকতা করার সুযোগ পায়।

মো. রিফাত-উর-রহমান: শিক্ষক, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বাংলাদেশ অধ্যয়ন বিভাগ, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়
rifat218@gmail.com

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com