নিবন্ধ

পর্তুগিজ আগ্রাসন প্রতিরোধে কালিকটের বিজয়গাথা

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২২ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মযহারুল ইসলাম বাবলা

১৫০১ থেকে ১৫০২ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে পর্তুগিজ নাবিক জোয়াও দা নোভা আগ্রাসন অভিযানে ভারতে দুটি ঘাঁটি স্থাপনের উদ্দেশ্যে আসে। এই অভিযানে আটলান্টিক মহাসাগরের দক্ষিণাঞ্চলের অ্যাসেশন ও সেন্ট হেলেনা দ্বীপ দুটি আবিস্কার করে। যদিও স্বল্প সময়ের ব্যবধানে দ্বীপ দুটির দখলদারিত্ব পর্তুগিজদের হাত বদলে ব্রিটিশদের অধীনে চলে যায়। রোম সম্রাট নেপোলিয়ান বোনাপার্টের নির্বাসন জীবন কেটেছিল সেন্ট হেলেনা দ্বীপে। সে কারণে দ্বীপটি ভিন্ন পরিচিতি পেয়েছিল। ১৫০৫ খ্রিষ্টাব্দে রাজা ম্যানিল তার প্রতিনিধি রূপে ফ্যান্সিসকো দি আলমিদাকে ভারত অভিযানে বিশাল সমর বহর সমেত প্রেরণ করেন। যাত্রাপথে আলমিদা কিলওয়ায় পর্তুগিজ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে কোচিনের পর্তুগিজ ঘাঁটিকে আরও শক্তিমত্তায় গড়ে তোলে। আলমিদার পর আলবুকুয়ের্কের নেতৃত্বে পর্তুগিজ অপর অভিযানটি ভারতে এসে বিনে বাধায় গোয়া দখল করে নেয়। গোয়ায় বসবাসরত আরবীয় এবং স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে। আলবুকুয়ের্ক কর্তৃক সেই মুসলিম হত্যাযজ্ঞে শিশুসহ আট হাজারেরও অধিক আরবীয়-স্থানীয় মুসলমানকে প্রাণ দিতে হয়েছিল। গোয়া ক্রমেই পর্তুগিজ উপনিবেশের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। আলবুকুয়ের্ক অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মালাস্কার বন্দরগুলোকে একে একে দখল করে নেয়। বর্তমানের সিঙ্গাপুরের নিকটবর্তী ভারত মহাসাগরের পূর্বাঞ্চল মালাস্কার বন্দরগুলো। আলবুকুয়ের্ক কর্তৃক পর্তুগিজদের দখল অভিযানে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালিও পর্তুগিজদের দখলকৃত হয়ে পড়ে।

চাওলার যুদ্ধের পরাজয় পর্তুগিজ রাজা ম্যানিলের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। রাজা ম্যানিল পুনরায় কালিকট অভিযানের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। আঠারোটি যুদ্ধজাহাজ এবং দেড় হাজার সৈন্য কালিকট আগ্রাসনের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। ১৫০৯ খ্রিষ্টাব্দের ২ ফেব্রুয়ারি পর্তুগিজ সমর বাহিনী যুদ্ধ কৌশলের পাশাপাশি নতুন কৌশল আঁটে। সেটি হচ্ছে ভারতীয়দের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি। একে-অপরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে ফায়দা হাসিলের অভিনব কৌশল। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের ভাগ কর-শোষণ কর নীতির অভিষেক পর্তুগিজ আক্রমণকারীদের মাধ্যমেই শুরু হয়েছিল। গুজরাট রাজ্যের অন্তর্গত দিউ দ্বীপটি সুলতানের প্রতিনিধি মালিক আয়াজের নিয়ন্ত্রণে ছিল। বিশ্বাসঘাতক গুজরাটের সুলতান এবং মালিক আয়াজকে নানা প্রলোভনের ফাঁদে বশীভূত করে ফেলে পর্তুগিজ সমর নায়করা। কালিকট ও মিসরীয় যৌথ বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধাবস্থায় দিউ দ্বীপ থেকে রসদ প্রেরণ বন্ধ করে দেয় মালিক আয়াজ। রসদের অভাবে যৌথ বাহিনীর পক্ষে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। তারপরও অসম সাহসিকতায় মিসরীয় সেনাপতি মীর হুসেন বীর বিক্রমে যুদ্ধ চালিয়ে যান। এই যুদ্ধে উভয় পক্ষ সমানে সমানে লড়েছে। গুজরাট সুলতানের চরম বিশ্বাসভঙ্গে মিসরীয় সেনাপতি মীর হুসেন তীব্র ক্ষোভে সব নৌবহরসমেত পুরো মিসরীয় বাহিনী নিয়ে মিসর ফিরে যান। এই চমৎকার সুযোগের মওকায় পর্তুগিজ আগ্রাসী বাহিনী কালিকটকে বিচ্ছিন্ন করতে পারলেও, কালিকট অধিকার করতে পারেনি। পর্তুগিজদের প্রবল আক্রমণের মুখেও রাজা জামোরিন তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। সেই প্রতিরোধ বূ্যহ ভাঙতে পারেনি পর্তুগিজ বাহিনী। কালিকট কারও সাহায্য ব্যতিরেকে একাই নিজেকে রক্ষায় সর্বোচ্চ ত্যাগে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। ১৫০৯ থেকে ১৫৯৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত টানা ৯০ বছরের কালিকটের ইতিহাস পর্তুগিজ আগ্রাসন প্রতিরোধের ইতিহাস। কালিকটের প্রতিরোধের ওই সময়কালে মালাবারের সমুদ্র উপকূলের কোথাও পর্তুগিজদের পক্ষে একটি ঘাঁটিও স্থাপন করা পর্যন্ত সম্ভব হয়নি।

তবে ১৫৯৯ খ্রিষ্টাব্দে সমঝোতার মাধ্যমে কালিকটে পর্তুগিজ প্রতিরোধের সমাপ্তি ঘটে। কালিকট বন্দরের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় পর্তুগিজদের অধীনে। আরব সাগর, ভারত মহাসাগরসহ প্রশান্ত মহাসাগরজুড়ে পর্তুগিজদের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। মালয়, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার উৎপাদিত মসলার একচ্ছত্র বাণিজ্যের কর্তৃত্ব নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় পর্তুগিজরা। প্রায় দেড়শ বছর পর্তুগিজদের একক নিয়ন্ত্রণ ছিল পুরো অঞ্চলে। তবে কালিকটের ভূমিতে-ভেতরাংশে পর্তুগিজরা দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। পর্তুগিজ ফিল্ড মার্শালের নেতৃত্বে বিশাল যুদ্ধবহর কালিকট বন্দরে বিনে বাধায় প্রবেশ করে। বন্দরে প্রবেশের মুখে তাদের সামান্য প্রতিরোধের মুখেও পড়তে হয়নি। স্থলে যে তাদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়তে হবে, সেটা তারা কল্পনাও করেনি। কালিকটের দেশপ্রেমিক জনগণ বীর বিক্রমে আগ্রাসী পর্তুগিজ বাহিনীকে কালিকটের ভূমিতে পরাস্ত করে দৃষ্টান্তমূলক ইতিহাস গড়েছিল। দুঃখজনক হলেও পর্তুগিজ প্রতিরোধের সেই যুদ্ধে প্রতিবেশী রাজ্যগুলো কেবল তামাশা দেখেছে। কালিকটের সাহায্যে কেউ এগিয়ে আসেনি। উত্তর-দক্ষিণের তুঙ্গভদ্রা নদী থেকে কুমারিকা অন্তরীপ অবধি বিশাল হিন্দুরাজ্য বিজয়নগর। এরই পাশে আরব সাগরের উপকূলে ক্ষুদ্র কালিকট রাজ্য। উত্তরের তুঙ্গভদ্রা বহমনী রাজ্য খণ্ড খণ্ড হয়ে বেরার, আহমদনগর, বিদর, বিজাপুর, গোলাকুণ্ডা- এই পাঁচ মুসলিম রাজ্য। তুঙ্গভদ্রা নদীর উত্তরের গুজরাট, মালব এবং খান্দেশ রাজ্য তিনটিও ছিল মুসলিম রাজ্য। ভারত মহাসাগর, আরব সাগর এবং লোহিত সাগরের জলসীমাজুড়ে পর্তুগিজ জলদস্যুদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু জলে চলাচলকারী