প্রাক-বাজেট আলোচনা ২০২২-২৩: বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা

করের হার কমিয়ে আওতা বাড়াতে হবে

প্রকাশ: ০৯ মে ২২ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

--

আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে করপোরেট আয়কর কমানো, অগ্রিম আয়কর নেওয়া বন্ধ করা, উৎসে আয়কর কমানো ও ভ্যাট আইনের সংস্কার উদ্যোগ চেয়েছেন দেশের বিভিন্ন খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীরা; পাশাপাশি রাজস্ব সংগ্রহ ব্যবস্থা সহজ ও হয়রানিমুক্ত করার প্রস্তাব করেছেন। ব্যবসায়ীরা করহার কমিয়ে করের আওতা বাড়িয়ে এনবিআরের রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পরামর্শও দিয়েছেন। গত ৩১ মার্চ রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আগামী অর্থবছরের বাজেট সামনে রেখে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) এবং দৈনিক সমকাল ও চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় এসব প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন ব্যবসায়ীরা।

এম এ মান্নান

আমি একজন সচেতন দর্শক। প্র্যাকটিশনার বা একাডেমিক নই। দর্শক হিসেবে বলছি, গত ১০ বছর সরকারের ভেতরে হাঁটাহাঁটি করে অনেক বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। অনেক সমস্যা আছে ঠিকই। অন্য দেশেও আছে। আমাদের দেশে একটু বেশি। সমস্যা সমাধানে এক জায়গায় হাত দিতে গেলে বিশ জায়গায় নড়াচড়া করে। ফলে সব কাজ চাইলেই যে করা যায়, তা নয়। আমি পলিসি লেভেলের কেউ নই। তবে এ কথা বলতে দ্বিধা নেই, অবকাঠামো খাতে উন্নয়ন হচ্ছে। আরও যেসব উন্নয়ন দরকার, সেগুলো সরকারকে অবশ্যই করতে হবে। বেসরকারি খাতের সক্ষমতা আগের চেয়ে বেড়েছে। সরকারের পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়নে বেসরকারি খাতের আরও বেশি ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। সরকার মনে হয় কর্তৃত্ববাদিতা পছন্দ করে। তা না হলে এই সময়ে এসেও কেন বিভিন্ন সংস্থার নামে কর্তৃপক্ষ শব্দটি যুক্ত করা হয়। বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি বা বিআইডিএর নাম আমি মনে করি, বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন এজেন্সি বা বিআইপিএ হওয়া উচিত।

রিজওয়ান রাহমান

আগামী অর্থবছরের বাজেটে আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানো। ঢাকা চেম্বার আসন্ন বাজেটে শিল্প খাতের উন্নয়ন, সহজ ও ব্যবসাবান্ধব আয়কর ব্যবস্থা, আয়কর ও ভ্যাটের আওতা বৃদ্ধি, অটোমেশন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, স্থানীয় শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং উচ্চতর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতকরণ বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার জন্য অনুরোধ করছি। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিশীল গতিধারা ও ২০২৬-পরবর্তী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উন্নত ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। তা ছাড়া ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত অর্থনীতিতে উন্নীত হতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। সেখানে ৩০০ থেকে ৩৫০ জন শিক্ষার্থী ছিলেন। এসব শিক্ষার্থীর সবার একটাই প্রশ্ন- আমাদের ভবিষ্যৎ কী? আমরা কি চাকরি পাব? বেশিরভাগ নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান, তাদের ওই রকম কানেকশন নেই। ছাত্ররা বলছে, সরকারি চাকরি যদি না পাই, তাহলে ছোটখাটো ব্যবসা কি করা যাবে? এই যে একটা শ্রেণি- যারা ব্যবসা করতে চায়, কিন্তু পুঁজি নেই, কানেকশন নেই, তাদের জন্য ইজ অব ডুয়িং বিজনেসে উন্নতি দরকার। কারণ, তারাও তো বাংলাদেশেরই। ইজ অব ডুয়িং বিজনেস ঠিক করে দেন; দেখবেন এফডিআই আসবে। স্থানীয় উদ্যোক্তারাও সুযোগ পাবে। এসএমই বাড়বে। আমেরিকা, জার্মানির অর্থনীতির ব্যাকবোন হচ্ছে এসএমই। আমাদের দেশেও এসএমইর ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। সঠিক নীতিমালার মাধ্যমে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।

