সেলিম খানের দুর্নীতি নিয়ে তৎপর দুদক

প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২২ । ২২:৩৭ | আপডেট: ২১ এপ্রিল ২২ । ২২:৩৭

সমকাল প্রতিবেদক

চাঁদপুরের লক্ষ্মীপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান সেলিম খানের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি অধিগ্রহণে সরকারি অর্থ আত্মসাতের ষড়যন্ত্র, পদ্মা ও মেঘনা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

সংস্থাটির এনফোর্সমেন্ট ইউনিট এরই মধ্যে চাঁদপুর সদরে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নির্ধারিত স্থান, বালু উত্তোলনের স্থানে অভিযান চালিয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো থেকে দুর্নীতির বিষয়ে তথ্য, নথি, কাগজপত্র সংগ্রহ করেছে।

এনফোর্সমেন্ট ইউনিট সেলিম খানের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি অধিগ্রহণে কারসাজি করে মৌজা মূল্যের চেয়ে প্রায় ২০ গুণ বেশি দাম দেখিয়ে ১৩৯টি দলিল তৈরি করে সরকারের ৩৫৯ কোটি ১৬ লাখ টাকা ক্ষতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনেছে। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনেরও সত্যতা পেয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়গুলো অনুসন্ধানের সুপারিশ করে কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করেছে। কমিশন এরই মধ্যে প্রতিবেদনটি পরীক্ষা করে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

দুদক সচিব মো. মাহবুব হোসেন সমকালকে বলেন, বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম গত ৬ এপ্রিল অভিযান পরিচালনা করে চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি অধিগ্রহণে অনিয়ম, দুর্নীতি ও পদ্মা-মেঘনা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করে। অভিযোগটির সুষ্ঠু অনুসন্ধানে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন পর্যায় থেকে আরও তথ্য-প্রমাণ, নথি, কাগজপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে।

চাঁদপুর জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশ সমকালকে বলেন, জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক মূল্য উল্লেখ করে তৈরি দলিলগুলো এরই মধ্যে বাতিল করা হয়েছে। তাতে সরকার ৩৫৯ কোটি ১৬ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি থেকে রক্ষা পেয়েছে। আর অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিষয়টি ভূমি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটি করে বিষয়টি তদন্ত করছে।

সেলিম খান চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি অধিগ্রহণে জালিয়াতি ও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

আইন অনুযায়ী সরকারের কোনো সংস্থার অনুকূলে জমি অধিগ্রহণ করে থাকে ভূমি মন্ত্রণালয়। জমি অধিগ্রহণে জালিয়াতি করে সরকারের অর্থ আত্মসাতের ষড়যন্ত্রের বিষয়ে একটি প্রতিবেদন চাঁদপুর জেলা প্রশাসক ভূমি মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে।

জেলা প্রশাসকের প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন-২০১৭ এর ৪ ধারার নোটিশ জারির পূর্বের ১২ মাসের সকল দলিল বিবেচনায় নিয়ে ওই ৬২.৫৪ জমির মূল্য দাঁড়ায় ৫৫৩ কোটি ৭ লাখ ৭ হাজার ২৯০ টাকা। প্রকৃত দলিল বিবেচনায় ওই জমির প্রকৃত মূল্য দাঁড়ায় ১৯৩ কোটি ৯০ লাখ ৬৫ হাজার ৫০৭ টাকা। তাদের উচ্চ মূল্যের দলিল অনুযায়ী জমির দাম পরিশোধ করা হলে সরকারে আর্থিক ক্ষতি হতো ৩৫৯ কোটি ১৬ লাখ ৪১ হাজার ৭৮২ টাকা। এ থেকে প্রতীয়মান হয়, অধিগ্রহণ প্রস্তাবিত দাগসূচির জমির হস্তান্তর প্রক্রিয়া ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এর মাধ্যমে জমির মূল্য চরম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। উচ্চ মূল্যে জমির মূল্য পরিশোধ করা হলে স্থানীয় সাধারণ মানুষ পরে জমি বিক্রিসহ জমি সংক্রান্ত অন্যান্য সমস্যার সম্মুখীন হতো।

দুদকে সেলিম খানের নামে-বেনামে অবৈধ সম্পদের অর্জনের আরেকটি অভিযোগ অনুসন্ধানাধীন আছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুদকের অনুসন্ধান শুরুর পর সেলিম খান চিকিৎসার উদ্দেশে ভারত যাওয়ার জন্য অনুমতি চেয়ে চাঁদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আবেদন করেছেন। আবেদনটি বর্তমানে জেলা প্রশাসকের দপ্তরে জমা আছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, তার বিরুদ্ধে সরকারের সম্পদ আত্মসাৎ ও অর্থ আত্মসাতের ষড়যন্ত্রের প্রমাণ পাওয়া গেছে। দুদক এগুলোকে আমলে নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে। এই সময়ে তিনি চিকিৎসার নামে বিদেশে যেতে চাচ্ছেন, যা সন্দেহজনক।

দুদকের এনফোর্সমেন্ট ইউনিটের প্রতিবেদনে বলা হয়, একজন জনপ্রতিনিধি হয়েও সেলিম খান তার মালিকানাধীন সেলিম এন্টারপ্রাইজের অধীনে ২০০টি ড্রেজারের মাধ্যমে প্রায় এক দশক ধরে নির্বিচারে বালু উত্তোলন করে আসছেন। এটি করে তিনি একদিকে সরকারের কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদ আত্মসাৎ করেছেন। অন্যদিকে প্রকৃতি-পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট করেছেন।

দুদক সচিবের বক্তব্য: বৃহস্পতিবার দুদক সচিব মো. মাহবুব হোসেন বলেন, দুদকের অভিযানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী সেলিম খান মৌজা মূল্যের চেয়ে জমির মূল্য ২০ গুণ বাড়িয়ে ১৩৯টি উচ্চ মূল্যের দলিল তৈরি করে জমি ক্রয়-বিক্রয় দেখিয়েছেন। এটি জালিয়াতি। এ ক্ষেত্রে তিনি সফল হলে সরকারের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াত ৩৫৯ কোটি ১৬ লাখ টাকা। এ ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। অভিযানের সময় দেখা গেছে, তিনি পদ্মা ও মেঘনা নদী থেকে সরকারের অনুমতি ছাড়া নির্বিচারে বালু উত্তোলন করেছেন। বালুমহাল ইজারা দেওয়ার বিধিবিধান থাকার পরও তিনি কীভাবে বালু উত্তোলন করেছেন- সেটা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ওই ঘটনায় সরকারের ভেতরের প্রভাবশালী একজন ও তার পরিবারের সদস্যদের নামও এসেছে। সে বিষয়টি আপনারা দেখছেন কিনা- বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের এই প্রশ্নের জবাবে দুদক সচিব বলেন, আপাতত এনফোর্সমেন্ট টিম জমির উচ্চ মূল্য দেখিয়ে দলিল তৈরি ও বেচা-কেনা করার বিষয়ে এবং বেআইনিভাবে বালু উত্তোলনের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছে। এই বিষয়টির অধিকতর অনুসন্ধান শুরু হলে এর সঙ্গে কারা জড়িত বা কী কী বিষয় সম্পৃক্ত সেটা চলে আসবে।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com