প্রচ্ছদ

লেখক যখন লুকিয়ে থাকেন

প্রকাশ: ১৩ মে ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ১৩ মে ২২ । ১২:১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইকরাম কবীর

১৯৮০ সালে, নবম শ্রেণিতে, কবি রফিক নওশাদ বনফুলের গল্প 'মানুষের মন' পড়াতে এসে যখন জানালেন লেখকের আসল নাম বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়, তখন এক অদ্ভুত মানসিক শিহরণের ঢেউ উঠেছিল মনের ভেতর। আমরা অনেকেই ততদিনে জীবনের প্রথম কবিতাটি লিখে ফেলেছি। একজন কবি-শিক্ষকের প্রভাবে সেই কৈশোরেই আমাদের অনেকের মধ্যে কবি হবার স্পৃহা জেগেছিল।

বনফুলের গল্প বলতে গিয়ে তিনি আমাদের অনেক লেখকের লুকিয়ে থাকার গল্প শুনিয়েছিলেন। তার পরপরই খেয়াল করলাম যে ঢাকা থেকে প্রকাশিত কয়েকটি পত্রিকায় ছদ্মনামে কলাম ছাপা হয়। আগেও চোখে পড়েছে। তবে তা নিয়ে আমাদের মনে তখনও কোনো প্রশ্ন জাগেনি। বনফুলের লেখা পড়তে গিয়েই আমরা পত্রিকার কলাম লেখকদের নামের মধ্যে নতুন রোমাঞ্চ খুঁজে পেলাম। কলাম পড়তে শুরু করে দিয়েছিলাম। কতদূর বুঝতে পারতাম, তা এখন মনে নেই। তবে সেই যে শুরু করেছিলাম তা এখনও চলছে। যেই লেখক ছদ্মবেশে লেখেন তার লেখার প্রতি এখনও ঝোঁক বেশি।

রফিক নওশাদ স্যার নিজেও ছদ্মনামে লিখতেন। তার আসল নাম ছিল মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম এবং ডাকনাম 'নওশাদ'। নিজের ডাকনামটি তার অসম্ভব ভাল লাগত। তাই 'রফিক'-এর সঙ্গে সেটি জুড়ে দিয়েছিলেন।

সেই থেকেই আমাদের বাংলা সাহিত্যের অনেক বড় বড় লেখকের ছদ্মনামের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল। সেই কিশোর কবিদের একজন 'চিরন্তন' এবং আরেকজন 'বৃষ্টিস্নাত' নামে লেখার চেষ্টা করতে থাকলেন।

লেখকদের ছদ্মবেশ নেওয়ার রেওয়াজ ওই কিশোর কবিদের মাঝে এক বিপুল আগ্রহের বিষয় ছিল। সত্যিই বিষয়টি নিয়ে যদি গবেষণা করা যেত তাহলে বিভিন্ন যুগে সাহিত্যচর্চার সামাজিক প্রেক্ষাপটের আরেকটি দিক উন্মোচিত হতে পারত। বাংলায় এই বিষয় নিয়ে গভীর কোনো গবেষণা হয়েছে কিনা জানা নেই, তবে বিশ্বব্যাপী নানা দেশে তা হয়েছে।

কৈশোরে রবিঠাকুর ভানুসিংহ ঠাকুর নামে কয়েকটি কবিতা লিখেছিলেন। আমাদের বিদ্রোহী কবি নজরুল মাঝে মাঝে নিজেকে লুকিয়েছেন ধূমকেতু নামের আড়ালে। জসীম উদ্‌দীন তুজাম্বর আলী নামেও লিখেছেন। আমরা যাকে শংকর নামে চিনি, তার আসল নাম মণিশংকর মুখোপাধ্যায়। বঙ্কিমের ছদ্মনাম ছিল কমলাকান্ত। শরৎবাবু ছিলেন অনীলাদেবী, সৈয়দ মুজতবা আলীও লিখেছেন ওমর খৈয়াম নামের আড়ালে।

