পর্যটন

অপরূপা বান্দরবানের অভিজ্ঞতা

প্রকাশ: ০৬ মে ২২ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কাওসার চৌধুরী

গত মার্চ মাসের ২৪ তারিখ কক্সবাজার থেকে দুপুরে যাত্রা শুরু করে বান্দরবান সার্কিট হাউসে গিয়ে যখন পৌঁছলাম তখন প্রায় বিকেল। সূর্যটা হেলে পড়েছে পশ্চিমে; নরম হয়ে এসেছে গ্রীষ্ফ্মের খর রোদ। চারদিক বেশ নির্জন-নিশ্চুপ, ছিমছাম। সার্কিট হাউসের তিন তলায় আমার জায়গা হলো। কামরার নামটি এ মুহূর্তে মনে আসছে না; তবে বিখ্যাত কোনো পাহাড়ি ঝরনার নামে এই কামরার নাম। ঝরনার নামটি দেখেই হৃদয়ের মধ্যে শীতল একটি জলধারা বয়ে গেল; আহ্‌ প্রশান্তি! কামরায় বোচকা-পুটলি রেখে বেরিয়ে এলাম বারান্দায়।

বান্দরবান সার্কিট হাউসটি পাহাড়ের চূড়ায়। ভবনের সামনেই প্রশস্ত খালি জায়গা। জায়গাটির কিনারাজুড়ে ফুলের বাগান। তার ঠিক মাঝ বরাবর ভিআইপিদের আনুষ্ঠানিক সালাম জানানোর পাকা মঞ্চ। মঞ্চের সামনেই একটি উঁচু লোহার দণ্ডে বুক ফুলিয়ে উড়ছে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা। এই মঞ্চের ৮-১০ ফুট পরেই পাহাড়টি হুট করে নেমে গেছে হাজারখানেক ফুট নিচে। এর পর একটি উপত্যকা। উপত্যকার অপর প্রান্তে আবারও পাহাড়। ডানে-বামে-সামনে যতদূর দৃষ্টি যায় পাহাড় আর পাহাড়। সেই পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে রং-বেরঙের কিছু বাড়িঘর। অধিকাংশই দালান, অল্প কিছু টিনের ছাউনি, বাকিগুলোতে পাতার ছাউনি দেওয়া। এসব বাড়িঘরে সূর্যের লালচে আলো পড়ে অসাধারণ একটি মায়া তৈরি করেছে! হঠাৎ একটি চড়ূই এসে বসল বারান্দার রেলিংয়ে। চিড়িক চিড়িক দু'বার মাথা নেড়ে ফুড়ূৎ করে উড়ে গেল। পাশের গাছে পাখির শব্দ। একটি কোকিল ডাকল খুব কাছ থেকে। অন্যরকম স্নিগ্ধ একটি পরিবেশ! নগর যন্ত্রণায় জর্জরিত মনটা হঠাৎ সজীব হয়ে উঠল মোহিনী পরিবেশের ছোঁয়ায়।

এবারে ঈদের ছুটিতে যারা নানা জায়গায় ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন তাদের জন্য ক'টা টিপস দিতে চাই। এর আগে পুরো বিষয়ের সূত্র একটু ধরিয়ে দিই। আমি গিয়েছিলাম বান্দরবানে প্রামাণ্যচিত্র 'বধ্যভূমিতে একদিন' প্রদর্শন করতে। ২৫ মার্চ 'গণহত্যা দিবস'-এ বান্দরবানে 'অরুণ সারকী টাউন হল'-এ প্রামাণ্যচিত্রটি প্রদর্শিত হয়েছে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে। সেই সূত্রেই আমার যাওয়া।

প্রামাণ্যচিত্রটির প্রদর্শনী ছিল ২৫ মার্চ সন্ধ্যায়। সকালে কিছুটা সময় পাওয়া গেল। সে সুযোগে বান্দরবান জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার মো. কায়েসুর রহমানকে ম্যানেজ করে ছুটলাম 'নীলাচল' আর 'মেঘলা' দেখতে। ওহো, বলে রাখি, 'নীলাচল' আর 'মেঘলা' হলো বান্দরবানের বিশেষ দুটি পর্যটনকেন্দ্র। অবশ্য বান্দরবানে রয়েছে আরও অনেক মনোমুগ্ধকর স্থান ও পর্যটনকেন্দ্র। এখানকার মেঘলা, নীলাচল, নীলগিরি, শৈলপ্রপাত, প্রান্তিক লেক, বনপ্রপাত, চিম্বুক পাহাড়, স্বর্ণমন্দির, রামজাদি মন্দির, নাফাকুম, অমিয়াকুম, দেবতাকুম, রিঝুক ঝরনা, বগা লেক ছাড়াও ঘুরে আসতে পারেন এই জেলার আলীকদম, লামা, রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি ও নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে।

