সমকালীন প্রসঙ্গ

ইভিএম বিতর্ক কিংবা ঘোড়ার আগে গাড়ি

প্রকাশ: ১১ মে ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ১১ মে ২২ । ১০:৩৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

এম হাফিজ উদ্দিন খান

দেশে হঠাৎ জাতীয় নির্বাচনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক অধিকারের ক্ষেত্রে যখন বিরোধীদের দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছিল; তখনই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করার ঘোষণা অল্পবিস্তর আশার আলো দেখিয়েছে। একই সঙ্গে তিনি সংসদীয় সব আসনেই ইভিএমের মাধ্যমে ভোটগ্রহণের কথা বলেছেন। বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে মূলত এ বিষয়কে কেন্দ্র করেই।


প্রধানমন্ত্রীর ওই ঘোষণার পর দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি তাদের প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছে, আওয়ামী লীগের অধীনে আর কোনো নির্বাচনেই তারা যাবে না; ইভিএম তো পরের বিষয়। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর নির্বাচন পর্যবেক্ষক, গবেষকসহ নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং আরও কয়েকটি রাজনৈতিক দলের প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে- ইভিএম পদ্ধতিতে আপত্তি।


ইভিএম পদ্ধতি নিয়ে এর আগে অনেক বিতর্ক হয়েছে। এই কলামেই এর আগে ইভিএম পদ্ধতি নিয়ে আপত্তির কথা জানিয়েছিলাম। ইভিএমে ভোট গ্রহণ কোনো নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা যে নয়- তা ইতোমধ্যে দেশে কমবেশি প্রমাণিত। যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশেও এ পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক উঠেছিল এবং তারা সেখান থেকে সরে এসেছে।


অনেক অভিযোগ মাথায় নিয়ে বিদায়ী নির্বাচন কমিশন ইভিএমে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভোট গ্রহণ করে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছে। খোদ কমিশনের ভেতরেও এ নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য শোনা গিয়েছিল। দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা যখন কঠিন প্রশ্নের মুখে; তখন ইভিএমে ভোট গ্রহণের প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক ওঠা অমূলক বলে উড়িয়ে দেওয়ার অবকাশ নেই। তা ছাড়া নির্বাচনের ব্যাপারে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী নির্বাচন কমিশনের এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত এখন পর্যন্ত জানা যায়নি।

আমি মনে করি, ইভিএম নিয়ে ফের বিতর্কের ক্ষেত্র সৃষ্টি না করে নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনকালীন তাদের সহযোগী শক্তি সরকারের উচিত রাজনৈতিক অঙ্গনে নির্বাচন নিয়ে যে সন্দেহ কিংবা আস্থাহীনতা রয়েছে, তা দূর করা। এই জরুরি কাজটি না করে কোন প্রক্রিয়ায় নির্বাচন হবে এ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া বা কথা বলা যেন ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়া।


ইভিএম ভোট গ্রহণের একটি পদ্ধতি মাত্র। যদি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা না যায় এবং হূত আস্থা পুনরুদ্ধারে নতুন নির্বাচন কমিশন দৃষ্টান্ত দাঁড় করাতে না পারে, তাহলে যে পদ্ধতিতেই নির্বাচন হোক না কেন; এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন-বিতর্ক নিরসন করা যাবে না। নতুন নির্বাচন কমিশনকে এখনও পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়নি। পরীক্ষাটা হলো- তাদের যে মুখ্য কাজ প্রশ্নমুক্ত, স্বচ্ছ নির্বাচন করা এবং নির্বাচনে অংশীজন সবার অধিকারে মাঠ সমতল রাখা; সে ক্ষেত্রে তারা শতভাগ সফল কিনা। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য তাদের প্রস্তুতি কতটা আছে কিংবা তারা কতটা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সংবিধান প্রদত্ত দায়িত্ব রক্ষায় এসব বিষয় তাদের কাজের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করতে হবে।


নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা কী হবে এবং সবার অংশগ্রহণ যাতে নিশ্চিত হয় এ জন্য ক্ষমতাসীনদের তরফে সর্বাগ্রে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে মনে করি। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে রেষারেষি নয়; পরমতসহিষুষ্ণতাই মুখ্য। কিন্তু দুর্ভাগ্য, এসব ক্ষেত্রে আমাদের অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখিই হতে হচ্ছে। স্বাধীন বাংলাদেশে এ পর্যন্ত কোনো দলীয় সরকারের অধীনে প্রশ্নমুক্ত নির্বাচন তো হয়ইনি; উপরন্তু কোনো কোনো নির্বাচন (বিশেষ করে জাতীয় সংসদ নির্বাচন) আমাদের জাতীয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে। কাজেই নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যাপারে ঐকমত্যে না পৌঁছে নির্বাচনের পথে পা বাড়ালে আরও বেশি নেতিবাচকতা দৃশ্যমান হয়ে উঠবে। কারণ এসব ক্ষেত্রে আমাদের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়।

ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণে ডিজিটাল কারচুপির যে অভিযোগ উঠেছিল; বিদায়ী কমিশন এর কোনো সুরাহা করতে পারেনি। তা ছাড়া এই মেশিন যখন সীমিতভাবে ক্রয় করা হয় তখনও এ নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। এ ছাড়া মনে রাখতে হবে, নির্বাচন কমিশনের সংসদীয় সব আসনে ইভিএমে ভোট গ্রহণের সক্ষমতা নেই। আমি মনে করি, গণতন্ত্রের স্বার্থে সব রাজনৈতিক দলের নির্বাচনে অংশ নেওয়া উচিত। নির্বাচন বর্জন কোনো সমাধান নয়, বরং তা গণতন্ত্রের জন্য আরও বড় অশুভ বার্তা বয়ে আনে।

আজ যারা সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ও সরকারের সঙ্গে আছেন (জাতীয় পার্টি বাদে) এবং বিএনপিসহ অন্য বিরোধী দল তারা সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়েই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের পথ সৃষ্টি করেছিলেন অস্বচ্ছ নির্বাচন স্বচ্ছ করার জন্য। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন নিয়ে যদি প্রশ্ন না উঠে থাকে, তাহলে দলীয় সরকারের অধীনে দেশে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে কেন? আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন হয়ে আসছে। তাদের এখানে এ নিয়ে হইচই হয় না কেন? সহজ উত্তর- ব্যবস্থা ভালো হলে এবং সংবিধানের ধারা অনুসৃত হলে পথ মসৃণই থাকবে।


গণতন্ত্রের স্বার্থে, সুস্থ ধারার রাজনীতির প্রয়োজনে সর্বাগ্রে স্বচ্ছ, প্রশ্নমুক্ত, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেই হবে। পরস্পরকে উদার মনোভাব নিয়ে আলোচনায় বসে প্রতিহিংসার রাজনীতির অবসান ঘটাতে হবে। সবাইকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করার চেষ্টা চালানোর যে কথা বলেছেন; এ জন্য আগে দরকার সরকারি দল বা জোটের ঐকান্তিক সদিচ্ছা। ইভিএম পদ্ধতিতেই নির্বাচন হবে, নাকি ব্যালট পেপারের মাধ্যমে; তাও ওই আলোচনাতেই চূড়ান্ত করা সম্ভব। তবে এ কথা সত্য, ইভিএম পদ্ধতি আমাদের বাস্তবতায় আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এ জন্য যে প্রযুক্তিজ্ঞানে দক্ষ জনবল দরকার তা তো নেই-ই; প্রাতিষ্ঠানিক আরও নানা দিকেই এ ব্যাপারে ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। তাই এ পথে পা না বাড়িয়ে রাজনৈতিক জটিলতা আর না বাড়ানোই শ্রেয়।


ইভিএম বিতর্ক যেমন নতুন নয়; তেমনি অস্বচ্ছ নির্বাচন নিয়ে বিতর্কও পুরোনো। নির্বাচন যদি অংশগ্রহণমূলক এবং প্রশ্নমুক্ত না হয়, তাহলে যত আধুনিক পদ্ধতিই গ্রহণ করা হোক না কেন; রাজনৈতিক জটিলতা বাড়বে বৈ কমবে না। আমাদের বিভাজিত রাজনীতি জাতীয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তো বটেই; একই সঙ্গে জাতীয় সংহতি ও অগ্রগতির ক্ষেত্রেও বড় প্রতিবন্ধক হয়ে আছে। রাজনীতির মাঠ সমতল করে, অধিকাংশ ভোটারের ক্ষেত্রে বৈষম্যের নিরসন ঘটিয়ে জনমনে সৃষ্ট আস্থাহীনতা দূর করে দেশ-জাতির উন্নয়নে সবাইকে শরিক করে এগোতে পারলে এর আরও বড় সুফলভোগী হবো আমরা।


৫০ বছরের বাংলাদেশ আজ অনেক ক্ষেত্রেই সমৃদ্ধ। আমাদের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে বিপুল আত্মত্যাগ আর অনেক কিছু হারিয়ে। যে প্রত্যয়ে প্রত্যয়ী হয়ে আমরা দেশ স্বাধীন করেছিলাম; এত উন্নয়ন সত্ত্বেও আজ সেই

প্রত্যয়ের অনেকটাই বিপরীতে রয়েছি নানা দিকে। আমাদের অন্যতম সংকট হচ্ছে আস্থার সংকট। মনে রাখতে হবে- সরকারের কর্তব্য আগে সব রাজনৈতিক দল ও ভোটারের আস্থা অর্জনে যাবতীয় বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করা।


এম হাফিজ উদ্দিন খান :সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা; সভাপতি, সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com