বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট

সরকারি উদ্যোগ কাজে আসছে না উপকূলে

প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ২১ এপ্রিল ২২ । ০২:৩১ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাগেরহাট সংবাদদাতা

বাগেরহাটে পিএসএফ থেকে পানি নেওয়ার আগে কলস দিয়ে পানি ঢালছেন এক নারী। অপেক্ষায় আছেন আরও অনেকে - সমকাল

বাগেরহাটের উপকূলজুড়ে বিশুদ্ধ পানির ভয়াবহ সংকট দেখা দিয়েছে। তীব্র তাপদাহে শুকিয়ে গেছে মিঠাপানির পুকুর-জলাধার। নলকূপের পানি নোনা। পানি সংগ্রহ করতে পাড়ি দিতে হচ্ছে কয়েক কিলোমিটার পথ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর মিলছে এক কলস পানি। এ অবস্থায় হাজার হাজার মানুষ ডায়রিয়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। সংকট নিরসনে সরকার কয়েক বছরে শত শত কোটি টাকা খরচ করলেও মেলেনি দীর্ঘমেয়াদি কোনো সুফল। প্রতিবছরই শুস্ক মৌসুমে বাগেরহাটের রামপাল, মোংলা, মোরেলগঞ্জ, কচুয়া ও সদর উপজেলায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডর আঘাত হানার পর নষ্ট হয়ে যায় সুপেয় পানির বেশিরভাগ উৎস। এরপর আরও প্রকট রূপ নেয় বিশুদ্ধ পানির সংকট।

বিশুদ্ধ পানির চাহিদা মেটাতে সিডরের পর সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বসানো হয় শত শত পিএসএফ (পন্ড স্যান্ড ফিল্টার বা পুকুরের পানি বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া)। কিন্তু এর বড় অংশই অকার্যকর হয়ে আছে। যেসব সচল ছিল, পুকুর শুকিয়ে যাওয়াও সেসবেরও বেশিরভাগ কাজে আসছে না।

মোংলার চাঁদপাই ইউনিয়নের মালগাজী গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হায়াত মজুমদার জানান, তাদের গ্রামের একটি পুকুরের ওপর নির্ভরশীল সহস্রাধিক পরিবার। তবে বেশিরভাগ পানি শুকিয়ে যাওয়ায় ও লবণাক্ত হয়ে পড়ায় পুকুরটি কাজে আসছে না। বাধ্য হয়ে দূরবর্তী বিভিন্ন এলাকা থেকে পানি আনছেন স্থানীয়রা। ক্ষেত্রবিশেষে পাড়ি দিতে হচ্ছে ৫ থেকে ১০ কিলোমিটার পথ।

৫০ কলস পানি ঢালতে হয় ৫ কলস পানি তুলতে : শরণখোলা উপজেলার দক্ষিণ জিলবুনিয়া গ্রামের খাদিজা বেগম গত বুধবার বলেন, 'পিএসএফের টিউবওয়েলের মাথা নেই, ৫০ কলস পানি ঢাইল্ল্যা দিয়া হেরপর ৫ কলস পানি নেওয়া লাগে। এই কষ্টের চেয়ে মরণ ভালো।' একই এলাকার নাজমা বেগম বলেন, 'সাপ্লাই নেই, টিউবওয়েল নেই, ট্যাঙ্ক নেই; কিছুই নেই। শুধু আছে পানির জন্য হাহাকার। এক কলস পানির জন্য রোজা রেখে তিন ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি।'

পানির জন্য হাঁটতে হয় কয়েক মাইল :চার মাইল হেঁটে পানি আনেন মোংলা উপজেলার চাঁদপাই ইউনিয়নের কানাইনগর গ্রামের শিউলী বেগম। তিনি বলেন, 'যেতে-আসতে এক ঘণ্টারও বেশি লাগে। প্রতিদিন রান্না করতে ও খেতে চার কলস পানি লাগে। সকালে দুইবার পানি আনতে যাই। বিকেলে দুইবার যাই। সারাদিনে পানির জন্য চার ঘণ্টা যায়, আমাদের কষ্টের কোনো শেষ নেই।'

চিলা গ্রামের এক ব্যক্তি বলেন, 'কখনও কখনও এক কলস খাবার পানির জন্য পাড়ি দিতে হয় দশ কিলোমিটার পথ। পার্শ্ববর্তী রামপাল থানার একটি পুকুরের পানির ওপর আমাদের চার গ্রামের মানুষকে নির্ভর করতে হচ্ছে।'