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ 'তাজিংডং'-এ আরোহণ করতে চাইলে যেতে হবে বান্দরবানের 'রুমা'য়। অসাধারণ সুন্দর একটি পাহাড়! উচ্চতার দিক থেকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় পর্বতশৃঙ্গ 'কেওক্রাডং'ও এই 'রুমা'তেই অবস্থিত। এই রুমায় পাওয়া যাবে নীলগিরি, বগা লেক, রিঝুক ঝরনা, রূপমুহুরী ঝরনা, জাদিপাই ঝরনা, টেবিল পাহাড় এবং জোড়া ঝরনার মতো মনোমুগ্ধকর স্থান।

মারমা ভাষায় 'ডং' মানে পাহাড়চূড়া তথা শৃঙ্গ। এই 'ডং' শব্দকে কেন্দ্র করে 'তাজিংডং' এবং 'কেওক্রাডং'-এর মতো অনেক পাহাড়ের নামকরণ হয়েছে এসব পার্বত্য এলাকায়। বান্দরবান প্রেস ক্লাবের সভাপতি বাংলাদেশ টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি জানালেন, মারমা ভাষায় 'কেও' শব্দের অর্থ পাথর এবং 'ক্র' মানে শিরা আর 'ডং' মানে পাহাড়চূড়া বা শৃঙ্গ। সেই হিসেবে 'কেওক্রাডং'-এর মানে দাঁড়ায় 'পাথুরে শিরার শৃঙ্গ'। আবার মারমা ভাষায় 'তাজিং' শব্দের অর্থ গাঢ় সবুজ, আর 'ডং' মানে শৃঙ্গ। সে অর্থে 'তাজিংডং' পাহাড়ের বাংলা মানে দাঁড়ায় 'গাঢ় সবুজ শৃঙ্গ'। তিনি আরও চমৎকার একটি তথ্য দিলেন রুমা এলাকার 'বগা লেক' এবং রাঙামাটির 'রাইখ্যাং' খাল (মতান্তরে পুকুর) নিয়ে। তিনি জানান, স্থানীয় বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বান্দরবানের 'রুমা' উপজেলার 'বগা লেক' এবং রাঙামাটির 'রাইখ্যাং' খালের মধ্যে ভূগর্ভস্থ একটা আন্তঃসংযোগ আছে। প্রমাণ হিসেবে তারা বলেন, এ পাশে বগা লেকে জল ঘোলা হলে ওদিকে রাঙামাটির রাইখ্যাং জলাশয়ে (পাহাড়চূড়ায়) জল ঘোলা হয়ে যায়। পক্ষান্তরে রাঙামাটির রাইখ্যাং জলাশয়ে জল কমতে কিংবা বাড়তে থাকলে এ পাশে বান্দরবানের বগা লেকে জল কমে কিংবা বাড়তে থাকে রাইখ্যাং জলাশয়ের সমান্তরালে। অথচ বান্দরবানের বগা লেক থেকে রাঙামাটির রাইখ্যাং খালের দূরত্ব কিন্তু ৭৪ কিলোমিটার। জনশ্রুতি আছে- এ দুটি স্থান কোনো একটি প্রাচীন আগ্নেয়গিরির 'জ্বালামুখ' হয়ে থাকতে পারে।

ফিরে আসি 'নীলাচল'-এ। গাড়ি থেকে নেমেই চারদিকে একবার দৃষ্টি বুলিয়ে নিই। আহা, এত সুন্দর পাহাড় আর এমন খোলা নীল আকাশ বহু বছর দেখা হয় না ঢাকা শহরের ঘুপচিতে বসে! খোলা আকাশ পেয়ে মনটা বুকের খাঁচা থেকে বেরিয়ে গেল ওই দিগন্তে; যেখানে 'আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায়' দীর্ঘকাল। আহা, কী প্রশান্তি!

নীলাচলে আমরা যেখানটায় নেমেছি, ওখান থেকে ১৫-২০ কিলোমিটার দূরে আরও ক'টি উঁচু পাহাড়। ওই পাহাড়ের চূড়ায় তখন সাদা আর ধূসর মেঘের সঙ্গম চলছে! মেঘের ওই সঙ্গমস্থলের নাম 'স্বপ্নচূড়া'। ওই স্থানটির নামকরণ করেছেন বান্দরবানের জেলা প্রশাসক ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি। পার্বত্য জেলা বান্দরবানকে তিনি শান্তি-সম্প্রীতি আর পর্যটনের উল্লেখযোগ্য জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করে চলেছেন দিবারাত্রি। তার প্রশাসন দল নিয়ে তিনি বান্দরবানের প্রতিটি ক্ষেত্রে সৃষ্টিশীলতার ছাপ রেখেছেন এর মধ্যেই। যোগাযোগ, আবাসন, নিরাপত্তা থেকে শুরু করে বান্দরবানের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি পর্যটকদের কাছে পৌঁছে দিতে নানা পরিকল্পনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করে চলেছে জেলা প্রশাসন।

