শ্মশানে জমি দিলেন মুসলিম, মসজিদে হিন্দু

প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২২ । ১০:২৪ | আপডেট: ২৯ এপ্রিল ২২ । ১১:৫৩

বাগেরহাট সংবাদদাতা

শেখ মিজানুর রহমান (বাঁদিকে) ও প্রণব কুমার ঘোষ

বাগেরহাটের ফকিরহাটে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন দুই ব্যক্তি। সনাতন ধর্মাবলম্বীর এক ব্যক্তি দিয়েছেন মসজিদে জমি, অপরদিকে মুসলমান জমি দিয়েছেন শ্মশানে। বিপরীত ধর্মের উপাসনালয়ের জন্য জমি দানকে মহত্ব হিসেবেই দেখছেন স্থানীয়রা।

এই ২ ব্যক্তিকে সম্প্রতি সন্মাননা দিয়েছেন বেসরকারি একটি উন্নয়ন সংস্থা। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্নভাবে নেটিজেন ও স্থানীয়রা তাদের প্রশংসা করতে থাকেন। মূলত পারস্পরিক সৌহার্দ্য বজায় রাখতেই ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের উপাসনালয়ে জমি দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তারা।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফকিরহাট বিশ্বরোড-সংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘদিন কোনো মসজিদ ছিল না। স্থানীয় মুসল্লিরা অনেক দূরের মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করতেন। মুসলমানদের এই সমস্যার সমাধানে ২০০৯ সালে মহাসড়কের বাসস্ট্যান্ড-সংলগ্ন এলাকায় মসজিদ নির্মাণের জন্য ৩৫ শতক জমি দেন ফকিরহাট কাজি আজহার আলি কলেজের সহকারী অধ্যাপক প্রণব কুমার ঘোষ। 

শ্মশান (বাঁদিকে) ও মসজিদ

ওই জমি বাবদ নামমাত্র মূল্যে নেন সনাতন ধর্মালম্বী এই মহৎ ব্যক্তি। এরপর থেকে স্থানীয় ও যাত্রাপথে থাকা অসংখ্য মুসল্লি এই মসজিদে নামাজ আদায় করে আসছেন। এছাড়া মসজিদে নারীদের নামাজের জন্যও উদ্যেগ গ্রহণ করেছেন তিনি। 

অন্যদিকে ৩ বছর আগে একই এলাকায় ভৈরব নদের গর্ভে বিলীন হয়ে যায় হিন্দু ধর্মালম্বীদের শ্মশান। ফলে মরদেহের শেষকৃত্য করতে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছিল সনাতন ধর্মালম্বীদের। এই অবস্থায় ফকিরহাট উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শেখ মিজানুর রহমান শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় জমি প্রদান করেন। তবে কতটুকু জমি দিয়েছেন তা জানাতে রাজি হননি তিনি।

মসজিদের জন্য জমিদাতা সহকারী অধ্যাপক প্রণব কুমার ঘোষ বলেন, আমরা হিন্দু-মুসলমান পরস্পর সহমর্মিতা নিয়ে বসবাস করি। আমাদের মধ্যে কখনো দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়নি। এখানে মুসলমান ভাইদের জন্য মসজিদ ছিল না। তখন এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলি। আমি প্রথমে অল্প কিছু জমি প্রদান করি। পরবর্তীতে এখানে নারীদের নামাজের স্থান করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এখানে লিল্লাহ বোডিং করারও পরিকল্পনা মসজিদ কমিটির রয়েছে। পাশাপাশি আমাদের এক মুসলমান ভাই শ্মশানের জন্য জমি দান করেছেন। আমি আশা করি আমাদের এই বন্ধন চিরঅটুট থাকবে।

শ্মশানের জন্য জমিদাতা শেখ মিজানুর রহমান বলেন, অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে আমরা বড় হয়েছি। কয়েক বছর আগে ভৈরব নদ পুনঃখননের কারণে প্রায় ২০০ বছরের শ্মশানটি বিলীন হয়ে যায়। ফলে হিন্দু ভাই-বোনদের শেষকৃত্য অনুষ্ঠান নিয়ে সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছিল। আমি অন্য ধর্মের লোক হলেও তাদের এই সমস্যা আমার অনুভূতিতে আঘাত করে। তখন নদের পাশে থাকা আমার জায়গা আমি শ্মশানের জন্য উৎসর্গ করি।

 সম্মাননা অনুষ্ঠানে শেখ মিজানুর রহমান ও প্রণব কুমার ঘোষ

মসজিদের মুয়াজ্জিন মো. গাউসুল আলম বলেন, আমাদের এই বিশ্বরোড এলাকায় কাছাকাছি মসজিদ না থাকায় আমাদের নামাজ পড়তে বেশ অসুবিধা হতো। পরবর্তীতে প্রণব বাবু নিজ উদ্যেগে নামমাত্র মূল্য নিয়ে মসজিদের জন্য জায়গা প্রদান করেন। আমরা তার প্রতি কৃতজ্ঞ।

হাঙ্গার প্রজেক্টের উপজেলা পিএফজি (পিস ফ্যাসিলেটেটর গ্রুপ) কমিটির সমন্বয়কারী মো. আরিফুল হক বলেন, ফকিরহাট উপজেলায় একজন হিন্দু ব্যক্তির মসজিদে জমিদান এবং মুসলমানের শ্মশানের জন্য জমিদান সত্যিই সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত। তাদের এই মহত্বের স্বীকৃতি স্বরূপ ২৩ এপ্রিল হাঙ্গার প্রজেক্টের মাধ্যমে তাদের সন্মাননা দেওয়া হয়।

ফকিরহাট আজাহার আলী কলেজের শিক্ষক আবুল আহসান টিটু বলেন, ভৈরব নদ পুনঃখননের ফলে ২০০ বছরের শ্মশান নদে বিলীন হয়ে যায়। সে সময় এখানে মরদেহ সৎকারের জন্য কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তখন স্থানীয় শেখ মিজানুর রহমান শ্মশানের জন্য জায়গা দান করেন। অন্যদিকে একজন হিন্দুধর্মাবলম্বী মসজিদের জন্য জায়গা দিয়েছেন। দুটি ঘটনাই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিরল দৃষ্টান্ত।

ফকিরহাট উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান স্বপন কুমার দাশ বলেন, শত শত বছর ধরে এ জনপদের হিন্দু-মুসলমান পাশাপাশি বসবাস করে আসছেন। একে অপরের সুখ-দুঃখে একাত্ম হয়েছে। ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক থেকে ভিন্নতা থাকলেও আমাদের এখানের হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবাই সুদৃঢ় সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ। এই বন্ধন দেশের মানুষের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com