ভলতেয়ারকে আমরা সবচেয়ে বিখ্যাত নাম-ছদ্মবেশী হিসেবে চিনি। তিনি ফরাসি এবং তার নাম ফ্রঁসোয়া মারি আরুয়ে। ইংরেজ ব্যঙ্গসাহিত্যিক হেক্টর হিউজ মনরো লিখেছেন সাকি নামের আড়ালে। আমরা ও'হেনরি বলে যাকে চিনি, তিনি তো বিশ্বখ্যাত সাহিত্যিক উইলিয়াম সিডনি পোর্টার। সি এস লুইসের সঙ্গে আমাদের পরিচয় প্রথমত তার 'ক্রনিকলস অব নার্নিয়া' পড়ে। তবে তার প্রথম লেখা 'স্পিরিটস ইন বন্ডেইজ' প্রকাশ হয়েছিল ১৯১৯ সালে ক্লাইভ হ্যামিল্টন ছদ্মনামে। তিনি তখন কুড়ি বছরের যুবক, সদ্য ফিরেছেন প্রথম মহাযুদ্ধ থেকে। আগাথা ক্রিস্টি ছয়টি রোমান্টিক উপন্যাস লিখেছেন ম্যারি ওয়েস্টম্যাকট ছদ্মনামে।

একবার আইজ্যাক আসিমভকে বলা হয়েছিল তরুণদের জন্য একটা উপন্যাস লিখতে, যা নিয়ে পরে একটি টেলিভিশন সিরিয়াল তৈরি হবে। সিরিয়ালটি নিয়ে তিনি একটু ভয়ে ছিলেন; মনে হয়েছিল তা কিছু হবে না এবং সে কারণেই 'লাকি স্টার' তিনি পল ফ্রেঞ্চ নামে প্রকাশ করেছিলেন। 'হ্যারি পটার' খ্যাত জে কে রাউলিং তার 'দ্য কাক্কুজ কলিং'-এ রবার্ট গলব্রেইথ নামের আড়াকে লুকিয়ে থেকে স্বাধীনতার স্বাদ অনুভব করেছিলেন বলে তিনি বলেছেন। বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনকে একটু দুষ্টামি করতে হয়েছিল। বেঞ্জামিনের ভাই জেইমস ফ্র্যাঙ্কলিন 'কুরান্ট' নামে একটি পত্রিকা চালাতেন। যুবক বেঞ্জামিন সেখানে অনেকবার লেখা দাখিল করেছিলেন, কিন্তু একটিও প্রকাশ হয়নি। তবে একই লেখা তিনি যখন মিসেস সাইলন্স ডু-গুড ছদ্মনামে লিখলেন, তখন সবক'টিই সেই পত্রিকায় স্থান অর্জন করে নিল।

স্টিফেন কিংয়ের প্রকাশক তার বই বছরে একটিই ছাপতে চাইতেন। কিন্তু তাতে কিংয়ের মন ভরছিল না। তিনি লেখা শুরু করলেন রিচার্ড বাকম্যান নামে। 'রেইজ', 'দ্য লং ওয়াক', রোডওয়ার্ক', 'দ্য রানিংম্যান', 'থিনার', 'দ্য রেগুলেটরস' এবং 'ব্লেইজ'- এগুলো সব রিচার্ড বাকম্যান ছদ্মনামে প্রকাশ হয়েছিল।

জানা যায়, নিজের নাম আড়াল করে লেখার প্রচলন হয় অষ্টাদশ শতাব্দীতে। খবরের কাগজ, পত্রিকা এবং অন্যান্য সাময়িকী প্রকাশের সঙ্গেই ছদ্মনামের ব্যবহার এসেছে। নাম লুকোনোর প্রাথমিক কারণ ছিল মতামত প্রকাশের জন্য রাজনৈতিক এবং রাষ্ট্রের রোষ থেকে নিজেকে বাঁচানো।

লেখকরা অবশ্য নিজেদের গুপ্ত করে রাখতে চান অনেক কারণেই। একজন লেখক খুব স্বাভাবিকভাবেই সামাজিক খ্যাতি লাভ করেন এবং নিজের নামে লিখলেই তার জন্য উপকারী বলে মনে হতে পারে। তবে অনেকে মনে করেছেন ছদ্মবেশে নিলে পাঠক এক ধরনের রহস্যের স্বাদ পান, যা তার পাঠ-আনন্দ অনেকখানি বাড়িয়ে দেয়।