সকল সমুদ্রগামী জাহাজসহ তীরবর্তী মানুষ। তাদের আক্রমণের শিকার হয় প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপপুঞ্জ ইন্দোনেশিয়া। মসলা উৎপাদনে ওই দ্বীপপুঞ্জ সর্বকৃষ্ট রূপে সর্বাধিক খ্যাতি অর্জন করেছিল। মসলার আকর্ষণে পর্তুগিজ জলদস্যুদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল তিন হাজার দ্বীপপুঞ্জের ইন্দোনেশিয়া। মুসলিম সম্প্রদায়কে পর্তুগিজ আক্রমণকারীরা সর্বাধিক শত্রু বিবেচনা করত।

দক্ষিণ ভারতের হিন্দু-মুসলিম রাজ্যগুলোতে সাম্প্রদায়িক বিভাজন সৃষ্টি এবং মুসলিম রাজ্যগুলোর প্রতি বিদ্বেষী নীতি গ্রহণ করে পর্তুগিজ সমরবিদরা। কোচিন রাজ্যটি হিন্দু রাজ্য। কোচিনের হিন্দু রাজা সহজেই পর্তুগিজদের সখ্য হয়ে ওঠে। কোচিন দ্বীপে পর্তুগিজরা গড়ে তোলে দুর্গ-ঘাঁটি। বিনা প্রতিরোধে পর্তুগিজরা বিজাপুর রাজ্যের অন্তর্গত গোয়া দখল করে নেয়। এমনকি দমন, দিউও। যার সামান্য বিরোধিতা-প্রতিরোধ না করে হিন্দু রাজ্যগুলো প্রতিপক্ষ মুসলিম রাজ্যগুলোকে চরম প্রতিশোধের অভিপ্রায়ে পর্তুগিজদের নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করে। এতে হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টির পুরো ফায়দা তুলে নেয় পর্তুগিজ দস্যুরা। মুসলিম বিদ্বেষী পর্তুগিজদের সঙ্গে হিন্দু রাজ্যগুলোর মধুর সম্পর্কের পরও একমাত্র হিন্দু রাজ্য কালিকট রাজ্যটি ছিল পর্তুগিজদের চরম শত্রুতুল্য। হিন্দু কালিকট রাজ্যটিকে বশে আনতে না পারার কারণে পর্তুগিজদের চরম শত্রু মুসলিম রাজ্যগুলোর কাতারে কালিকটকে বিবেচনা করত। সুদীর্ঘকাল কালিকটের ব্যবসা-বাণিজ্যের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল আরব বণিকদের মুঠোয়। আরবদের কারণেই কালিকটের নিয়ন্ত্রণ-দখলদারিত্ব তাদের মুঠোয় সহজে আসেনি। আরবদের বিতাড়িত করে অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কালিকটে প্রতিষ্ঠা অসম্ভব হয়েছিল আরব বণিকদের কারণেই। আরবের মুসলিমরা ছিল পর্তুগিজদের প্রধান ও একমাত্র শত্রু। ভারতের মুসলিম রাজ্যগুলোর মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে তারা চরম আগ্রাসী নীতি গ্রহণ না করায় বহিরাগত লুটেরা পর্তুগিজবিরোধী মোর্চা গঠন মুসলিম রাজ্যগুলো করেনি। এমন কি পর্তুগিজবিরোধী ভূমিকায়ও অবতীর্ণ হয়নি। সমঝোতার পথে পর্তুগিজদের সুবিধা প্রদান করে নিজের সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে।

দক্ষিণাত্যের বহ্‌মনি একক রাজ্যটি পাঁচখণ্ডে বিভক্ত হয়ে বিজাপুর, গোলকোণ্ডা, আহমদনগর, বিদর ও বেরার পাঁচ পৃথক রাজ্যরূপে গড়ে ওঠে। পাঁচ রাজ্যের বৃহৎ রাজ্যটি ছিল বিজাপুর। পাঁচ রাজ্যের শাসনকর্তারা একে অপরের বিরুদ্ধে বিভেদ-সংঘাতে পরস্পর লিপ্ত হতো। পাঁচ রাজ্যের শাসনকর্তারা প্রত্যেকে ছিলেন মুসলিম, সে কারণেই রাজ্য পাঁচটিকে মুসলিম রাজ্য রূপে গণ্য করা হতো। পাঁচ রাজ্যের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মূলে রাজনৈতিক কারণ ছিল। ১৫১০ খ্রিষ্টাব্দে পর্তুগিজ সমর নায়ক আলবুকুয়ের্ক বিজাপুর রাজ্যের অন্তর্গত গোয়া দখল করে নেয়। বিজাপুর রাজ্যের মুসলিম শাসক গোয়া দখলে বাধা না দিয়ে নীরব