জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারে এবারও বিতর্ক

প্রকাশ: ১১ মে ২২ । ১৩:০০ | আপডেট: ১১ মে ২২ । ১৩:০০

ক্রীড়া প্রতিবেদক

ছবি: ফাইল

ক্রীড়াঙ্গনে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ক্রীড়াবিদদের জাতীয় পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা এসেছিল বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের মুখ থেকে। স্বজনপ্রীতি বা রাজনীতির বিবেচনায় নয়, শুধু যারা খেলার সঙ্গে জড়িত, তারাই ক্রীড়াঙ্গনের সর্বোচ্চ এ সম্মাননা পাবেন বলে সেই সময় বলেছিলেন বঙ্গবন্ধু।

কিন্তু শুরু থেকেই পুরস্কার ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আবার পুরস্কার দেওয়ার ধারাবাহিকতাও ছিল না। অবশেষে খুলছে জট। আজ ওসমানী মিলনায়তনে ২০১৩ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত আট বছরে ৮৫ জন ক্রীড়া ব্যক্তিত্বের হাতে তুলে দেওয়া হবে পুরস্কার। অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। 

কিন্তু গতকাল পুরস্কারের জন্য মনোনীতদের যে তালিকা প্রকাশ করেছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল এমপি, তাতে দেখা গেছে ক্রীড়াঙ্গনে অবদান রাখা অনেকের সঙ্গে আছে অখ্যাতরাও। মিথ্যা জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে ক্রীড়া পুরস্কারে নিজেদের নাম যুক্ত করেছেন কয়েকজন। তাই বরাবররের মতো এবারও বিতর্ক ক্রীড়া পুরস্কার নিয়ে।

বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন

২০১৩ সাল থেকে ২০২০ সালের জন্য ৭৮টি আবেদনপত্রসহ মোট ৩৪০ জন ক্রীড়াবিদ/ক্রীড়া সংগঠক জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার জন্য আবেদন করেন। সেখান থেকে জাতীয় বাছাই কমিটি চূড়ান্তভাবে ৮৫ জনকে পুরস্কারের জন্য মনোনীত করে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে পুরস্কারের স্বীকৃতি কেন আবেদন করে নিতে হবে। 

তদবির করে অনেক অখ্যাত আবেদনের মাধ্যমে নিজেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন পুরস্কারের তালিকায়। আবার খেলাধুলায় অবদান রাখা অনেক কীর্তিমান আত্মসম্মানের কারণে আবেদন করেননি। দেশের জার্সিতে অবদান আছে এমন অনেকের নাম যেমন নেই, তেমনি করে কিছু কিছু নাম উঠেছে, যারা একটি বারের জন্যও বাংলাদেশের জার্সি গায়ে জড়াননি। 

স্টেডিয়ামের কোন গেট দিয়ে প্রবেশ করবে আর কোন গেট দিয়ে বের হবে, সেটাও জানেন না এমন অনেকে কিনা সংগঠক হিসেবে পুরস্কার পাচ্ছেন প্রশ্নবিদ্ধ বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে। কারণ তারা তো তদবির করে পুরস্কার নিচ্ছেন।

আসলে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারের জন্য আবেদনগুলো আসে সরাসরি ফেডারেশন থেকে। নিজ নিজ ফেডারেশনগুলোই ক্রীড়া ক্ষেত্রে অবদানের জন্য খেলোয়াড় এবং সংগঠকদের নাম জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে পাঠায়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে ফেডারেশনগুলোও কিছু অযোগ্য ব্যক্তির নাম দিয়েছে। তবে এটা দেখার দায়িত্ব তো ক্রীড়া পরিষদের। আর কেনই বা আবেদন করে ক্রীড়া পুরস্কার নিতে হবে। এমন প্রশ্নও উঠেছে যে, ক্রীড়া পুরস্কারের জন্য ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর কাছে তদবির গেছে এবং তিনি নাকি বলে দিয়েছেন করে দিতে।

মিথ্যা তথ্যের অভিযোগ

২০১৫ সালের তালিকায় ক্রীড়া পুরস্কারপ্রাপ্ত একটি নাম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। খেলোয়াড় ক্যাটাগরিতে জেসমিন আক্তার ছিলেন ভারোত্তোলন, কারাতে ও তায়কোয়ান্দো খেলোয়াড়। অথচ ক্রীড়াঙ্গনে তার এমন কোনো অর্জন নেই যে, তিনি জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারের জন্য যোগ্য। ফেডারেশনগুলো থেকে ক্রীড়া পরিষদে তার যে তথ্য দেওয়া হয়েছে তাতে উল্লেখ করা হয়েছে তিনি ২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত জাতীয় ভারোত্তোলনে স্বর্ণ জিতেছিলেন।

