দিবস

থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে রক্তপরীক্ষা

প্রকাশ: ০৮ মে ২২ । ১৯:১৯ | আপডেট: ০৮ মে ২২ । ১৯:২১

ফারহিন ইসলাম

থ্যালাসেমিয়ার প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ অন্তত চার গুণ কম ব্যয়বহুল

প্রতি বছর বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে ৮ মে আন্তর্জাতিক থ্যালাসেমিয়া দিবস পালিত হয়। গত বছর দেশে এ দিবসটির প্রতিপাদ্য ছিল 'তারুণ্য থেকে শুরু হোক থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ, বিয়ের আগে রক্তপরীক্ষা করবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিরাপদ'। প্রতি বছর এই দিবসকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন আলোচনা ও অনুষ্ঠানে প্রতিরোধের ওপর জোর দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের কোনো সার্বিক কর্মসূচি নেই।

থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের জন্য যে কর্মসূচিগুলো প্রয়োজন তার মধ্যে রয়েছে বাহক শনাক্তকরণ, বাহকের জেনেটিক কাউন্সেলিং, রোগের সমস্যা ও ঝুঁকি সম্পর্কে বাহকদের অবগত করা এবং সমাজে ব্যাপক আকারে সচেতনতা সৃষ্টি। থ্যালাসেমিয়া বাহক কোনো রোগ নয়। যদি আপনি থ্যালাসেমিয়া বাহক হয়ে থাকেন এর মানে আপনি একটি ত্রুটিপূর্ণ জিন বহন করেছেন; কিন্তু আপনি থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত নন। থ্যালাসেমিয়া ওই ত্রুটিযুক্ত জিনের কারণে হওয়া একটি বংশগত রক্তরোগ। পিতা-মাতা দু'জনই থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক হলে রোগটি সন্তানের মধ্যে সঞ্চারিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। থ্যালাসেমিয়া বাহকদের সচরাচর কোনোরকম ওষুধ বা চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না এবং তারা সুস্থ মানুষের মতোই জীবনযাপন করতে পারে, এমনকি কোনো লক্ষণও দেখা দেয় না বেশিরভাগ ক্ষেত্রে।

সাইপ্রাস, গ্রিস, ইরান এবং ইতালির মতো থ্যালাসেমিয়াপ্রবণ অঞ্চলের দেশগুলো বাহক নির্ণয়ের জন্য বিয়ের আগে রক্তপরীক্ষা এবং থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুর জন্মরোধ করার জন্য গর্ভস্থ ভ্রূণ পরীক্ষার মতো সাধারণ প্রতিরোধ কৌশল প্রয়োগ করে থ্যালাসেমিয়া শিশুদের জন্মহার কমাতে সফল হয়েছে। বিয়ের আগে রক্তপরীক্ষা এবং গর্ভস্থ ভ্রূণ পরীক্ষা- এই সুবিধাগুলো বাংলাদেশেও রয়েছে তবে সীমিত আকারে। কেবল ঢাকায় একটি বেসরকারি কেন্দ্রে গর্ভস্থ ভ্রূণ পরীক্ষা করা হয়, যেখানে এখন পর্যন্ত মাত্র ২০০টি পরীক্ষা করা হয়েছে। বিয়ের আগে রক্তপরীক্ষাও বাধ্যতামূলক নয়, সচেতন জুটিরা নিজে থেকে পরীক্ষাটি করিয়ে থাকেন, পরীক্ষাটির নাম হিমোগেল্গাবিন ইলেক্ট্রোফরেসিস। আগ্রহীদের নিজ উদ্যোগে এবং নিজের পকেটের টাকা খরচ করে এই পরীক্ষাগুলো করতে হয়, সচেতনতার অভাবে যা বেশিরভাগ সময়ই করা হয় না।