মো. শফিউল ইসলাম (মহিউদ্দিন)

আমাদের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন। সব ব্যবসায়ী চায় ইজ অব ডুয়িং বিজনেস হোক। করোনার সময়ে সরকার ব্যবসা খাতে সহযোগিতা করেছে। সেই সহায়তা সবাই সমানভাবে নিতে পারেনি। বড়রা যতটা পেরেছে, এসএমইরা ততটা পারেনি। অনেকে পারেনি কমপ্লায়েন্স না হওয়ার কারণে। তাদের সহযোগিতা করতে হবে। আর ডিভিডেন্ডের ওপর ২০ শতাংশ আয়কর আছে। এটা কমিয়ে ১০ শতাংশ করা উচিত। করপোরেট কর আমাদের দেশে ৩০ শতাংশ। আর বিশ্বে গড় ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ। আমাদের কমেছে। আরও কমাতে হবে। এনবিআর, অর্থ মন্ত্রণালয় গুটিকয়েক চোরকে মাথায় রেখে সবাইকে জেনারালাইজ করে ফেলে, এটা থেকে বের হতে হবে। এখন কর কর্মকর্তাদের কমিশন নামে একটা পদ্ধতি চালু হয়েছে। ইন্সপেক্টরকে ক্ষমতায়ন করা হয়েছে মামলার জন্য। ইজেড এখনও রেডি হয়নি। কিন্তু সেখানকার জমি লিজের ওপর ট্যাক্স দিতে হবে। এসবই এনবিআরের কর্তৃত্বময় অ্যাটিটিউট। এই অ্যাটিটিউট পরিবর্তন করতে হবে। নতুবা সরকারের যে স্বপ্ন ২০৪১ সালে উন্নত দেশে রূপান্তর- তা হবে না। ট্যারিফ কোন পণ্যের কত হবে, তা নির্ধারণ করবে আলাদা কর্তৃপক্ষ। আর ট্যারিফ আদায় করবে আলাদা কর্তৃপক্ষ। প্রকল্পের বাস্তবায়ন দক্ষতা বাড়াতে হবে। নতুন সময় ও অর্থ দুটিই বেশি লাগে। সরকারের কোনো কোনো কাজ খুব দ্রুত হচ্ছে। কোনোটা খুব স্লো। বিআরটি প্রকল্পটি ৯ বছরে পড়েছে। এখনও শেষ হয়নি। মানুষের প্রচুর কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। যারা এর সঙ্গে জড়িত, তাদের শাস্তির আওতায় আনা উচিত।

