সালভাদর দালি

ভার্চুয়াল মুখোশে অ্যাকচুয়াল প্রতিরোধ

প্রকাশ: ১১ মে ২২ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজীব নন্দী

'মিরর সেলফি' বা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ছবি তোলার বৈশ্বিক 'ট্রেন্ড' এসেছে সামাজিক মাধ্যমে। যার অর্থ 'নিজেকে দেখো, নিজেকে দেখাও'। সেই 'আমারই চেতনার রঙে পান্না হলো সবুজ'! ত্রিশের দশকে পৃথিবীজুড়ে চলা শিল্প আন্দোলনকে ঝাঁকুনি দিয়ে এক চিত্রশিল্পী যেমনটি বলেছিলেন- নিজেকে নানান ভঙ্গিমায় দেখতে ও দেখাতে হবে, আমরাই আমাদের সুষুপ্তি-আচ্ছন্ন স্বপ্ন, আমিই আমার অচেতন মনের গোপন গুঞ্জন!

প্রিয়তমাকে উদ্দেশ করে ওপরের কথাগুলো শিল্পী যখন বলছিলেন, তখন তার বয়স মাত্র ২৭। সেই আত্মোপলব্ধির পর তিনি বেঁচে ছিলেন ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত। অক্ষরে অক্ষরে সেসব কথা পালনও করেছেন। সে শিল্পীকে ইতিহাস স্মরণে রেখেছে সালভাদর দালি নামে। ১৯০৪ সালের আজকের দিনে তার জন্ম। পরাবাস্তব চিত্রকর্ম ও শিল্প আন্দোলনের জন্য তিনি জগৎখ্যাত। দালি আবার ফিরে এসেছেন পৃথিবীতে। গোল গোল ফোলা চোখ আর ঊর্ধ্বমুখী সরু গোঁফ জোড়া নিয়ে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় মুখোশ 'দালি মাস্ক'-এর অবয়বে।

পৃথিবীজুড়েই অসংগঠিত মানুষ নিরবচ্ছিন্নভাবে লড়াই, বিক্ষোভ, প্রতিবাদে নামছে। শহরের চেনা পরিচিত রাজনৈতিক দল বা চত্বরের চেয়েও অপরিচিত জনপরিসরকেই তারা বেছে নিচ্ছে। কখনও সেটা শাহবাগ, কখনও শাপলা চত্বর, কখনও তা প্রতিবেশী দেশের কলেজ স্ট্রিট, কখনও বৈশ্বিক তাহরির স্কোয়ার!

জনপ্রিয় স্প্যানিশ ওয়েব সিরিজ লা কাসা দে প্যাপেলের (মানি হাইস্ট) লাল জাম্পস্যুট এবং দালি মাস্ক পরে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী পেনশনের দাবিতে ডেপুটিজ কংগ্রেস থেকে ব্যাঙ্ক অব স্পেনের সামনে বিক্ষোভ করেছে সম্প্রতি। গত তিন বছর ধরে পৃথিবীর গোটা দশেক বিক্ষোভে সমবেত জনতা দালি মাস্ক পরেছে। প্রশ্ন হলো, কেন রাতারাতি দালি মাস্ক বিক্ষোভের প্রতীক হয়ে উঠেছে?

ওয়েব সিরিজটিতে পেশিবহুল কোনো তারকা নন; মধ্যবয়সী সাধারণ গড়নের প্রফেসর সার্হিও তার প্রয়াত পিতার অপূর্ণ ইচ্ছা পূরণ করতে দুনিয়ার সবচেয়ে 'বড় চুরি'র দায় নেন। তার দাদা মারা গিয়েছিলেন ইতালির ফ্যাসিবাদবিরোধী বামপন্থি লড়াইয়ে। সেই প্রফেসরের দল দালি মুখোশকে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় করে তুলেছে। এটি এখন প্রতীকে পরিণত। প্রফেসর সার্হিওর একটি মানবিক দিক হলো, ব্যাংক ডাকাতি হবে কিন্তু কোনো খুনোখুনি হবে না। এমনকি জিম্মিদের সঙ্গেও ভালো ব্যবহার করতে হবে। এই ওয়েব সিরিজ স্পেন সীমান্ত ছাড়িয়ে অ্যান্টিহিরো সিমপ্যাথি নিয়ে তৈরি করেছে বিনোদনের নয়া বিশ্বায়ন। 'ভালো' নয়, 'মন্দ' নিয়ে এই অপার মানবিক অনুভূতি কমিউনিকেশন স্টাডিজে 'অ্যান্টিহিরো সাগা' নামে পরিচিত। মাস কমিউনিকেশনের ম্যাজিক বুলেট থিওরি এবং মিডিয়া ডিপেনডেন্সি থিওরির সফল প্রয়োগও হয়েছে এই সিরিজকে কেন্দ্র করে। সেই ওয়েব সিরিজের দালি মুখোশ পরে এখন পৃথিবীর বহু দেশে বিক্ষোভ হচ্ছে।