নিজের নাম লুকিয়ে অন্য আরেক নামে লিখলে সাহিত্যে এক ধারা থেকে অন্য ধারায় চলে যেতে বেশ সুবিধে হয়। অনেক রকম স্টাইল নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করা যায়। ধরুন কোনো লেখক গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক- সবই লিখতে চান। তিনি এই চার ধারার জন্য চারটি নাম আবিস্কার করতে পারেন এবং এমন উদাহরণ বিশ্বসাহিত্যে আছে। অনুমান করতে পারি, যারা এমনটি করেছেন তারা নিজেরাও এই রহস্য তৈরি করে বেশ আনন্দ পেতেন। কোনো এক ধারা নিয়ে লেখক নিজেই যদি সন্তুষ্ট না হতে পারেন, তাহলে দিব্বি নতুন একটি কল্পিত নামের আড়ালে গিয়ে অন্য একটি ধারা চেষ্টা করে যেতে পারেন। এভাবেই একজন লেখক বেশ কয়েকটি ব্র্যান্ড তৈরি করতে পারেন বলেই মনে হয়। কেউ কেউ এ কাজ করেছেন একটি নির্দিষ্ট পাঠকগোষ্ঠীকে মাথায় রেখে। অনেক লেখককে দেখা গেছে ছদ্মনামে শিশুসাহিত্য রচনা করতে। যারা আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা লিখেছেন, তাদের মধ্যে গুপ্ত থাকার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। অনেকে মনে করেন লুকিয়ে থাকলে সাহিত্য অঙ্গনে স্বীকৃতি মেলে আরও বেশি।

ছদ্মনামে লিখলে অল্প সময়ে অনেক বেশি সংখ্যক বই লেখা যায় বলেই অনেকে অন্য আরেক নাম আবিস্কার করেছেন। একটু আগে স্টিফেন কিংয়ের কথা যেমনটা বলছিলাম। তিনি অনেক বেশি সংখ্যক পুস্তক প্রকাশ করতে চাইতেন, তাই ছদ্মনাম নিয়েছিলেন। এ কথা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি লেখন রবার্ট হেইনলিনের ক্ষেত্রেও খাটে।

অনেক সময় পাঠকদের এবং সমাজের চাপ অথবা লজ্জা এড়াতে লুকিয়ে থাকা বেশ ভালো কাজ করে। যেমন জে কে রাউলিং যখন প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য গল্প লিখেছিলেন, তখন তিনি সামাজিক চাপ এড়াতে ছদ্মবেশ নিয়েছিলেন। তিনি চাননি এই গল্পগুলোতে তার নিজের নামের সংশ্নিষ্টতা থাকুক। কেউ যেন না জানে তিনিই এগুলো লিখছেন। তবে তিনি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য গল্প লিখতে চেয়েছেন, তার ইচ্ছে হয়েছিল, তার কাছে এই গল্প লিখতে ভালো লাগছিল এবং অন্য নামে আড়ালে লুকিয়ে তিনি সেই স্বাধীনতা ভোগ করেছেন। অনেক বিখ্যাত লেখক আবার জনমানুষের উপকার হবে কিন্তু রাষ্ট্র ক্ষেপে যেতে পারে, এমন লেখা লিখতে গিয়ে ছদ্মবেশ নিয়েছেন।

পাবলো নেরুদার বাবা তার ছেলের লেখকসত্তাকে মেনে নিতে পারেননি। নেরুদার আসল নাম ছিল রিকার্ডো এলিয়েসের নেফতালি রিয়েস বাসোয়ালতো। অনেক লম্বা। বাবার কাছ থেকে লেখা লুকিয়ে রাখতেই তিনি পাবলো নেরুদা নাম নিয়েছিলেন। তাছাড়া আসল নামের উচ্চারণের সমস্যা তো ছিলই। থিওডর গিজেলের 'দ্য ক্যাট ইন দ্য হ্যাট' অনেকেই পড়েছেন। গিজেল ছিলেন ডারমাউথের বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কৌতুক পত্রিকার প্রধান সম্পাদক। একবার মদ্যপানের দায়ে তাকে সম্পাদকের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েও তিনি ড. সিউস নাম নিয়ে তার লেখা চালিয়ে গেছেন।