মো. জসিম উদ্দিন

বাজেট প্রণয়নে এনবিআর ব্যবসায়ী, পেশাজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করলেও বাজেটে তা প্রতিফলিত হয় না। এনবিআর ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করছে ঠিকই, কিন্তু এগুলো লোক দেখানো। একটা মিটিংয়েরও রেকর্ড রাখা হয় না। আমি এনবিআরকে বললাম, এসব মিটিংয়ের কার্যপত্রগুলো আমাদের দেন। এনবিআর কোনো কথা বলে না। এর অর্থ কী? ব্যবসায়ীসহ সব ধরনের মানুষের অবদানে এ পর্যায়ে এসেছে দেশ। এলডিসি থেকে উত্তরণ হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য ও ব্যবসায়ীদের লক্ষ্য এক। কিন্তু অনেক সময় সরকারি দপ্তরগুলো তা বোঝে না। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের মতামত ছাড়াই নীতিমালা করা হয়ে থাকে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত। আয়কর আইন করা হচ্ছে। হঠাৎ করে বলা হলো, ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে মতামত দিতে হবে। আমরা বলেছি, এটা সম্ভব নয়। পরে আমরা ১৭টি মিটিং করে মতামত দিয়েছি। পাঁচ বছর আগেও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে নীতিমালা করা হতো, এখন হয় না। বিদেশি জাহাজে পণ্য আনছি, এলসিতে জাহাজ ভাড়া পরিশোধ করছি। কোনো কর নেওয়া হচ্ছে না। বিদেশ থেকে দেশীয় জাহাজে পণ্য আনলে জাহাজ কোম্পানি থেকে কর নেওয়া হচ্ছে। এটা দ্বৈত নীতি। অগ্রিম আয়কর কেটে রাখার কারণে ব্যবসায়ীদের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। যেহেতু এ কর শেষ পর্যন্ত সমন্বয় বা ফেরত দেওয়া হয়, সেহেতু কেটে না রাখলে ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন। ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভারের ব্যবসাকে ভ্যাটের আওতাবহির্ভূত রাখা দরকার। ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ শিল্প সম্প্রসারণে উদ্যোগ দরকার। আর সব রপ্তানিমুখী শিল্পের করপোরেট করহার কমাতে হবে। আমরা রাজস্ব সংগ্রহের বিরুদ্ধে নয়। ৫-৭ বছরের পুরোনো ফাইল টানা হচ্ছে। রাজস্ব কর্মকর্তারা তাদের মামলা বাড়ানো বা কমিশন আয় বাড়াতে এসব করছেন। এগুলো বন্ধ করেন। দেশে কোনো খাত দাঁড় করাতে হলে নীতি সহায়তা দিতেই হবে। আমাদের ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ শিল্প দরকার, এসএমই খাতের বিকাশের সুযোগ দরকার। এলডিসি থেকে উত্তরণের আগেই এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কোনো খাতের মধ্যে বৈষম্য রাখা ঠিক হবে না। ক্যাপাসিটি ও ক্যাপাবিলিটি নিয়ে কাজ করতে হবে।

মো. সাইফুল ইসলাম

আমরা সবাই বলছি ট্যাক্স নেট বাড়ানোর জন্য। কারণ, ট্যাক্স নেট বাড়ালে করের হার কমানো যাবে। গত দুই বছরে করপোরেট করহার আড়াই শতাংশ করে মোট ৫ শতাংশ কমানো হয়েছে। এ বছর কমপক্ষে আরও আড়াই শতাংশ কমানো দরকার। টার্নওভারের ওপর উৎসে করের কারণে করপোরেট কর বেড়ে যায়। এ বছর বাজেটে আরেকটা বিষয় খুবই জরুরি। ট্যাক্স রিফান্ড বিশ্বব্যাপী আছে। এবারের বাজেটে সিম্বলিক হলেও ট্যাক্স রিফান্ড প্রভিশন রাখা দরকার। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে চ্যালেঞ্জ যেমন আছে, সম্ভাবনাও আছে। কমপক্ষে ২০২৬ সালের পরের জন্য পলিসি সাপোর্ট দরকার। সাসটেইনেবল গ্র্যাজুয়েশন পলিসি নিতে হবে। যাতে মিডল ইনকাম ট্র্যাপে পড়ে না যাই। সবশেষে বলব, ভ্যাট ব্যবস্থাকে স্বয়ংক্রিয় করতে হবে।

আসিফ ইব্রাহিম

ব্যবসাকে করোনার আগের জায়গায় নেওয়ার উদ্যোগ দরকার। এ জন্য কর কমাতে হবে। পুঁজিবাজারে এসএমই প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ভুক্তিকে বেগবান করতে প্রণোদনা দরকার। লভ্যাংশের ওপর কর নেওয়া রোহিত করা যেতে পারে। পাশাপাশি ডিবেঞ্চারে কর রেয়াত দেওয়া দরকার। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করতে হবে। করপোরেট কর কমানো দরকার। এনবিআরের রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ৩০ শতাংশের বেশি ধরা ঠিক হবে না।


