প্রবৃদ্ধির হিসাব প্রশ্নবিদ্ধ

প্রকাশ: ১১ মে ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ১১ মে ২২ । ০২:২৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

শেখ আবদুল্লাহ

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) চলতি অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও
মাথাপিছু আয়ের যে সাময়িক হিসাব প্রকাশ করেছে, তা বাস্তবতার সঙ্গে
সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন,
জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব বিস্তারকারী যেসব সূচক বিবেচনা করা হয়ে থাকে,
সেগুলোর সঙ্গে বিবিএসের প্রাক্কলন অতিরঞ্জিত মনে হচ্ছে। ফলে বিবিএসের
প্রাক্কলন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা। গতকাল মঙ্গলবার বিবিএস চলতি ২০২১-২২
অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি এবং মাথাপিছু আয়ের সাময়িক
হিসাব প্রকাশ করেছে। এতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ। আর
অর্থবছর শেষে দেশের মানুষের গড় মাথাপিছু আয় দাঁড়াবে ২ হাজার ৮২৪ মার্কিন
ডলার। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম এ বিষয়ে
সমকালকে বলেন, সরকার বলছে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ হবে। তবে
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রক্ষেপণ বিষয়ে যেসব
প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, সে অনুযায়ী এ বছর ৬ দশমিক ২০ থেকে ৬ দশমিক ৪০
শতাংশ হতে পারে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে বিবিএসের প্রাক্কলনে
বড় ফারাক দেখা যাচ্ছে। জিডিপি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ইতিবাচক দিক হলো, রপ্তানি
আয় বেড়েছে। কিন্তু বিনিয়োগ পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়।

বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিও তেমন বাড়েনি। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির
(এডিপি) বাস্তবায়নও গতি পায়নি। এমন পরিস্থিতিতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কীভাবে ৭
দশমিক ২৫ শতাংশ হতে পারে- তা বোধগম্য নয়। বিবিএস জিডিপির প্রবৃদ্ধি ও
মাথাপিছু আয়ের যে প্রাক্কলন প্রকাশ করেছে, তা প্রশ্নবিদ্ধ। আন্তর্জাতিক
মহলে এর স্বীকৃতি নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। জিডিপির আকার বাড়িয়ে দেখানো হচ্ছে- এমন
ইঙ্গিত করে এ অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, সরকার যদি সংশোধন করে, তাহলে মাথাপিছু
আয়ের যে পরিসংখ্যান দিচ্ছে, তাও কমে যাবে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সমকালকে বলেন, অস্বাভাবিক উচ্চ প্রবৃদ্ধির এই
সাময়িক হিসাব জিডিপির সঙ্গে সম্পর্কিত ও প্রতিনিধিত্বশীল অন্যান্য সূচকের
সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে
উত্তরণের পর্যায়ে রয়েছে এবং এ জন্য আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহায়তা পাওয়ার
চেষ্টা করছে, তখন এ ধরনের তথ্য পরিসংখ্যান ও নীতির ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব
ফেলতে পারে। তিনি ২০২১-২২ অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলনের
পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতি এবং এ-সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করার দাবি জানিয়েছেন।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন সমকালকে
বলেন, বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে অর্থ বিভাগ। চলতি
অর্থবছরের বাজেটে অর্থ বিভাগ ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা
নির্ধারণ করেছে। আর বিবিএসের সাময়িক হিসাবে বলা হয়েছে, প্রবৃদ্ধি হবে ৭
দশমিক ২৫ শতাংশ। দুটি এত কাছাকাছি যে দেখলে ভ্রু কুঁচকে যায়। কারণ, অর্থ
বিভাগ রাজস্ব সংগ্রহ, সরকারের ব্যয়, সরকারের ঋণ, বাজেট ঘাটতিসহ বিভিন্ন
ক্ষেত্রে বাজেটে প্রাক্কলন করে থাকে। কিন্তু বছর শেষে এসব সূচকে প্রাক্কলন
আর বাস্তবতার ব্যাপক ফারাক থাকে। তাহলে প্রশ্ন আছে, জিডিপির প্রবৃদ্ধির
প্রাক্কলনে অর্থ বিভাগের এত পারদর্শিতা কীভাবে এলো এবং অন্য ক্ষেত্রে
পারদর্শিতা দেখানো যাচ্ছে না কেন। দ্বিতীয়ত, চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধিতেও
উৎপাদন খাত চলকের ভূমিকায় রয়েছে। বড়, মাঝারি ও ক্ষুদ্র সব পর্যায়ের উৎপাদন
খাতে দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি হয়েছে, যা গত বছরও ছিল। তাহলে তো কোনো সমস্যা
থাকার কথা নয়। কিন্তু এসব খাতের লোকজন প্রাক-বাজেট আলোচনায় বলেছেন,
অর্থনীতির পুনরুদ্ধার হচ্ছে; কিন্তু এখনও স্বাভাবিক পর্যায়ে আসেনি। তাদের
উৎপাদন কার্যক্রমও স্বাভাবিক হয়নি। স্বাভাবিক হওয়ার জন্য উৎপাদকরা সরকারের
প্রণোদনা অব্যাহত রাখার দাবি জানিয়েছেন। এ ছাড়া চলতি বছর বিদ্যুৎ ও গ্যাস
খাতে প্রবৃদ্ধি কমেছে বলে উল্লেখ করেছে বিবিএস, যা উৎপাদনের সঙ্গে
সম্পৃক্ত। অন্যদিকে বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে লোহা, সুতা, সারসহ বিভিন্ন
পণ্যের সরবরাহ কমেছে এবং দাম বেড়েছে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে
বিদ্যুৎ, গ্যাস খাতে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া, বৈশ্বিক পরিস্থিতির তথ্য আর
উৎপাদন খাতের দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান খাপ খায় না। ফলে সামগ্রিক
প্রবৃদ্ধির অঙ্ক মেলাতে গিয়েও প্রশ্ন আসে।



© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com