হলিউড

স্ট্যান লি ও তার সুপারহিরো

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২২ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

উপমা পারভীন

স্ট্যান লি

স্পাইডারম্যান, আয়রনম্যান, হাল্ক্ক, থর, অ্যান্টম্যান, ফ্যান্টাস্টিক ফোর, এক্সম্যান, ডক্টর স্ট্রেঞ্জ, ব্ল্যাক প্যান্থারের মতো বিশ্ব কাঁপানো সুপারহিরোদের স্রষ্টা স্ট্যান লি। ১৯৩৯ সালে টাইমলি কমিক্সের মাধ্যমে তার যাত্রা শুরু হয়। কিন্তু তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘোরে ষাটের দশকে। তখন সুপারহিরোদের নিয়ে রমরমা ব্যবসা করছিল ডিসি কমিক্স। সে সময় ডিসিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতেই স্ট্যান লি শুরু করেন মার্ভেল কমিক্সের দাপুটে দুনিয়া। ডিসির সুপারম্যান, ব্যাটম্যান, গ্রিন ল্যান্টার্নদের সঙ্গে পাল্লা দিতে মার্ভেল কমিকস তৈরি করে ফ্যান্টাস্টিক ফোর, স্পাইডারম্যান, দ্য হাল্ক্ক, আয়রনম্যান, থর, এক্সম্যান, ডেয়ারডেভিলের মতো সুপারহিরো চরিত্র। ফলে ডিসির বাজার দখল করতে সময় লাগে না মার্ভেলের।

স্ট্যান লির হাত ধরেই জন্ম নেওয়া কমিকসের কালজয়ী সব সুপারহিরো এখন শাসন করছে পুরো সিনেমাবিশ্বকেও। বিশ্ব কাঁপানো সুপারহিরোদের পাশাপাশি ছোটখাটো চরিত্র মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিনশর বেশি চরিত্র তৈরি করা স্ট্যান লি ১৯২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪১ সালের মে মাসে প্রথমবারের মতো কমিকস লেখা শুরু করেন স্ট্যান লি, যা ছিল 'ক্যাপ্টেন আমেরিকা' সিরিজের 'ক্যাপ্টেন আমেরিকা ফয়েলস দ্য ট্রেইটরস রিভেঞ্জ'। এই কমিকসের জন্যই তিনি প্রথম স্ট্যান লি নামটি ব্যবহার করেন। ওই বছরেই টাইমলি কমিকসের সম্পাদক চাকরি ছেড়ে দিলে কিছুটা বাধ্য হয়েই টাইমলি কমিকসের প্রকাশক-সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত করেন স্ট্যান লিকে। তখন তার বয়স মাত্র ১৯ বছর। সেই থেকেই শুরু। এরপর টানা বছর বিশেক কমিকস লিখে একসময় হাঁপিয়ে ওঠেন তিনি। একসময় সিদ্ধান্ত নেন, আর লিখবেন না। পরে স্ত্রীর পরামর্শে নিজের মনের মতো চরিত্রগুলো তৈরি করে আবারও লিখতে শুরু করেন।