মো. আলমগীর হোসেন

এ বছরের বাজেট রাজস্ব ফোকাস হবে, না বিনিয়োগ ফোকাস হবে- সেটি এখন আলোচনার বিষয়। ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে বের হবে দেশ। তখন আমদানি পর্যায়ে অনেক রাজস্ব কমবে। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্বের জোগান দিতে হবে। ফলে ২০৩১ ও ২০৪১-এর লক্ষ্য অর্জনে বিনিয়োগ দরকার হবে। যার মাধ্যমে কর্মসংস্থান হবে। উন্নয়ন লক্ষ্যের খণ্ডিত অংশ হচ্ছে বার্ষিক বাজেট। অবশ্যই বিনিয়োগবান্ধব বাজেট হবে। আশা করা যায়, সরকার ভ্যাট আইন, অগ্রিম আয়কর বিষয়ে বাজেটে নতুন করে ভাববে। রাতারাতি সবকিছু করা যাবে, তা নয়। তবে ইতিবাচকভাবেই এগোচ্ছে সরকার। বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসতে হবে।

আরিফ খান

প্রতিবছর বাজেট নিয়ে অ্যাডহক বেসিস আলোচনা না করে মিডটার্ম ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। বাংলাদেশ বছরে তিন-চার বিলিয়ন ডলারের এফডিআই পায়। আর ভিয়েতনাম পায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। কেন এফডিআই কম আসছে, তা দেখা উচিত। দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। বাংলাদেশের ব্যাংক দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করে থাকে। হওয়া উচিত ব্যাংক স্বল্পমেয়াদে বিনিয়োগ করবে। বন্ড মার্কেট ডেভেলপমেন্ট করতে হবে। সঞ্চয়পত্রে সুদ বেশি থাকার কারণে বন্ড মার্কেট আকর্ষণীয় হচ্ছে না। একই অবস্থা মিউচুয়াল ফান্ডেও। বন্ড মার্কেট ও মিউচুয়াল ফান্ড ডেভেলপ করা গেলে ব্যাংকের ওপর থেকে চাপ কমবে। আর স্টার্টআপ কোম্পানিকে সহযোগিতার জন্য এসব কোম্পানির ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স না নেওয়ার বিধান দরকার।

নাসের এজাজ বিজয়

আমার মনে হয়, বাজেট বিষয়ে একটা রোডম্যাপ ঠিক করা দরকার। কর নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। সে জন্য আমি কিছু বলতে চাচ্ছি না। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দর অনেক বেড়েছে। কীভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, ভাবতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ছয় বিলিয়ন ডলার কমে এসেছে। অর্থবছরের বাকি সময়ে জ্বালানি তেল আমদানিতে চার বিলিয়ন ডলার বেশি লাগবে। এখন ডলারের সাপ্লাই বাড়াতে হবে। সভরেন বন্ড ইস্যু করা যেতে পারে। ব্যাংকাস্যুরেন্স, সর্বজনীন পেনশন ভালো উদ্যোগ। ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম সম্প্রসারণ করা দরকার। আইএফসিসহ অন্যান্য দাতা সংস্থার সঙ্গে সংযোগ বাড়ানো যেতে পারে। এসএমই সংজ্ঞা ঠিক করতে হবে। বাংলাদেশে যেসব কোম্পানির মূলধন পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত, তারা এসএমই আর ভারতে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত এসএমই। বাজেটে অনেক খরচ অনুমোদন করা হয় না। ফলে করহার বেড়ে যায়।

ড. মো. হাবিবুর রহমান

ব্যাংক খাত দু'ভাবে কাজ করে। সম্পদ মোবিলাইজ করে রাজস্ব সৃষ্টি করে। আর সরকারের ঘাটতি অর্থায়ন করে থাকে। ব্যাংকিং খাত থেকে যে ঘাটতি অর্থায়ন হয়, সেটি বেশ ফ্ল্যাক্সিবল। বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার বেশ জটিলতা আছে। আবার সঞ্চয়পত্র থেকে নিতে গেলে অনেক সময় প্রয়োজনের চেয়ে বেশি চলে আসে, তাতে সুদের বোঝা বেড়ে যায়। আবার প্রয়োজনের তুলনায় কমও আসে। এদিকে, জনস্বার্থও দেখে ব্যাংক খাত। সম্প্রতি ডিপোজিট রেট কমে গিয়েছিল। বাজারে তারল্য বেশি ছিল। ডলার ছেড়ে তা ড্রাই করা হয়েছে। ছয় মিলিয়ন ডলার বাজারে ছাড়া হয়েছে। এতে অনেক টাকা উঠে এসেছে। ফলে সুদহার বাড়ছে। এ ছাড়া ডিপোজিট রেট যাতে মূল্যস্ম্ফীতির নিচে না থাকে, সে জন্য ব্যাংকগুলোকে এক ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার জন্য কাজ করছে ব্যাংক খাত।