ভূমিকা পালন করে। প্রতিদানে বিজাপুর রাজ্যের শাসক সামরিক শক্তিতে অধিক শক্তিমান পর্তুগিজ সামরিক বাহিনীকে প্রতিদ্বন্দ্বী বিজয়নগর রাজ্যের বিরুদ্ধে নানা যুদ্ধে সম্পৃক্ত করেছিল। ১৫৬৫ খ্রিষ্টাব্দে দক্ষিণাত্যের পাঁচ পৃথক মুসলিম রাজ্য প্রতিদ্বন্দ্বী বিজয়নগরের বিরুদ্ধে পরস্পর ঐক্যবদ্ধ হয়ে মৈত্রীচুক্তি সম্পাদন করে। কৃষ্ণা নদীর তীরবর্তী তালিকোটায় যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। পাঁচ রাজ্যের ঐক্যবদ্ধ আক্রমণে বিজয়নগর সাম্রাজ্যের পরাজয় ঘটে। এর পাঁচ বছর পর বিজাপুর, আহমদনগর ও কালিকটের মধ্যে মৈত্রী স্থাপিত হয় পর্তুগিজদের দখলে থাকা গোয়া পুনরুদ্ধারে। পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে তিন রাজ্যের তিন লক্ষাধিক ভারতীয় বাহিনী মাত্র কয়েক হাজার পর্তুগিজ বাহিনীর কাছে পরাস্ত হয়। পর্তুগিজদের আধুনিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে পরাজয় ঘটে বিশাল ভারতীয় বাহিনীর। গোয়া এবং চৌল বন্দর দুটি অবরোধ করেও দখলে নিতে পারেনি তিন রাজ্যের সম্মিলিত বাহিনী। ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে মোগল বাহিনী দক্ষিণাত্যে অনুপ্রবেশ করে।

ভারতের পশ্চিম উপকূলের গুজরাট রাজ্যের সমৃদ্ধির মূলে ছিল বন্দরকেন্দ্রিক বৈদেশিক বাণিজ্য। ভারতের পশ্চিম উপকূলের ক্যাম্বে ছিল প্রধান সামুদ্রিক বন্দর। ক্যাম্বে থেকে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো আরব ও লোহিত সাগর পাড়ি দিত পারস্য উপসাগরের বন্দরগুলোতে। দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়া এবং চীনের পণ্য সামগ্রীর বাণিজ্যিক কেনাবেচার কেন্দ্র ছিল ক্যাম্বে বন্দর। কালক্রমে গুজরাটে আরব দেশীয় বণিকদের বাণিজ্যিক উপনিবেশ গড়ে ওঠে। পারস্যের পারসিকরা পর্যন্ত আরবদের পাশাপাশি গুজরাটে বসতি গড়ে তোলে। হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের বাণিজ্যিক কেন্দ্র রূপে গড়ে ওঠে ক্যাম্বে বন্দর। গুজরাটের শাসনকর্তা মাহমুদ বেগার্হার শাসনামলে পর্তুগিজরা গুজরাটের সমুদ্র তীরবর্তী বিভিন্ন অঞ্চলে অনুপ্রবেশ করে এবং ক্রমেই আরব সাগরের জলসীমায় তাদের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। প্রাচ্যের বণিকদের সমুদ্রে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজসমূহে চালায় বেপরোয়া হামলা-লুণ্ঠন। সংগত কারণে গুজরাটের শাসনকর্তা মাহমুদ বেগার্হা পর্তুগিজ জলদস্যু দমনে মিসরের সঙ্গে মৈত্রীচুক্তি সম্পাদন করে। গুজরাট এবং মিসরীয় যৌথ বাহিনী পর্তুগিজবিরোধী অভিযানের শুরুতে সাফল্য অর্জন করলেও, ১৫০৯ খ্রিষ্টাব্দে পর্তুগিজ সমর নায়ক এবং পর্তুগাল রাজার প্রতিনিধি আলমেইদা দিউর-এর নেতৃত্বাধীন পর্তুগিজ বাহিনীর কাছে দুই মিত্র শক্তির পরাজয় ঘটে। ফলে মাহমুদ বেগার্হা বাধ্য হয় পর্তুগিজদের সঙ্গে সন্ধি স্থাপনে। ক্যাম্বে উপসাগরের প্রবেশ পথে পর্তুগিজদের অবাধ বিচরণ-দস্যুবৃত্তি এবং বাণিজ্যিক কেন্দ্র স্থাপন-ঘাঁটি নির্মাণ বিনে বাধায় তারা সম্পন্ন করে। ক্রমেই ক্যাম্বে বাণিজ্যিক বন্দরের খ্যাতি হারিয়ে পর্তুগিজদের আধিপত্যের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়। পাশাপাশি