মানুষের জীবন কখনও নিখুঁত নয়; আনন্দ, দুঃখ সব মিলিয়েই জীবন। নিউইয়র্কে এক রাতে যখন নতুন সুপারহিরো তৈরির কথা ভাবছিলেন স্ট্যান লি, তখন এই কথাগুলোই ঘুরপাক খাচ্ছিল তার মাথায়। ভাবতে ভাবতে স্ট্যানের দেয়ালে চোখ আটকে যায়। একটা মাছি দেয়াল বেয়ে উঠছে। ফ্লাই ম্যান? মস্কিউটো ম্যান? কোনো নামই নাটকীয় শোনাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত মাথায় এলো 'স্পাইডারম্যান'! বয়সে তরুণ হলেও স্ট্যান লি জানতেন, শুধু ক্ষমতা থাকলেই কেউ সুপারহিরো হয় না। দরকার নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য। রাতের শুরুতে মাথায় ঘুরপাক খাওয়া কথাগুলো ফিরে এলো আবার। সুপারহিরো কি সাধারণ হতে পারে না? যে আমাদের মতোই একজন। যাকে নিজের পরিবার ও জীবনের সমস্যাগুলো নিয়ে ভাবতে হয়। মোটকথা, স্ট্যান লি নতুন চরিত্রটিকে দিতে চেয়েছিলেন সাধারণ মানুষের সাধারণ জীবন। স্পাইডারম্যানের আইডিয়া মাথায় আসার পর লি ছুটে যান প্রকাশকের কাছে। স্পাইডারম্যানের বৃত্তান্ত শুনে প্রকাশক জানিয়ে দেন, এর চেয়ে বাজে আইডিয়া তিনি জীবনে শোনেননি। অধিকাংশ মানুষই মাকড়সা ভয় পায়। আর নিজের জীবনেই যদি সমস্যা থাকে, তাহলে স্পাইডারম্যান সুপারহিরো হবে কী করে? লি তখন ভীষণ হতাশ হয়ে পড়েন। মন দিয়েছিলেন অন্য কাজে। কিন্তু স্পাইডারম্যান তার মাথা থেকে যাচ্ছিল না। একটা সময় বিরক্ত হয়ে স্ট্যান লি বাতিল হতে চলা এক ম্যাগাজিনের শেষ সংস্করণে ছাপিয়ে দেন স্পাইডারম্যান কমিকস। আঁকাআঁকির কাজটা করেন তার বন্ধু স্টিভ ডিটকো। পাঠক তা লুফে নিল। স্টিভ ডিটকোকে সঙ্গে নিয়ে শুরু করলেন কাজ। বেরোতে শুরু করল একের পর এক স্পাইডারম্যানের পর্ব।

সময়টা ১৯৬১ সাল। সুপারহিরো বলতেই 'ডিসি'র ব্যাটম্যান, সুপারম্যান, গ্রিন ল্যান্টার্ন, ফ্ল্যাশ। স্ট্যান লি তখন জীবনের প্রথম কাজ শুরু করা টাইমলি কমিকসের নাম বদলে রাখলেন 'মার্ভেল কমিকস'। প্রকাশ করলেন ফ্যান্টাস্টিক ফোর, যা ডিসি কমিকসের যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। ফ্যান্টাস্টিক ফোরের পেছনে পেছনে একে একে বাজারে আসতে শুরু করে হাল্ক্ক, থর, আয়রনম্যান, এক্সম্যান, ডেয়ারডেভিল, ডক্টর স্ট্রেঞ্জ এবং সব থেকে জনপ্রিয় স্পাইডারম্যান। এরপর আর 'মার্ভেল' এবং স্ট্যান লিকে ফিরে তাকাতে হয়নি, 'দ্য অ্যাভেঞ্জারস' প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পুরো কমিকস বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেন।

বহুদিন ধরে বাজার ধরে রাখা 'ডিসি কমিকস'-এর ব্যাটম্যান, সুপারম্যানদের পাশাপাশি স্পাইডারম্যান, হাল্ক্করা এত জলদি কীভাবে দর্শকের মনকে জয় করে নিল- কারণ, অতিমানব হওয়ার আগে আমাদের মতো তারাও মানুষ... তাদের দুর্বলতা, ক্ষুদ্রতা, যন্ত্রণা, মন খারাপ, প্রেম আছে। এমনকি তার বানানো সুপারহিরোরা সর্দি-কাশির মতো ছোটখাটো অসুখ থেকেও ছাড় পায় না। এসবের বাইরে স্ট্যান লির কমিকসে যেমন বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়ার গল্প রয়েছে, তেমনি রয়েছে দেশাত্মবোধের প্রাধান্য। স্ট্যান লির সুপারহিরো সিনেমা বা কমিকগুলোর গল্পের গাঁথুনি গড়ে উঠত মানুষের আবেগকে কেন্দ্র করে। দুর্দান্ত অ্যাকশন কিংবা গল্পের টুইস্টকে ছাপিয়ে মানুষের মন ছুঁয়ে যায় মেলোড্রামাগুলোতে। সেই নাটকীয়তার সঙ্গে থাকে মজার মজার পাঞ্চলাইন। যারা নতুন নতুন মার্ভেলের কাহিনির সঙ্গে পরিচিত, তারাও হয়তো খেয়াল করবেন, কীভাবে সিরিয়াস কোনো দৃশ্যের পরই মেজাজ হালকা করে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে থাকতে। পাঠক তাই মনের ওপর চাপ না নিয়েই বেশ স্বচ্ছন্দে উপভোগ করতে পারতেন কমিকগুলোকে।