ডিজিটাল মাধ্যম নামক মহাসমুদ্রে আমরা হাজার হাজার লেখকের নিজের নাম আড়াল করে লিখতে দেখেছি এবং ডিজিটাল বাতায়নগুলোতে যখন ব্লগ লেখা শুরু হলো, বিশ্বব্যাপী লেখকরা মন উজাড় করে লেখা শুরু করলেন। নিজের নামে লিখতে গিয়ে যখন বিপদ এলো, তারা বুঝে গেলেন কী করতে হবে। শত শত লেখক ছদ্মবেশে লেখা শুরু করলেন। আজ পর্যন্ত অগণিত লেখক নিজেকে লুকিয়ে রেখে ব্লগ লিখে চলেছেন বিভিন্ন অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে। সামাজিক মাধ্যম এখন লেখকদের ভাবনা প্রকাশের একটি অন্যতম বিচরণ ক্ষেত্র। সেখানে লিখতে গিয়ে লেখকরা তাদের লেখার প্রতি কতটা সুবিচার করতে পারছেন তা অন্য আলোচনা। কিন্তু তারা লিখছেন। প্রতিদিন কত শত লেখার যে জন্ম হচ্ছে, এই বাতায়নগুলোতে তা কেউ গুনে রাখছে না। মনেও রাখছে না। তবে এখানে লেখকদের একটি বড় অংশ লিখছেন নিজেকে লোকচক্ষুর আড়ালে রেখে। নিজের পরিচয় প্রকাশ হোক তা তারা চাইছেন না। সামাজিক মাধ্যমে মানুষ মানুষকে চুপিসারে অনুসরণ করে। মাঝে মাঝে কোনো একটি বিষয় নিয়ে লক্ষজন একজনকে আক্রমণ করছেন, তাড়িয়ে বেড়াচ্ছেন। লেখকরা এই বিষয়গুলো বোঝেন এবং সে কারণেই হয়তো নিজের পরিচয় গোপন রাখতে চান।

একটা সময় ছিল যখন নারী লেখকদের পুরুষ লেখকদের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হতো। সত্যি বলতে কি, নারীরা যে লিখতে পারেন তা-ই স্বীকার করা হতো না। তাই আমরা দেখেছি নারী লেখকরা ছদ্মবেশে লিখেছেন। পুরুষের নাম গ্রহণ করে লেখা প্রকাশ করেছেন। ইংল্যান্ডের ব্রন্টিদের (শার্লট, এমিলি এবং অ্যান) কথাই ধরুন না। তারা লিখেছেন কারের বেল, এলিস বেল এবং অ্যাকটন বেল নামে।

শার্লট ব্রন্টি কবি রবার্ট সঅদির কাছে একটি কবিতা পাঠিয়েছিলেন। উত্তরে রবার্ট সঅদি বলেছিলেন, 'সাহিত্য-রচনা মেয়েদের কম্ম নয়।' নারী লেখকদের বিরুদ্ধে এই মানসিক দেয়াল যুগে যুগেই ছিল। এ যুগেও যদি কোনো নারী লেখক সাহসী কিছু লিখে ফেলেন, সমাজ তা কেমন করে গ্রহণ করে তা আমরা জানি এবং দেখেছি।

লেখক-সাংবাদিক ক্যাথারিন নিকলসন একবার পঞ্চাশজন এজেন্টের কাছে তার একটি বইয়ের কিছু অংশ ই-মেইল করেছিলেন। শুধু দু'জন তার কাছে পুরো পাণ্ডুলিপি চেয়ে পাঠিয়েছিলেন। তবে তিনি যখন জর্জ নাম ব্যবহার করে ওই একই লেখা আবার সেই পঞ্চাশজনের কাছে পাঠালেন, সেবার সতেরোজন তার কাছে পুরো লেখা চেয়ে পাঠিয়েছিলেন। পশ্চিমা বিশ্বে নারী লেখকদের প্রতি এমন আচরণকে প্রকাশকদের 'সেক্সিজম' বলে অভিহিত করা হয়। যদিও এখনও অনেক নারী লেখক ছদ্মনামে লেখেন, তবে ধীরে ধীরে নারীদের লুকিয়ে থাকার প্রচলন এখন কমে এসেছে।

