অন্যদৃষ্টি

দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণের পরিবর্তন

প্রকাশ: ০৬ মে ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ১২ মে ২২ । ১৯:১৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

সৈয়দা আশরাফিজ জাহারিয়া প্রধান

বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতার হার আতঙ্কজনক। বাইরে তো বটেই, নারীদের একটা বড় অংশই পারিবারিক পরিসরে তাদের ঘনিষ্ঠজন কর্তৃক নির্যাতনের শিকার হয়। এর মধ্যে আছে শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক ও যৌন নির্যাতন। নারী নির্যাতন যে একটি গুরুতর অপরাধ- এ ব্যাপারে অনেক পুরুষেরই তেমন ধারণা নেই। এমনকি অনেক নারীরও নেই। স্বামীর হাতে মার খাওয়াকে স্বাভাবিক বলেই মনে করেন অনেক নারী। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মাল্টিপল ইন্ডিকেটর সার্ভে ২০১৯-এ উঠে এসেছে, প্রতি চারজন বিবাহিত নারীর একজন স্বামীর হাতে মার খাওয়াকে যৌক্তিক বলে মনে করেন। অর্থাৎ নারীদের একটা বড় অংশের মধ্যেও পুরুষের অপরাধকে যৌক্তিক বলে মেনে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি হয়েছে। এর ফল পারিবারিক নির্যাতন, ধর্ষণ, শ্বাপদসংকুল পথঘাট এবং কর্মক্ষেত্র। ঘরে-বাইরে কোথাও নিরাপদ নয় নারী। এই প্রেক্ষাপটে ইউএসএআইডি এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে কেয়ার বাংলাদেশ কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন সৌহার্দ্য-৩ প্রকল্প এলাকার ভেতর ও বাইরে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে একটি সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রচারণা পরিচালিত হয়। ২০২০ সালের ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে কেয়ার বাংলাদেশ ও দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি দৈনিকের যৌথ উদ্যোগে এই সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন শুরু হয়। 'আমাকে দিয়েই শেষ হোক' শীর্ষক এই প্রচারণার উদ্দেশ্য ছিল ফেসবুক, টুইটার এবং ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারীদের জন্য নারীর ক্ষমতায়ন ও নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে অনলাইন আলোচনা, বিতর্ক ও বিশ্নেষণ পরিচালনা করা এবং নারীর অধিকার, ক্ষমতায়ন ও নারীর প্রতি সহিংসতা নিরসনের ব্যাপারে এই প্রজন্মের চিন্তা-ভাবনা, বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও আচরণ সম্পর্কে জানা। সাধারণত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা খুব দ্রুত নিউজফিড স্ট্ক্রল করেন এবং ছোট ছোট ভিজ্যুয়াল কনটেন্টই তারা বেশি দেখেন। এই ক্যাম্পেইনে প্রচলিত জেন্ডার ক্ষমতা কাঠামোবিষয়ক ভিজ্যুয়াল কনটেন্টগুলোতে তরুণ ব্যবহারকারীরা বেশি সাড়া দিয়েছেন।

করোনাভাইরাস মহামারির লকডাউনের সময় পুরুষদের ঘরে অবস্থানের সময় বেড়েছিল। পাশাপাশি বেড়েছিল নারীর ওপর ঘরের কাজের চাপ এবং সহিংসতাও। পরিবারের সবাই মিলে ঘরের কাজগুলো করলে নারীরা কিছুটা অবসর পান। এতে পারিবারিক বন্ধনও দৃঢ় হয়। এই বিষয়টি নিয়ে 'এই লকডাউনে আমি (পুরুষ) কীভাবে অংশগ্রহণ করছি' শীর্ষক একটি ফটো কনটেস্টের আয়োজন করা হয়েছিল ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে। কনটেস্টে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পুরুষ বিশেষত কিশোররা অংশগ্রহণ করেছেন, তাদের ছবি পাঠিয়েছেন। নারীর প্রতি সহিংসতা বিষয়ে ধর্মীয় নেতাদের দৃষ্টিভঙ্গিও ক্যাম্পেইনের আলোচনার মাধ্যমে উঠে এসেছে। একদম উন্মুক্ত স্পেস হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের বিষয় নিয়ে ক্যাম্পেইনে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বনেরও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কয়েকটি বিষয় খুবই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। যেমন, ইতিবাচক মানসিকতার পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রাধান্য দেওয়া, সংবেদনশীল বিষয়ে গোপনীয়তা বজায় রাখা, পারিবারিক দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনায় নেওয়া, হবু স্বামী বা কিশোর উপযোগী কনটেন্ট তৈরি এবং নিয়মিত আলোচনার জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা।

নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পুরুষের মানসিকতা আর আচরণগত পরিবর্তনের জন্য ব্যাপক পরিকল্পনা ও কর্মতৎপরতা প্রয়োজন। নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণগত পরিবর্তনও প্রয়োজন। এ ধরনের সামাজিক পরিবর্তন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। তবে এ প্রক্রিয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্যাম্পেইন বা প্রচারণা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ করতে নিল্ফেম্নাক্ত বিষয়গুলো বিবেচনা করা দরকার :সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের মতামতে দ্রুত সাড়া দেওয়া; নারীর অবসর সময়ের ম্যাপিং করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের সম্পৃক্ততা বাড়ানো; অফলাইন নেটওয়ার্ক বাড়ানো বিশেষ করে যেখানে ইন্টারনেট সুবিধা নেই; প্রান্তিক এলাকাগুলোতে বিভিন্ন উপায়ে সংশ্নিষ্ট বিষয়ে তথ্য প্রচার করা।

সৈয়দা আশরাফিজ জাহারিয়া প্রধান: অ্যাডভাইজার, নারীর ক্ষমতায়ন, কেয়ার বাংলাদেশ

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com