এভাবেই মহান পরাবাস্তববাদী সালভাদর দালি ফিরে ফিরে এলেন আমাদের বিক্ষোভ, বিদ্রোহ, প্রেম, রোমান্সে। সঙ্গে নিয়ে আসেন বিদ্রোহী গালার সঙ্গে অবিশ্বাস্য প্রেমের গল্প। দালি আর গালা, যাদের জীবনের একটি অপ্রত্যাশিত সাক্ষাৎ দুই জীবনের অপ্রত্যাশিত মোড়ে গিয়ে ঝাঁকুনি খায়। বেচারা পল কোন দুঃখে যে বলতে গেল দালিকে- 'আমার রাশিয়ান স্ত্রী গালার সঙ্গে দেখা করুন, আমি তাকে আপনার কাজ সম্পর্কে অনেক কিছু বলেছি।' গালাকে দেখে বেচারা দালি 'গলে' গেলেন। তারপর বাকিটা ইতিহাস! নয় নয় করে, ৯ বছর পর গালা-পলের বিয়ে বিচ্ছেদ। গালা চলে যান সালভাদর দালির কাছে, প্যারিসে। দালি অপেক্ষা করছিলেন মাওলানা জালালুদ্দিন রুমির সেই 'ঠিক-বেঠিকের বাইরে একটি দরজা'য়।

গালার প্রতিভা ও প্রেম দালির ভেতরের শিল্পীসত্তাকে জাগিয়ে তুলেছিল। দালি হয়ে ওঠেন প্রকৃত অর্থে সালভাদর দালি। মানি হাইস্ট ওয়েব সিরিজেও প্রফেসর হার্সিওকে ছদ্মনাম নিতে দেখি সালভা, যা আসলে সালভাদর।

দালি যে ধারার চিত্রশিল্পী, তারা পুঁজিবাদের অসারতা টের পায়। সবাইকে সম্পৃক্ত করে ফেলে মিছিল, সমাবেশ, রাজনীতি, সংগীত, কবিতা, চিত্রকলার মাধ্যমে। মানি হাইস্টেও আমরা দেখি, 'ডাকাত' প্রফেসরের দলের পক্ষে দালি মাস্ক পরে হাজারো জনতার বিক্ষোভের ঢল। এই দালি মাস্কের মূল সুর 'লা রেসিস্ট্যান্সিয়া' অর্থাৎ প্রতিরোধ।

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সফরে গেলে দেখি, সুদূর বোলপুর শান্তিনিকেতনের ছাত্রী অনশ্রীয়া কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে দালি মাস্কের সামনে দাঁড়িয়ে সংহতি ছবি তুলছেন। দেখি পশ্চিমবাংলার সুন্দরবনে মধু সংগ্রহের জন্য মউলেদের জন্য বন দপ্তরের তরফেও দালি মুখোশের ব্যবস্থা করতে। কারণ, চাক থেকে মধু ভাঙা বা জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানোর সময় মাথার পেছন দিকে সাধারণত মুখোশ বেঁধে রাখেন মউলেরা। বাঘ বা অন্য জন্তু কাছে চলে এলেও মুখোশ দেখে যাতে ভয় পায়, সে কথা মাথায় রেখেই মুখোশের ডিজাইন করা হয়।

নব্বইয়ের আগে বাংলাদেশেও রাজনৈতিক সংগঠনগুলো দাবি-দাওয়া নিয়ে ধারাবাহিক বিক্ষোভের ডাক দিত। শ্রমিক, কৃষক মধ্যবিত্ত ধীরে ধীরে যুক্ত হতো। এখন বাংলাদেশই নয়, বরং পৃথিবীজুড়েই সংক্ষুব্ধ মানুষ স্বতঃস্ম্ফূর্ত প্রতিবাদ বিক্ষোভে নেমে যাচ্ছে। কোনো রাজনৈতিক দলের আশায় কেউ আর বসে থাকছে না। জলের বুদ্বুদের মতো একেকটি আন্দোলন হচ্ছে। জনতা এই ফুটছে, তো এই মিইয়ে যাচ্ছে! নেতাহীন 'নৈরাজ্যবাদী' এই আন্দোলনে সংক্ষুব্ধ মানুষ কখনও বেছে নিচ্ছে ফ্যান্টাসি মুখোশ, কখনও রোমাঞ্চকর স্লোগান, কখনওবা অভূতপূর্বভাবে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্রমবর্ধমান প্রসার এবং বিনোদন জগতে ফিল্ম, ওয়েব সিরিজের প্রভাব ভার্চুয়াল সমাজ ছাপিয়ে অ্যাকচুয়াল সমাজে একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। সমাজের অভ্যন্তরে এই বিপ্লবী রূপান্তর সমাজ পরিবর্তনের বিপ্লবী রাজনৈতিক শক্তিগুলো যত দ্রুত অনুধাবন করতে পারবে, ততই সমাজ বিপ্লব ত্বরান্বিত হবে।

দালির জন্মদিন ডাক দিয়ে গেল- ভার্চুয়াল মুখোশের আড়ালে অ্যাকচুয়াল মুখগুলো স্লোগান দিতে থাকুক- লা রেসিস্ট্যান্সিয়া!

রাজীব নন্দী :সহকারী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

rajibnandy@cu.ac.bd

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com