আমেরিকান লেখক নোরা রবার্টসের উদ্দেশ্য আবার ভিন্ন। নোরা রবার্টস নামে লিখলে যারা তার লেখা পড়বেন না, সেই পাঠকদের জন্য তিনি জে ডি রব নামটি ব্যবহার করেন। তিনি আরও বেশি পাঠক চান। এমনি করেই অনেক নারী লেখক পুরুষের নামে লিখেছেন, মূলত পুরুষ পাঠকদেরই আকর্ষণ করার জন্য। তারা মনে করেন পুরুষ পাঠকরা পুরুষ লেখকদের লেখা পড়ে স্বস্তি পান। এমন ব্যাপার বেশি ঘটে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি লেখার ক্ষেত্রে। নারীরা যে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি লিখতে পারেন তা পুরুষরা এখনও বিশ্বাস করেন না। এমনও দেখা গেছে যে নারী লেখকরা নামের একাংশে পুরুষ এবং আরেক অংশে নারীর নাম ব্যবহার করে কল্পকাহিনি লিখেছেন।

উনিশ শতকে ম্যারি অ্যান ইভান্স লিখেছিলেন জর্জ এলিয়ট নামের আড়ালে। তিনি 'অ্যাডাম বিড' লিখে বিখ্যাত হয়েছিলেন। তারপর তার 'মিডলমার্চ' বইটি মনস্তাত্ত্বিক গভীরতার জন্য শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পঠিত হচ্ছে।

এক নামে আবার দু'জন বা তারও বেশি লেখক থাকতে পারে। বাংলায় অগ্রজ একজন কবির নাম আবুল হোসেন হওয়ায় অনুজ একজন কবি কেমন করে আবুল হোসেন থেকে আবুল হাসান হয়ে গেলেন তা আমরা জানি। একজন বিখ্যাত সৈয়দ শামসুল হক বা শামসুর রাহমান থাকলে অন্য কেউ যে এই একই নামে লিখবেন তা আমরা কেউই আশা করি না।

আইনি জটিলতা থেকে দূরে থাকার জন্য অনেক লেখককে ছদ্মনাম ব্যবহার করতে দেখা গেছে। এই লেখকরা রাষ্ট্র বা সমাজের প্রথা আক্রমণ করে লেখেন এবং তারপর তাদের বিরুদ্ধে মামলা হলে তারা যেন পার পেতে পারেন সেই চিন্তা থেকেই লুকোনোর চেষ্টা। সাধারণত লেখকের বিরুদ্ধে মামলা হয় মানহানির এবং রাষ্ট্রবিরোধিতার। তবে বিতর্কিত কিছু লেখার পর নামের আড়ালে লুকিয়ে থাকলে কি কেউ মামলার হাত থেকে রেহাই পান? গুপ্ত নামে লিখে জনমানুষের কাছ থেকে লুকিয়ে থাকা যায় কিন্তু আইনের কাছ থেকে নয়। প্রকাশকের কাছ থেকে সহজেই আসল লেখককে খুঁজে বের করা যায়। কোনো বিপদে পড়লে, প্রকাশক যে লেখকের নাম প্রকাশ করে দেবেন তা লেখকের সঙ্গে তাদের সম্মতিপত্রেই লেখা থাকে।

কবি রফিক নওশাদ আজ আমাদের মাঝে থাকলে এই বর্ণনা আরও বেশি পাঠযোগ্য হয়ে উঠত। তিনি আরও ভালো লিখতে পারতেন। লেখকের লুকিয়ে থাকা বা ছদ্মবেশে লেখার সার্থকতা নিয়ে তিনি কী বলতে পারতেন তা অনুমান করার চেষ্টা করা যায়। নিজেকে আড়াল করে একজন লেখক কতটুকু সামাজিক সার্থকতা বা পাঠক জনপ্রিয়তা পেতেন তার চেয়ে বড় বিষয় তিনি লিখে নিজে কতটা তৃপ্তি পান। দিনের শেষে বলতে পারি, লেখা এবং নিজের ভাবনা প্রকাশের তাড়না আত্মীয়তাসূত্রে আবদ্ধ। তাড়না বোধ না করলে মানুষ লেখে না- তা নিজের নামেই হোক আর ছদ্মবেশেই হোক। তাড়না শিল্পের জয় হোক।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com