কেনার সামর্থ্য নেই :রামপাল উপজেলার তালতলা গ্রামের অমর মণ্ডল বলেন, 'এক ড্রাম পানি কিনতে ব্যয় হয় ৪০ থেকে ৫০ টাকা। রান্না ও খাবারের পানি কিনতে হলে দিনে দেড়শ থেকে দুইশ টাকা প্রয়োজন। নুন আনতে পানতা ফুরায় অবস্থা আমাদের। আয়ের টাকার বড় অংশ দিয়ে যদি পানি কেনা লাগে তাহলে সংসার চলবে কীভাবে।'

বেড়েছে নানা রোগ :গত রোববার সকালে জেলা হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডে দেখা যায়, ৪ শয্যার বিপরীতে চিকিৎসা নিচ্ছেন ২৭ জন। শয্যা সংকুলান না হওয়ায় মেঝের পাশাপাশি আইসোলেশন ওয়ার্ডের দুটি কক্ষে দেওয়া হচ্ছে চিকিৎসা সেবা। চলতি মাসেই পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে জেলা হাসপাতাল ও বিভিন্ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছে কয়েক হাজার মানুষ।

জেলা হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডের মেঝেতে কয়েকদিন ধরে চিকিৎসা নিচ্ছিল শিশু রেহান। তার মা পারভীন বেগম জানান, গত শনিবার দুপুরে ছেলের জ্বর ও পাতলা পায়খানা শুরু হয়। বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লে পরদিন সকালে জেলা হাসপাতালে ভর্তি করেন। মোরেলগঞ্জ উপজেলায় তাদের গ্রামে সুপেয় পানির খুব সংকট। আর সে কারণেই তার সন্তান অসুস্থ হয়ে পড়ে।

কচুয়া উপজেলার বারুইখালী গ্রামের আবুল হোসেন বলেন, বাধ্য হয়ে লবণ পানি গোসল, রান্না ও খাওয়ার কাজে ব্যবহার করতে হয়। ফলে নানা রোগে ভুগছি আমরা।

অধিকাংশ পিএসএফ নলকূপ নষ্ট :জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর বাগেরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, শুধু শরণখোলা উপজেলাতেই ৫৪৭টি পুকুরে স্থাপন করা পিএসএফের মধ্যে ৩৮৬টি অকেজো। এ ছাড়া গ্রামাঞ্চলে স্থাপন করা অগভীর নলকূপের বেশিরভাগই নষ্ট। একই চিত্র দেখা গেছে অন্য উপজেলাগুলোতেও। তবে জেলায় ঠিক কী পরিমাণ পিএসএফ নলকূপ অকেজো রয়েছে, তার সঠিক সংখ্যা জানাতে পারেনি দপ্তরটি।

উপকূলবাসীর পানি সংকট নিরসনে কয়েক বছরে সরকার শত শত কোটি টাকা ব্যয় করলেও সংকট মিটছে না। চলতি অর্থবছরে ৫টি প্রকল্পের মাধ্যমে ২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭৩২৭টি গভীর নলকূপ ও ৫৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬৫১৩টি রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং স্থাপন করা হয়েছে। আগের বছরগুলোতেও প্রায় সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে জেলার পানি সংকট নিরসনে। তবে এত টাকা ব্যয় করা সত্ত্বেও উপকূলবাসীর পানির সংকট নিরসন হয়নি।

পুকুরের পানিই শেষ ভরসা :সুপেয় পানির উৎস হিসেবে পুকুর গুরুত্বপূর্ণ হলেও রক্ষণাবেক্ষণের অবস্থা খুবই নাজুক। পুকুরগুলো পুনর্খনন, পরিস্কার রাখা এবং লবণ যেন ঢুকতে না পারে সে ব্যবস্থা জরুরি। এ ছাড়া পিএসএফগুলো সচল রাখতে স্থানীয়দের সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পানি সংকট নিরসন সহায়ক হবে বলে জানান উপকূল নিয়ে কাজ করা স্থানীয় সাংবাদিক আলী আকবর টুটুল।

যা বলছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর :জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর বাগেরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত মল্লিক বলেন, বাগেরহাটের উপকূলীয় উপজেলাগুলোতে তীব্র পানির সংকট দেখা দিয়েছে। এই সংকট নিরসনে পিএসএফ সংস্কার, পুকুর খননসহ আমরা বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছি। এ ছাড়া সংকট কাটাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে উপজেলাভিত্তিক ছোট ছোট প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।







© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com