জেলা প্রশাসক জানালেন, পর্যটনের দিকে বিশেষ নজর রেখে বান্দরবানের যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের কথায় সায় দিয়ে স্থানীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি যোগ করেন, 'গত ১২-১৩ বছরে বর্তমান সরকার বান্দরবানের যোগাযোগ ব্যবস্থায় যে উন্নতি সাধন করেছে, তা অল্প কথায় শেষ করা যাবে না।' যোগাযোগের উন্নতির কারণে থানচি, রুমা, রোয়াংছড়ির মতো দুর্গম এলাকা এখন আর 'দুর্গম' নেই; হয়ে গেছে সহজগম্য। সেখানে নিশ্চিত হয়েছে বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা, সুন্দর-আরামদায়ক আবাসন, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার (স্থানীয় খাবারও সহজলভ্য), স্থানীয় নৃগোষ্ঠীর পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা মনোজ্ঞ আয়োজন।

বান্দরবানে ১৩টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ মোট জনসংখ্যা চার লাখ ৫০ হাজারের বেশি (২০১১-এর আদমশুমারি অনুযায়ী)। বাঙালির সঙ্গে এই নৃগোষ্ঠীর অবস্থান অত্যন্ত সুন্দর, শান্তিময় এবং সম্প্রীতির বলে জানালেন জেলা প্রশাসক। ১০ কিলোমিটার আয়তনের বান্দরবান শহরে প্রায় ৬৫ হাজার মানুষের বসবাস।

খাবারের ক্ষেত্রে বান্দরবানের স্থানীয় খাবার পর্যটকদের অত্যন্ত প্রিয়। কারও কারও কাছে তা লোভনীয়ও বটে! বিশেষত 'বাঁশ কোড়ল', 'ব্যাম্বু চিকেন', 'মুন্ডি', 'হুরো হুরবো', 'কাঁকড়া ভাজা', 'মরিচ মাংসের গুদিয়্যা', 'বাচ্চুরি ভাজা', 'কলাপাতার পিঠা (আতিক্যা পিঠা)', 'কলাপাতার বিন্নিখোয়া', 'বিন্নি চালের চ্যা চ্যা পিঠা' পর্যটকদের খুবই প্রিয়।

বান্দরবানে পর্যটকদের জন্য সরকারি আবাসনের পাশাপাশি ব্যক্তিমালিকানায় হোটেল-রেস্তোরাঁ গড়ে উঠেছে অনেক আগেই। দৈনিক ৫০০ টাকা ভাড়ার হোটেল থেকে শুরু করে ২৫ হাজার টাকায় 'প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুট'ও প্রস্তুত এই পার্বত্য জেলায়। এর পাশাপাশি 'কমিউনিটি ট্যুরিজম' এবং 'স্টে হোম' প্রকৃতির আবাসনের আয়োজন আছে বান্দরবানে। 'কমিউনিটি ট্যুরিজম'-এর কথা কমবেশি সবাই জানি। কিন্তু স্টে হোমের বিষয়টি বেশ অভিনব। বান্দরবানের স্থানীয় মানুষ পর্যটন মৌসুমে নিজেদের বাড়িঘরের কিছু অংশ ভাড়া দিয়ে থাকেন পর্যটকদের কাছে। এতে একদিকে যেমন স্থানীয়দের অর্থ লাভ হয় কিছুটা; অন্যদিকে এসব বাড়িঘরে অবস্থানকালে পর্যটকদের সঙ্গে স্থানীয়দের মিথস্ট্ক্রিয়ায় একটি চমৎকার সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন তৈরি হয়ে থাকে। 'স্টে হোম' প্রক্রিয়ায় স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষও তাদের আবাসস্থল ভাড়া দিয়ে থাকেন পর্যটকদের জন্য।

সরকার দেশের ৬৪ জেলার স্বাতন্ত্র্য ও সম্ভাবনাকে বিকশিত করার মাধ্যমে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে 'জেলা ব্র্যান্ডিং' নামে প্রকল্প হাতে নিয়েছে বেশ ক'বছর আগেই। প্রতিটি জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্য, পণ্য, পর্যটন, সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও বিকাশ- এই জেলা ব্র্যান্ডিংয়ের প্রধান লক্ষ্য। এর মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে বান্দরবান জেলা প্রশাসন যে কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে তা পর্যটকদের জন্য অনুকূল এবং সহায়ক হবে বলে অনুমান করি।

কাওসার চৌধুরী :প্রামাণ্যচিত্র

নির্মাতা ও অভিনেতা

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com