বন্দরের বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হওয়ার কারণে এবং পর্তুগিজদের ক্রমাগত অনাচারের মুখে গুজরাট রাজ্যটি দুর্বল হয়ে যায়। দুর্বল গুজরাট রাজ্যের ওপর পর্তুগিজ দস্যুদের ক্রমাগত আগ্রাসনে রাজ্যের শাসনকর্তার ক্ষমতা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ে। গুজরাট রাজ্যের শাসনকর্তা বাহাদুর শাহ (রাজত্বকাল : ১৫২৬-১৫৩৭ খ্রিষ্টাব্দ) ১৫৩৫ খ্রিষ্টাব্দে শর্তসাপেক্ষে দিউতে পর্তুগিজদের দুর্গ নির্মাণের অনুমতি প্রদান করেন। বিনিময়ে তার শত্রুদের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধে পর্তুগিজ সামরিক বাহিনী গুজরাট রাজ্যের শাসনকর্তাকে সামরিক সাহায্য-সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি প্রদান করে। অথচ মোগল বাহিনীর গুজরাট আক্রমণে পর্তুগিজরা প্রতিশ্রুতি পালন না করে নির্লিপ্ত অবস্থান নেয়। এতে ক্ষিপ্ত গুজরাট শাসক বাহাদুর শাহ স্বয়ং পর্তুগিজ রাজপ্রতিনিধির সঙ্গে আলোচনা করতে নোঙর করা পর্তুগিজ জাহাজে যান। পর্তুগিজরা গুজরাট শাসনকর্তাকে বাগে পেয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। তার হত্যায় গুজরাটজুড়ে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ বেধে যায়। গুজরাটের এই অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলেই মোগল আগ্রাসী বাহিনীর কাছে সহজেই গুজরাটের পতন ঘটে। গুজরাট রাজ্য মোগল সাম্রাজ্যের অধীন হয়ে পড়ে।

১৫২১ খ্রিষ্টাব্দে পর্তুগালের রাজা ম্যানিলের মৃত্যুর পর নতুন রাজা রূপে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন তৃতীয় জোয়াও। ভারতসহ সমগ্র সমুদ্রসীমায় পর্তুগিজদের অবাধ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা পেলেও পর্তুগিজ নাবিক-কর্মকর্তাদের সীমাহীন দুর্নীতির সংবাদ পেয়ে রাজা তৃতীয় জোয়াও দুর্নীতি ঠেকাতে পর্তুগিজ উপনিবেশের ভাইসরয় বা প্রধান কর্তার দায়িত্ব দিয়ে ভাস্কো দা গামাকে তৃতীয় দফায় ১৫২৪ খ্রিষ্টাব্দে ভারতে প্রেরণ করেন। ভারতে এসে বেশি দিন অর্পিত দায়িত্ব পালন করা গামার পক্ষে সম্ভব হয়নি। ১৫২৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ ডিসেম্বর ভারতের কোচিনে বাণিজ্যকুঠি পরিদর্শনে গিয়ে চরম নৃশংস নিষ্ঠুরতার দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী ভাস্কো দা গামা মৃত্যুবরণ করে। গামার মরদেহ যথাযোগ্য মর্যাদায় পর্তুগালের রাজধানী লিসবনের সাও জেরোনিমো গির্জা প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয়। ভারতবর্ষে পর্তুগিজ আগ্রাসনের বদৌলতে জাতীয় বীরের মর্যাদায় মার্বেল পাথরের সমাধিতে সমাহিত ভাস্কো দা গামার নির্মম নৃশংসতা ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যাবে না। ভারতবর্ষ ব্রিটিশদের করতলগত হলেও দমন, দিউ, গোয়া পর্তুগিজদের দখলদারিত্বে ছিল। ব্রিটিশদের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে ওই তিন স্থানে পর্তুগিজ উপনিবেশ টিকে ছিল ১৯৬১ সাল পর্যন্ত। ব্রিটিশ উপনিবেশের পতনের বহু পরে ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের সেনাবাহিনী দমন, দিউ, গোয়া থেকে পর্তুগিজদের সশস্ত্র পন্থায় বিতাড়ন করে ওই দ্বীপ তিনটি ভারতের অধীনে নেয়। ব্যক্তিগতভাবে আমি দুইবার গোয়া ভ্রমণ করেছি। মুম্বাই থেকে ব্রডগেজ ট্রেনযোগে মিরাজ এবং মিরাজ থেকে মিটারগেজ ট্রেনে গোয়ায় গিয়েছিলাম। গোয়ার প্রধান রেলস্টেশনের নাম আজও 'ভাস্কো দা গামা'র নামানুসারে রয়েছে। এটা আমাকে বিস্মিত করেছে। নৃশংসতার প্রতীক ভাস্কো দা গামা একজন হিংস্র কলঙ্কিত পর্তুগিজ জলদস্যু প্রধান। তার নামানুসারে স্বাধীন ভারতের গোয়া প্রদেশের প্রধান রেলস্টেশনের নাম ভাস্কো দা গামা দেখে যেমন বিস্মিত হয়েছিলাম, তেমনি হতাশও।

ভারতবর্ষ, মালয়, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ডসহ পুরো অঞ্চলের পর্তুগিজ আগ্রাসন-দখলদারিত্ব দীর্ঘমেয়াদি চলেছিল। তবে পর্তুগিজদের আগ্রাসন-দখলদারিত্ব সমুদ্র তীরবর্তী ও উপকূলেই প্রধানত সীমাবদ্ধ ছিল। স্থলের ভেতরভাগে তারা ঢোকেনি। স্থলভাগের ভেতরাংশে স্থানীয় শাসকরা শাসন করেছে। পর্তুগিজদের আগ্রাসনের পরিসমাপ্তি ঘটে ডাচদের (নেদারল্যান্ডস) আগমনে। ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সামরিক হস্তক্ষেপে পর্তুগিজদের বিতাড়ন করে মালাবারের সম্রাটের সঙ্গে সমঝোতার সন্ধি স্থাপন করে। অঞ্চলটি পর্তুগিজ মুক্ত করার পর ১৬৩৩ সালে ভ্যান ভিয়েমেন ডাচ সাম্রাজ্যের গর্ভনর নিযুক্ত হন। ডাচদের নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘমেয়াদি হয়নি। পর্তুগিজ, ডাচদের পর ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দৃষ্টি পড়ে ভারতবর্ষে। ১৬১২ খ্রিষ্টাব্দে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের অনুমোদনক্রমে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সুরাট বন্দরে ঘাঁটি স্থাপন করেছিল। ব্রিটিশ কোম্পানিকে ইন্দোনেশিয়া থেকে ডাচ কোম্পানি শক্তিবলে বিতাড়নের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতবর্ষে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। কিন্তু ব্রিটিশদের সঙ্গে শক্তিমত্তায় কুলিয়ে উঠতে না পেরে রণেভঙ্গ দিতে বাধ্য হয় ফরাসি কোম্পানি। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাণিজ্যের উছিলায় ভারতবর্ষে এসে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রহসন যুদ্ধের বদৌলতে ভারতবর্ষে প্রথম নিজেদের দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা রাজ্য তিনটিতে। পরে নানা কৌশলে-যুদ্ধে একে একে পুরো ভারতবর্ষ মুঠোয় নিয়ে নেয়। যার মেয়াদ একশ নব্বই বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন। একশ নব্বই বছরব্যাপী ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটে ১৯৪৭ সালের মধ্য আগস্টে। একশ নব্বই বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনজুড়ে ভারতবর্ষের সম্পদ লুণ্ঠনের ইতিহাস। শোষণ-বঞ্চনার নির্মম ইতিহাস। যেটি পর্তুগিজদের নীতি ও উদ্দেশ্য থেকে ব্যতিক্রম ছিল না। ছিল প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অধিক সংহত ও সংগঠিত।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com