স্মরণ

অকুতোভয় এক মুক্তিযোদ্ধা

প্রকাশ: ১১ মে ২২ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কারশেদ আলম

মো. শামসুল হাদী বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ১৯৬৯-৭০ সালে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলায় রাজপথের লড়াকু সৈনিকের ভূমিকা পালন করেন তৎকালীন ছাত্রনেতা শহীদ মারফত আলী, অ্যাডভোকেট আবদুল জলিল ও জিয়াউল বারী নোমান। ১৯৬৬ সালে ছয় দফা ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই ছাত্রলীগের সামনের কাতারের সৈনিক হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। '৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে এ দেশের ছাত্র-শ্রমিক-জনতাকে রাজপথে সংঘবদ্ধ করার কর্মকৌশল নির্ধারণ ও আন্দোলনের প্রথম সারিতে ছিলেন শামসুল হাদী। ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন তিনি আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করার জন্য।

১৯৭১ সালের ৩ মার্চ কুষ্টিয়া শহরে ইসলামীয়া কলেজ মাঠে কেন্দ্রীয় নিউক্লিয়াসের নির্দেশে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করেন তিনি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে এবং প্রথম পতাকা উত্তোলন করেন তৎকালীন ছাত্রলীগ সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট আবদুল জলিল। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ শুনতে তিনি, আবদুল জলিল, মারফত আলী, অ্যাডভোকেট আখতারুজ্জামান মাসুমসহ বেশ কয়েকজন ছাত্রনেতা ঢাকায় যান। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন তৎকালীন ছাত্রনেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট আবদুল জলিল ও শামসুল হাদী। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তানি আর্মিরা দখল নিতে কুষ্টিয়া শহরে ঢুকে পড়ে। শহর মুক্ত করতে ১৯৭১ সালের ৩১ মার্চ ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক ঐক্যবদ্ধ হয়ে পুলিশ লাইনস, ওয়্যারলেস অফিস ও জিলা স্কুলে আক্রমণ শুরু করে। হাজার হাজার মানুষ চারপাশ ঘিরে পাকিস্তানি আর্মিদের পরাজিত করে। ওই যুদ্ধের অগ্রভাগে নেতৃত্ব দেন শামসুল হাদী, মারফত আলী, আবদুল জলিল, লোকমান হোসেন, জিয়াউল বারী নোমান প্রমুখ। শামসুল হাদীর মা মোছা. শামসুন নাহার প্রথম কুষ্টিয়া শহরে নিজের বাসার ছাদে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন এবং তার সাত সন্তানের পাঁচ সন্তানকেই মুক্তিযুদ্ধে পাঠিয়ে দেন। শামসুল হাদী এফএফের বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলার কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বংশীতলা যুদ্ধ, আড়পাড়া যুদ্ধ, নাটনাপাড়া যুদ্ধ, কুমারখালী যুদ্ধ, নওদাপাড়া যুদ্ধসহ প্রায় ৩০টি যুদ্ধের সম্মুখসারিতে থেকে নেতৃত্ব দেন।

স্বাধীন বাংলাদেশে অনেক মুক্তিযোদ্ধা মনে করেছিলেন, মুক্তির সংগ্রাম ফুরিয়ে যায়নি; আবারও লড়াই করতে হবে কৃষক-শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠায়। অনিবার্যভাবে একটি রাজনৈতিক দলের সৃষ্টি হয়। দলটি হলো জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (৩১ অক্টোবর, ১৯৭২)। বৃহত্তর কুষ্টিয়ার জাসদের দায়িত্ব গ্রহণ করেন স্বাধীনতার প্রথম পতাকা উত্তোলনকারী অ্যাডভোকেট আবদুল জলিল, শামসুল হাদী ও মারফত আলী। বৃহত্তর কুষ্টিয়ায় প্রায় সব মুক্তিযোদ্ধা জাসদের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৭৫ সালের ১১ মে কুষ্টিয়ার শ্রেষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হাদীসহ আট বীরযোদ্ধা স্বাধীন বাংলাদেশে হানাহানিতে মারা যান।

বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলায় এক পর্যায়ে স্বাধীনতাবিরোধী উগ্রবাদীদের উত্থান ঘটে। ১৯৭৪ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি বৃহত্তর যশোরে মুক্তিযুদ্ধের মহান সংগঠক জাসদের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেনকে তার বাসার নিচতলায় চেম্বারে সন্ধ্যার পর ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়। এ দুটি হত্যাকাণ্ডের কারণে গোটা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে স্বাধীনতাবিরোধী চরমপন্থিরা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। শামসুল হাদী অমরত্বের প্রতীক হয়ে থাকবেন আমাদের মধ্যে। বিনম্র শ্রদ্ধায় তাকে স্মরণ করি।

কারশেদ আলম :প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com