স্ট্যান লির সুপারহিরোরা কমিকস ছেড়ে যখন থেকে রুপালি পর্দায় উঠে আসতে শুরু করে, তখন থেকেই তাদের জনপ্রিয়তা বেড়ে যায় আরও শতগুণ। আর বর্তমানে 'মার্ভেল'-এর কোনো সিনেমা মুক্তি পাওয়ার আগেই চোখ বন্ধ করে বলে দেওয়া যায়, তা নিঃসন্দেহে ব্লকবাস্টার।

সত্তরের দশক থেকেই লেখালেখি থেকে অনেকখানি দূরে সরে এসে মনোযোগ দিয়েছিলেন মুভি ও টিভি সিরিজ বানানোর কাজে। নিজের প্রতিপত্তি খাটিয়ে খুব দ্রুত উন্নতি করেন তিনি। ১৯৭২ সালে 'দ্য ইনক্রিডেবল হাল্ক্ক' দিয়ে প্রথম লাইভ অ্যাকশন টিভি সিরিজ পায় মার্ভেলের কোনো চরিত্র। প্রতি পর্বে 'ডক্টর ব্রুস' ব্যানার নিত্যনতুন শহরে গিয়ে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করে আসতেন। কিন্তু হাল্ক্ক নামক দানবটির কথা ছড়িয়ে পড়ায় এক তদন্ত কর্মকর্তা তার পিছু নেন। ফলে ব্রুস আত্মগোপন করতে বাধ্য হন। সিরিজটি পাঁচ সিজন ধরে চলেছিল। কাছাকাছি সময়ে সিবিএস চ্যানেলের কাছে 'দ্য অ্যামেজিং স্পাইডারম্যান'-এর স্বত্ব বেচে দিয়েছিলেন স্ট্যান লি। তবে সিরিজটি বেশি জনপ্রিয় হয়নি, মাত্র ১৩টি পর্ব প্রচারিত হয়েছিল।

স্ট্যান লির আরেকটি মজার কাজ ছিল মার্ভেলের বিভিন্ন মুভি এবং টিভি সিরিজে এক ঝলক করে নিজের চেহারা দেখানো। আলফ্রেড হিচককের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৮৯ সালের ইনক্রেডিবল হাল্ক্ক টিভি মুভির মাধ্যমে তিনি এই কাজ শুরু করেন। তার পরিচিত চেহারা নিয়ে ভারী গলায় ডায়ালগ দিতে দিতে উপস্থিত হয়েছেন বহু প্রজেক্টে। বাস ড্রাইভার, লাইব্রেরিয়ান, ডাকপিয়ন, কোটিপতিসহ হেন চরিত্র নেই, যাতে ক্যামিও দিতে দেখা যায়নি তাকে। এমনকি নিজের প্রজেক্ট না হলেও ডেডপুল কিংবা টিন টাইটান্স গো মুভিতে মজা করে ক্যামিও দিয়েছেন তিনি। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য মুখ দেখানো লিকে 'মার্ভেল'-এর সিনেমায় কখন দেখা যাবে, তার জন্য অনেকেই রীতিমতো হাঁ করে বসে থাকে। ৭০ বছর ধরে কমিকস বইয়ের পাতায় প্রাণ ঢেলে দেওয়া, কোটি কোটি মানুষের শৈশবকে ঝলমলে আনন্দে ভাসানো মানুষটি ২০১৮ সালের ১২ নভেম্বর ৯৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com