দিনে 'অচল' ড্রেজার রাতে সচল

প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২২ । ১২:৪৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

মুকিত রহমানী, সিলেট ও শাহ আখতারুজ্জামান, ছাতক

ছাতক ও দোয়ারাবাজারের মধ্যবর্তী পশ্চিম নৈনগাঁও এলাকার সুরমা নদীতে রাখা ড্রেজার মেশিন- সমকাল

সুনামগঞ্জের ছাতক-দোয়ারাবাজার নৌপথ। সুরমা নদীর এই নৌপথে এখন পাহারা দেয় নৌপুলিশ। কয়েক বছর আগেই ছাতক নৌবন্দর ঘোষণার পর নৌপুলিশও মোতায়েন করা হয়। নৌপুলিশের পাশাপাশি সেখানে থানা পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের নজরদারি রয়েছে। নৌপথকে ঘিরে ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলার কয়েকটি স্থানেও বালু-পাথর উত্তোলন দীর্ঘদিন ধরে চলছে। গেল বছর ছাতকে চেলা নদী বালুমহালে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনে বাধা দেওয়ায় নৌপুলিশের ওপর হামলা হয়। তারপরও বন্ধ হয়নি নদীপথে অবৈধ সব কার্যক্রম। বরং থেমে থেমে ও কৌশলে চলছে বালু উত্তোলন। এমনকি ড্রেজার মেশিনও ব্যবহার করছে বালুখেকোরা। প্রশাসনের পদক্ষেপের কারণে সম্প্রতি বিভিন্ন স্থানে বালু উত্তোলন বন্ধ থাকলেও নৈনগাঁও এলাকার নদীর ড্রেজার মেশিনটি বন্ধ হয়নি। ছাতক ও দোয়ারা উপজেলার নৌপথের মধ্যবর্তী ওই এলাকায় বসানো ড্রেজার মেশিনটি কৌশলেই পরিচালনা করছেন প্রভাবশালীরা। দিনে বন্ধ রেখে রাতে চালু করা হয় সেটি। রাত হলেই ড্রেজার মেশিনটি খাবলে খায় ওই এলাকার নদীর বুক। অথচ 'এমবি ভোরের আলো ড্রেজার' মেশিনটি অচল বলে থাকে বালুখেকোরা। প্রশাসনও তা বিশ্বাস করে হাতগুটিয়ে বসে আছে!

১২ মার্চ উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি (এসিল্যান্ড) অভিযান চালিয়ে দুই শ্রমিককে আটক করলেও ড্রেজারটি ছাতক যাওয়ার পথে নষ্ট হয়ে যায় দাবি করে দুই শ্রমিকদের ছাড়িয়ে নিয়ে আসা হয়। অথচ 'অচল বা নষ্ট' ড্রেজারটি প্রতিরাতে সচল হয়ে ওঠার প্রমাণ মিলেছে। এ বিষয়ে নৌপুলিশের এসপি শম্পা ইয়াসমিন নদীপথে তাদের নজরদারি রয়েছে উল্লেখ করে সমকালকে জানিয়েছেন, ছাতক-দোয়ারায় যারা নদীপথে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, আমরা লোক পাঠিয়ে ড্রেজারটি ওই এলাকায় পাইনি। যদি কেউ এক জায়গায় রেখে অন্য জায়গা থেকে রাতে বালু উত্তোলন করে তবে আমাদের বিকল্প ভাবতে হবে।

১১ মার্চ সরেজমিন দেখা যায়, দিনে ড্রেজারটি রাখা হয়েছে নৈনগাঁওয়ের পশ্চিম এলাকার নদীতে। গ্রামের শাহী ঈদগার সামন থেকে নদী এলাকায় গেলে সেটি চোখে পড়ে। ড্রেজারের সঙ্গে রাখা হয়েছে ছোট আরেকটি নৌকাও। যা দিয়ে শ্রমিকরা নদীর পাড়ে উঠে আসে। ১৪ মার্চ ড্রেজারটি আগের স্থানে দেখা যায়নি। কারণ দোয়ারাবাজার উপজেলা ঘাটের পাশে সেটি নোঙর করে রাখা হয়েছে। রাত হলেই তা স্থানান্তর করে নৈনগাঁওয়ের পাশে নিয়ে আসা হয়। সেখানে নদীতে নোঙর ফেলে চলে সারারাত বালু উত্তোলন। এভাবে নানা কৌশলে দীর্ঘদিন ধরে ড্রেজার মেশিনটি চালিয়ে আসছেন স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী। সম্প্রতি দিনের বেলায় বালু উত্তোলন করা ওই ড্রেজারের একটি ভিডিও ফুটেজও সমকালের কাছে রয়েছে। বর্তমানে প্রতিরাতে ১০-১২টি নৌকা ও বাল্ক্কহেড বোঝাই করে বালু বিক্রি করা হচ্ছে। ড্রেজার চলাকালে নদীর তীরে লোকজনকে পাহারা দিতেও দেখা যায়।

বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে এলাকার দুটি পক্ষও রয়েছে মুখোমুখি অবস্থানে। সর্বশেষ বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২২ মার্চ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফয়সল আহমদ অভিযান চালায়। দুই শ্রমিককে ধরে নিয়ে গেলেও তাদের সতর্ক করে ছেড়ে দেওয়া হয়। ড্রেজার মেশিন জব্দ কিংবা জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো মামলাও করা হয়নি। ড্রেজার নষ্টের দোহাই দিয়ে রক্ষা পেয়ে যায় বালুখেকোরা। এর আগে ১৯ মার্চ দোয়ারাবাজারের চিলাই নদীতে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের দায়ে মেশিন মালিককে জরিমানা করা হয়। ৮ ফেব্রুয়ারি ছাতকের সুরমা নদীতে বালু উত্তোলনের অভিযোগে ৩ জনকে ১৫ হাজার জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া গত বছর একাধিক অভিযান করা হলেও থেমে থাকেনি নৈনগাঁও এলাকা থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, নদীর নব্যতা সংকটের কারণে কিছু এলাকায় ড্রেজিং করা হচ্ছে। ছাতকের লক্ষ্মীবাউর, বেতুরা ও দোয়ারাবাজার পরিষদ কমপ্লেক্স সংলগ্ন এলাকায় নদীভাঙন থেকে রক্ষা ও সুরমা নদীর তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় ড্রেজিং করা হচ্ছে। ২০২০ সালের ২০ ডিসেম্বর সেই ড্রেজিং শুরু হয়। ১৫ কোটি ২৪ লাখ ৫৫ হাজার ৬৬৩ টাকার ওই কাজ ২০২৩ সালের ৩১ মার্চ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু পাউবোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাদের নাকের ডগায় প্রভাবশালীরা বালু উত্তোলন করছে। দেখলে মনে হবে, পাউবোর লোকজন ড্রেজিং করছে। এ বিষয়ে পাউবো সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী শামসুদ্দোহা বলেন, ছাতক ও দোয়ারার কয়েকটি জায়গায় আমাদের ড্রেজিং চলছে। এর বাইরে কেউ বালু উত্তোলন করলে সেটা উপজেলা প্রশাসন দেখে থাকে। যদিও আমাদের দায় রয়েছে ব্যবস্থা নেওয়ার।

অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় নৈনগাঁওয়ের বাসিন্দা ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল খালিকের নেতৃত্বে তার ভাই মাসুক, ছালিক ও চাচাতো ভাই সানুর আলীসহ কিছু লোক বালু উত্তোলন করছে। বছর দেড়েক থেকে কৌশলে বিভিন্ন স্থান থেকে তারা কৌশলে বালু উত্তোলন করছে বলে জানিয়েছেন গ্রামের একাধিক বাসিন্দা। অভিযোগ প্রসঙ্গে আব্দুল খালিক সমকালকে বলেন, বিআইডব্লিউটিএর দুটি ড্রেজার চালু আছে। তারা বালু উত্তোলন করে উভয়পাড়ে দিচ্ছে। এর বাইরে কোনো ড্রেজার মেশিন নেই বলে দাবি করেন তিনি। যদিও তার বাড়ির দুইশ গজের মধ্যে 'এমবি ভোরের আলো' নামের ড্রেজার মেশিন দেখা গেছে। যা তারাই নিয়ন্ত্রণ করছেন। নদীতে অবৈধ ড্রেজার মেশিন প্রসঙ্গে নৈনগাঁওয়ের আরেক বাসিন্দা ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল বারী সমকালকে বলেন, আমরা বারবার প্রতিবাদ করছি তা বন্ধ করার জন্য। উপজেলা প্রশাসনকেও বলেছি। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। প্রতিরাতেই লক্ষাধিক ঘনফুট বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেবাংশু কুমার সিংহ বলেন, আমাদের কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ এসেছে। অভিযান চালানো হয়েছে। বালু উত্তোলনকালে তাদের পাওয়া যায়নি।

ছাতক-দোয়ারার সুরমা নদীতে ড্রেজার মেশিনসহ বিভিন্ন উপায়ে বালু ও মাটি উত্তোলন প্রসঙ্গে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে উপজেলা প্রশাসনকে বলা হয়েছে। ইতোমধ্যে একাধিক অভিযান করে জরিমানা ও ড্রেজারও জব্দ করা হয়। নৈনগাঁও এলাকার ড্রেজার মেশিন কারা চালাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান জেলা প্রশাসক।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com