তাসকিন আহমেদ

হালকা প্রকৌশল পণ্যকে ২০২০ সালে বর্ষপণ্য হিসেবে ঘোষণা করলেও তা কাজে লাগানো যায়নি। হালকা প্রকৌশল খাতে বহুমুখীকরণে আইসিটি যোগ করা দরকার। এ জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। অটোমোবাইল শিল্পে ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম এ খাতে অনেক এগিয়েছে। ২০১৬ সালে টু হুইলার পলিসি এসেছে। এরপর প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে। এখন অন্যান্য খাতে পলিসি দরকার। একটি কার তৈরিতে পাঁচ হাজার ও বাস তৈরিতে আট হাজার উপকরণ দরকার হয়। বাংলাদেশ টাটা, অশোক লেল্যান্ড, টয়োটার ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ হিসেবে কাজ করতে পারে। সে জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা লাগবে।


মোস্তফা কামাল

বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা দুর্দান্ত, অদম্য। আমাদের ইজ অব ডুয়িং বিজনেস দেন, দেখবেন দেশ প্রত্যাশার চেয়ে বেশি এগোচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো তাদের কর্তৃত্ব ছাড়তে চায় না। দেশে এক মিলিয়ন ডলার এফডিআই আসে। পরে ফেরত যায় সাত মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা রপ্তানি করছেন, বিদেশ থেকে ঋণ নিয়ে আসছেন। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক তা ইতিবাচকভাবে দেখছে না। তহশিলদার থেকে সচিব পর্যন্ত সবাই অসহযোগিতা করে থাকেন। আমি আমার নিজের অভিজ্ঞতা বলতে পারি। আমার একটি কাজে সরকারি একটি দপ্তরে আবেদন করা ছিল। খোঁজ নিলাম, দেরি হচ্ছে কেন জানতে চাইলাম। তারা বললেন, 'ফাইলটি সরকারি নিয়ম অনুযায়ী চলমান রহিয়াছে।' এই পরিস্থিতির পরিবর্তন দরকার। অনেকে বিনিয়োগ করে গ্যাস পাচ্ছেন না। এটা নীতির দুর্বলতা। সরকার যদি আগে থেকে কোথায় সংযোগ দেওয়া হবে, কোথায় দেওয়া হবে না সে ঘোষণা করে, তাহলে উদ্যোক্তাদের সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হয়। বহুমুখীকরণের কথা বলা হচ্ছে; কিন্তু সরকারি দপ্তরের লোকেরা ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব নিচ্ছেন না। কোনো প্রস্তাব নিয়ে গেলে তারা বলে দিচ্ছেন, বাংলাদেশে এর চেয়ে ভালো কাজ হচ্ছে। এই মানসিকতা পাল্টাতে হবে। জাহাজশিল্পের আয়ের ওপর এখনও চার্জ দিতে হচ্ছে। ৫ শতাংশ থেকে কমাতে কমাতে ১ শতাংশে এসেছে। বন্দর চার্জ, নোঙর চার্জ দিতে হচ্ছে। বেসরকারি খাতে সমুদ্রগামী ৩৭টি জাহাজ থেকে এখন ৮৭টি জাহাজ হয়েছে। সরকারি শিপিং করপোরেশনের জাহাজ সংখ্যা মাত্র চারটি; কিন্তু সব নিয়মকানুন তাদের মাথায় রেখে করা। আমি বলছি, অন্য দেশের তুলনায় বেশি সুবিধা দিতে হবে না, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে যে সুবিধা আছে তাই দেন। দেখেন দেশের উদ্যোক্তারা দেশকে কোথায় নিয়ে যান।