পর্যাপ্ত সহায়ক চিকিৎসা নিয়ে থ্যালাসেমিয়া রোগীরা অনেকটা স্বাভাবিক মানুষের মতো জীবনযাপন করতে পারলেও চিকিৎসা না করালে সাধারণত জন্মের পাঁচ বছরের মধ্যেই মারা যায় থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুরা। থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা হল নিয়মিত পরিমিত রক্তগ্রহণ, কিন্তু প্রতি মাসে নিরাপদ রক্ত সংগ্রহ করা রোগীর পরিবারের জন্য অনেক চ্যালেঞ্জিং। চিকিৎসার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো শরীর থেকে অতিরিক্ত আয়রন নিস্কাশন, যার ওষুধ বেশ ব্যয়সাপেক্ষ। চিকিৎসাগুলো ঢাকা বা চট্টগ্রামের বাইরে প্রয়োজনের তুলনার অপ্রতুল। সব মিলিয়ে থ্যালাসেমিয়ার পেছনে রোগীর পরিবারকে মাসে ১০ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয়, যা নিম্ন বা মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর আয়ের একটি বড় অংশ এবং গড়ে আয়ের তুলনায় বেশি। জাতীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যবীমার সুবিধা না থাকায় বেশিরভাগ রোগী অপর্যাপ্ত চিকিৎসা নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে থাকে। সঠিকভাবে চিকিৎসা নিতে না পারায় রোগীরা আরও নানা শারীরিক জটিলতার সম্মুখীন হয়, যেমন হার্ট/লিভার ফেইলিওর, হরমোনগত সমস্যা, অস্থি ভঙ্গুর হয়ে যাওয়া এবং হেপাটাইটিসের মতো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়া। থ্যালাসেমিয়া পরিপূর্ণভাবে নিরাময়ের একমাত্র উপায় বোনম্যারো প্রতিস্থাপন; যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। বাংলাদেশে বোনম্যারো প্রতিস্থাপনের সুযোগ খুবই সীমিত এবং খরচ প্রায় ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া বোনম্যারো প্রতিস্থাপনের সফলতা নির্ভর করে রোগীর বয়স, বোনম্যারো ম্যাচিং হওয়া ও রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর। সবকিছু বিবেচনায় থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের কোনো বিকল্প নেই।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, থ্যালাসেমিয়ার প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ অন্তত চার গুণ কম ব্যয়বহুল। তাই দেশে থ্যালাসেমিয়ার বোঝা কমাতে প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। কিন্তু এই প্রতিরোধের পদে পদে রয়েছে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ। নীতিনির্ধারকরা থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের জন্য বিয়ের আগে বাধ্যতামূলক রক্তপরীক্ষায় বিশেষভাবে জোর দিচ্ছেন যেহেতু বাহকের সঙ্গে বাহকের বিয়ে বন্ধ করাই দেশে থ্যলাসেমিয়া প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকরী উপায়। কিন্তু পাত্র-পাত্রী দুই পক্ষকে সঠিকভাবে কাউন্সেলিং না করলে এ বিষয়টি বিয়ে সম্পর্কে সমাজে কিছু নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের মতো রক্ষণশীল সমাজে বিয়ে একটি অত্যন্ত জটিল সামাজিক ঘটনা। থ্যালাসেমিয়া বাহক হওয়ার কারণে যদি একটি পরিকল্পিত বিয়ে ভেঙে দেওয়া হয়, তবে তা পাত্র-পাত্রী এবং তাদের পরিবারকে সমাজে বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন করতে পারে। ফলে, ঝুঁকিপূর্ণ (বাহকের সঙ্গে বাহকের) বিয়েগুলো হয়তো এভাবে থামানো সম্ভব হবে না। সৌদি আরবে এক গবেষণায় দেখা গেছে যে বিয়ের আগে বাধ্যতামূলক রক্তপরীক্ষা ও জেনেটিক কাউন্সেলিং করা সত্ত্বেও বাহকের সঙ্গে বাহকের বিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোধ করা যায়নি। আরেকটি বিষয় এখানে লক্ষণীয় যে দু'জন থ্যালাসেমিয়া বাহকের মধ্যে বিয়ে নিরুৎসাহিত করা হলেও একজন সুস্থ ব্যক্তির সঙ্গে একজন বাহকের বিয়েতে কোনো বাধা নেই, কারণ এক্ষেত্রে সন্তান থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত হবে না। কিন্তু বাহক সম্পর্কে সমাজে নেতিবাচক ধারণা প্রচলিত থাকার কারণে সচেতনতার অভাবে, একজন বাহক বিয়ে করতে গিয়ে সামাজিক বাধার সম্মুখীন হতে পারেন। 'বিয়ের আগে রক্তপরীক্ষা' শব্দগুচ্ছের ব্যবহার এই নেতিবাচক ধারণাকে আরও উস্কে দিতে পারে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে রক্ত, বিয়ে, আত্মীয়তার বিষয়গুলো সমাজে খুব স্পর্শকাতর। অজ্ঞতার কারণে থ্যালাসেমিয়া বাহকদের 'রক্তের দোষ' আছে বলে অভিহিত করা হয়, যা তার বিবাহজীবনে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।

যদি বাবা-মা দু'জনই বাহক হয় সেক্ষেত্রে প্রতিরোধের আরেকটি কার্যকরী উপায় হলো গর্ভস্থ ভ্রূণ পরীক্ষা (প্রিন্যাটাল ডায়াগনোসিস)। গর্ভের সন্তানের থ্যালাসেমিয়া ধরা পড়লে বৈধভাবে চিকিৎসকের পরামর্শে গর্ভপাত করানো এর উদ্দেশ্য। এর পেছনে বাধা হলো প্রিন্যাটাল ডায়াগনোসিসের পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকা, সচেতনতার অভাব এবং ধর্মীয় গোঁড়ামি। ইসলামী ফতোয়া অনুযায়ী মায়ের স্বাস্থ্য ও ভ্রূণের শারীরিক অসংগতি বিবেচনায় গর্ভপাত করানো বৈধ। তবে বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় বাংলাদেশের মতো মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে এটি প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যাপক সচেতনতা প্রয়োজন। সর্বোপরি, থ্যালাসেমিয়া সফলভাবে প্রতিরোধ করতে হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো অপরিহার্য। সচেতনতা বাড়ানোর জন্য দেশের প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি আমলে নিতে হবে এবং সে অনুযায়ী কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। ধর্মীয় স্কলার, রোগী ও তাদের বাবা-মা এবং শিক্ষকদের এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com