জুডোতে জিতেছিলেন টানা ছয়টি স্বর্ণ। আর তায়কোয়ান্দোতে তিনটি স্বর্ণ। এমনি ২০১০ সালে জাতীয় কুস্তিতে ব্রোঞ্জও জিতেছেন বলে তার বায়োডাটায় উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু তথ্যগুলো যাচাই করে দেখা গেছে, ২০০৮ এবং ২০১০ সালে জাতীয় ভারোত্তোলন প্রতিযোগিতা হয়নি। আর এসএ গেমসে কখনও কোনো পদক জেতেননি তিনি। 

জেসমিন আক্তারের মতো জালিয়াতির অভিযোগ ২০১৬ সালে পুরস্কার পাচ্ছেন ভারোত্তোলক কাজল দত্ত। উনি নিজেই স্বীকার করেছেন, দেশের সঙ্গে প্রতারণা এবং মিথ্যা তথ্য দিয়ে পুরস্কার পাচ্ছেন। জালিয়াতি করে বায়োডাটা জমা দিয়েছেন। যদিও এ বিষয়টি সামনে আনলে জাহিদ আহসান রাসেল বলেছেন, এটা তাদের জানা ছিল না। এ ধরনের কিছু ঘটে থাকলে তারা ব্যবস্থা নেবেন।

সংগঠকদের নামের তালিকা দীর্ঘ

আট বছরে ৪৬ জন ক্রীড়াবিদদের সঙ্গে ৩৯ জন ক্রীড়া সংগঠক পাচ্ছেন জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার। অথচ অতীতের ধারাবাহিকতায় আট বছরে ১৬ জন সংগঠকের ক্রীড়া পুরস্কার পাওয়ার কথা। কিন্তু তদবির করে অনেকেই ক্রীড়া পুরস্কার পাওয়ায় এই সংখ্যাটা এখন দ্বিগুণেরও বেশি। যদিও ক্রীড়া পুরস্কারকে অনেকেই তদবিরের পুরস্কার হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আর এবারের পুরস্কারের তালিকায় দাবার গ্র্যান্ডমাস্টার আব্দুল্লাহ আল রাকিব ছাড়া বর্তমান কোনো খেলোয়াড় নেই। অতীতে সাকিব আল হাসানসহ বেশ কয়েকজন বর্তমান খেলোয়াড়কে জাতীয় পুরস্কার দেওয়ায় সমালোচনা হয়েছে।

মন্ত্রীর ব্যাখ্যা

মঙ্গলবার জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে প্রায় ৪০ মিনিটের সংবাদ সম্মেলনে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলকে দিতে হয়েছে পুরস্কারের তালিকা নিয়ে নানা প্রশ্নের উত্তর। বাছাই প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে তথ্য জালিয়াতি আরও অনেক বিষয় নিয়ে নিজের যুক্তি তুলে ধরেন রাসেল।

বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে ক্রীড়ামন্ত্রীর ব্যাখ্যা, 'জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার দেওয়ার জন্য তিনটি কমিটি আছে। যখন কোনো আবেদন আসে সেটি যাচাই-বাছাই করে আরেকটি কমিটির হাতে দেওয়া হয়। এরপর সচিব সাহেবের নেতৃত্বে আরেকটি কমিটি হয়। সেখান থেকে যাচাই করে জাতীয় কমিটিতে পাঠানো হয়। তো তিনবার যাচাই-বাছাই করে আমাদের কাছে আসে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে আমরা নিজেদের মতো করতে পারি।

কিন্তু এই ক্রীড়া পুরস্কারটি হচ্ছে একদম ক্যাবিনেট স্বীকৃতি পুরস্কার। যার কারণে সেখান থেকে যে তালিকা দেওয়া হয়, সেভাবেই আমাদের করতে হয়। চূড়ান্ত অনুমোদন আমরা করতে পারি না, এটা করে ক্যাবিনেট। আমরা কোনো খেলোয়াড়কে পুরস্কৃত করার জন্য নোটিশ জারি করি, তখন কিন্তু আমরা ফেডারেশনের কাছে চাই যে আপনাদের ফেডারেশনগুলোর মধ্যে কে কে যোগ্য খেলোয়াড়, সংগঠক আছেন। সেক্ষেত্রে হয়তো ফেডারেশনগুলো যোগ্য নেতৃত্ব বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তারাও দু-একটি ভুল করতে পারে।’

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com