শহীদুল্লাহ আজীম

চলতি অর্থবছরে রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫০ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪ সালে তা বাড়িয়ে করা হয়েছে ৮০ বিলিয়ন ডলার। কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস, ইজ অব ডুয়িং বিজনেস ছাড়া এ লক্ষ্য অর্জন হবে না। কোনো নীতি খণ্ডকালীন করা যাবে না। কমপক্ষে পাঁচ বছরের জন্য নীতি করতে হবে। ব্যবসায়ীদের ঘাটে ঘাটে দৌড়ানো বন্ধ করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানে নতুন নতুন ধরনের পণ্য তৈরি করতে হচ্ছে। কিন্তু নতুন কিছু আমদানি করতে গেলেই এইচএস কোডের জটিলতায় পড়তে হচ্ছে। এসব জটিলতা দূর করতে হবে। শেষ চার মাসে চার বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় হয়েছে। গ্রোথ রেট ৪০ শতাংশ। ক্ষণে ক্ষণে করহার পরিবর্তন করে জটিলতা বাড়ানোর পরিবর্তে করের আওতা বাড়িয়ে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াতে হবে।

নাভিদুল হক

বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লেও মানুষ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাচ্ছে না। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের জন্য বিতরণ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ দরকার। অনেক দেশই এখন স্মার্ট গ্রিড ব্যবস্থায় চলে গেছে। বাংলাদেশকেও যেতে হবে। জ্বালানি ক্রমান্বয়ে আমদানিনির্ভর হয়ে যাচ্ছে। হেভি ফুয়েল থেকে ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। প্রত্যেকটি জ্বালানির দাম বাড়ছে। এ জন্য আগামী বাজেটে জ্বালানি খাতে ভর্তুকির চাপ বাড়বে। এ জন্য বিতরণ ব্যবস্থায় বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। আগামী বাজেটে এ খাতের কর কমাতে হবে।


মাহবুবুল আনাম

আন্তর্জাতিক বাজারে লজিস্টিকসের ডিসরাফশন হয়েছে। ফলে খরচ বেড়েছে ৮০০ থেকে ১০০০ শতাংশ পর্যন্ত। লজিস্টিকসে বাংলাদেশ ১০৭টি দেশের মধ্যে ১০০তম অবস্থানে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি খরচ হয়। আগামী পাঁচ বছরে সমুদ্রগামী রপ্তানি দ্বিগুণ হবে। ফলে লজিস্টিকসের চাহিদা বাড়বে। পুরো খাতটি এখন পর্যন্ত সরকার নিয়ন্ত্রিত। ৯টি মন্ত্রণালয় ও ১১টি দপ্তর এ খাতে দেখভাল করে। এ বিষয়ে এখনই একটি নীতিমালা দরকার। ওয়ান স্টপ সার্ভিস দরকার। ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং ইন্ডাস্ট্রিকে প্রচ্ছন্ন রপ্তানিকারক হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হলেও এ খাত সুবিধা পাচ্ছে না। ভাড়ার ওপর কর, আগাম কর দিতে হচ্ছে। এসব প্রত্যাহার করা জরুরি।

সৈয়দ আলী জওহর রিজভী

অর্থনীতি, বাজার যেভাবে বড় হচ্ছে, সে অনুযায়ী অফ ডক, আইসিডি খাত বিস্তৃত হয়নি। গত ১০ বছরে মাত্র একটি অফ ডক হয়েছে। বর্তমানে ৪৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানিতে প্রয়োজনীয় লজিস্টিকস দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ৬০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি হলে ৫০ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডেল করতে হবে। সে অনুযায়ী দক্ষতা বাড়েনি। আগামীতে রপ্তানি বাড়লে তার প্রয়োজনীয় লজিস্টিকস দেওয়া সম্ভব হবে না। ফলে এ খাতে প্রণোদনা দিয়ে ও কর কমিয়ে অফ ডক, আইসিডি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার

দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল হচ্ছে। এই অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো দেশের গ্রোথ ইঞ্জিন হবে।  অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভেতরের জমির লিজে ভ্যাট আছে। ইউটিলিটির ওপর সার্ভিস চার্জ আছে। ই-জেডের ভেতরের ইউটিলিটিতে খরচ বেশি। বিনিয়োগের স্বার্থে এই ভ্যাট প্রত্যাহার করা উচিত। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক অঞ্চলের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে দীর্ঘমেয়াদি নীতি সহায়তা, ইউটিলিটি খরচ কমানোর উদ্যোগ দরকার। পাশাপাশি সেমি-কন্ডাক্টর খাতে নজর দিতে হবে। বিশ্বব্যাপী এই খাতটি এগোচ্ছে। দেশে বছরে ২৫ হাজার প্রকৌশলী বের হচ্ছে। এদের বড় অংশ বিদেশে চলে যাচ্ছে। বিশ্বে সেমি-কন্ডাক্টর খাতের ৫৫৬ বিলিয়ন ডলারের বাজার রয়েছে। এর মধ্যে ৩৪ বিলিয়ন ভারতের, ২৭ বিলিয়ন মালয়েশিয়ার দখলে। বাংলাদেশেরও সম্ভাবনা রয়েছে। এ খাতের জন্য ইকোসিস্টেম দাঁড় করানো দরকার। এ জন্য বাজেটে বরাদ্দ দিতে হবে।

মোজাম্মেল হোসেন

সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। বাজেটে বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা নিয়ে প্রাঞ্জল আলোচনা হয়েছে। আমি সংবাদপত্র শিল্পের কর্মী হিসেবে আমার শিল্পের দাবিটিও তুলতে চাই। সংবাদপত্র শিল্পেও করপোরেট কর ৩০ শতাংশ। সংবাদপত্র বর্তমানে টিকে থাকার চ্যালেঞ্জে রয়েছে। বিক্রি কমে গেছে। বিজ্ঞাপন কমে গেছে। কিন্তু খরচ বেড়েছে। ফলে এ শিল্পে কর কমানো জরুরি। অন্যান্য খাত নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে তাতে এটা স্পষ্ট, কোথাও কোনো বিরোধ নেই। পার্থক্যের বিষয় আছে মাত্র। সবাইকে ধন্যবাদ।

প্রধান অতিথি
এম এ মান্নান
পরিকল্পনামন্ত্রী

বিশেষ অতিথি
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী
চেয়ারম্যান
অ্যাপেক্স গ্রুপ

মো. শফিউল ইসলাম (মহিউদ্দিন)
সাবেক সভাপতি, এফবিসিসিআই

মো. জসিম উদ্দিন
সভাপতি, এফবিসিসিআই

সঞ্চালক
রিজওয়ান রাহমান
সভাপতি, ডিসিসিআই

ধন্যবাদ জ্ঞাপন
মোজাম্মেল হোসেন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
সমকাল

আলোচক

মো. সাইফুল ইসলাম
সভাপতি, এমসিসিআই

আসিফ ইব্রাহিম
চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ

মো. আলমগীর হোসেন
সাবেক সদস্য (কর নীতি), এনবিআর

আরিফ খান
ভাইস চেয়ারম্যান
শান্তা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড

নাসের এজাজ বিজয়
সভাপতি, এফআইসিসিআই

ড. মো. হাবিবুর রহমান
প্রধান অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ ব্যাংক

তাসকিন আহমেদ
উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইফাদ গ্রুপ

মোস্তফা কামাল
চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ

শহীদুল্লাহ আজীম
সহসভাপতি, বিজিএমইএ

নাভিদুল হক
সহসভাপতি, বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন

মাহবুবুল আনাম
ব্যবস্থাপনা পরিচালক
এক্সপো গ্রুপ বাংলাদেশ

সৈয়দ আলী জওহর রিজভী
চেয়ারম্যান, অ্যালায়েন্স হোল্ডিংস

মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার
সহসভাপতি, বাংলাদেশ ইকোনমিক জোন ইনভেস্টরস অ্যাসোসিয়েশন

অনুলিখন
শেখ আবদুল্লাহ
সিনিয়র রিপোর্টার
সমকাল

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com