দুই মাস ধরে বাড়ছে আটা-ময়দার দাম

প্রকাশ: ১৪ মে ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ১৪ মে ২২ । ০২:০৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

জসিম উদ্দিন বাদল

দফায় দফায় বেড়েছে আটা ও ময়দার দাম। গত এক মাসেই আটার দাম বেড়েছে ৭ থেকে ৮ শতাংশ এবং ময়দায় বেড়েছে ১১ থেকে ২০ শতাংশ। ফলে আটা-ময়দা দিয়ে তৈরি পাউরুটি, বিস্কুট, চানাচুুর, নুডলস জাতীয় খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। আবার কোনো কোনো কোম্পানি দাম না বাড়িয়ে পরিমাণে কমিয়েছে। এতে আগের চেয়ে স্বল্প আয়ের মানুষের খরচ বেড়েছে। ফলে কেউ কেউ ভোগের পরিমাণ কমাতে বাধ্য হচ্ছেন।

একের পর এক পণ্যের দাম বাড়ায় ভোক্তাদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ে গরিব মানুষ। দাম নাগালে রাখতে সরকারের তদারকির পাশাপাশি গরিবদের সহায়তাও করতে হবে।

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর মহাখালী কাঁচাবাজারে বেসরকারি চাকরিজীবী দিদারুল ইসলাম সমকালকে বলেন, আটা-ময়দার দাম অস্বাভাবিকহারে বাড়ছে। বিস্কুট, চানাচুর সবকিছুর দামও বাড়তি। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দিন দিন গরিব মানুষের জীবনও কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

কারওয়ান বাজারে ইয়াকুব আলী নামের একজন ক্রেতা বলেন, গত এক মাসে ময়দার দাম কেজিতে ১০ টাকার মতো বেড়েছে। আটার দামও বাড়তি। সংসারে খরচ বাড়ছেই। কিন্তু আয় তো বাড়ছে না। এ কারণে আগের তুলনায় এখন কম পণ্য কিনতে হচ্ছে।

গতকাল রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা যায়, খুচরা বিক্রেতারা প্যাকেটজাত দুই কেজি আটার দাম রাখছেন ৯০ থেকে ৯৪ টাকা। সেই হিসেবে প্রতি কেজির দাম দাঁড়ায় ৪৫ থেকে ৪৭ টাকা। আর প্রতি কেজি খোলা আটার খুচরা দাম ৪০ থেকে ৪২ টাকা। মাস দেড়েক আগেও দুই কেজির আটার প্যাকেট পাওয়া যেত ৮২ থেকে ৮৫ টাকায়। অন্যদিকে দুই কেজি ওজনের ময়দার প্যাকেটের দাম ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কেজির দাম পড়বে ৬৫ থেকে ৬৭ টাকা। আর খোলা ময়দার কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫৬ থেকে ৬০ টাকায়। এক মাস আগে দুই কেজি ময়দার প্যাকেট কেনা যেত ১১০ থেকে ১২০ টাকায়।

সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যমতে, গত এক বছরে আটার দাম কেজিতে বেড়েছে ৬ থেকে ১৩ টাকা এবং ময়দায় বেড়েছে ১৮ থেকে ২৪ টাকা পর্যন্ত।

প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের দামও বেড়েছে: খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান, গত দুই-আড়াই মাস ধরেই ধাপে ধাপে বেড়েছে আটা-ময়দার দাম। ফলে মানভেদে এখন চাল আর আটা-ময়দার দাম প্রায় সমান। তারা বলছেন, আটা-ময়দার দাম বাড়ার কারণে কোনো কোম্পানিগুলো প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের দাম বাড়িয়েছে, কেউ পরিমাণে কমিয়েছে। অন্যদিকে বেশিরভাগ ব্যবসায়ীরা পরোটার আকার ছোট করে ফেলছেন।

জানা যায়, বিভিন্ন কোম্পানির বিস্কুটের প্যাকেটের দাম ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়েছে। তেজগাঁও রেলওয়ে এলাকার এন আমিন স্টোরের মালিক কামাল হোসেন বলেন, শুধু বিস্কুট নয়, চানাচুর, নুডলসসহ সব খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে। ৩০ টাকা দামের ১৫০ গ্রাম ওজনের বোম্বে সুইটসের ৩০ টাকার চানাচুরের প্যাকেটের দাম ১০ টাকা বাড়িয়ে করা হয়েছে ৪০ টাকা। আধা কেজি ওজনের নুডলসের দাম বেড়েছে ১৫ টাকা। খুচরা ব্যবসায়ীরা ৪৯৬ গ্রাম ওজনের ১৩০ টাকা দামের নুডলস বিক্রি করছেন ১৪৫ টাকায়।

চাহিদা বাড়ছে: চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হওয়ায় গম আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয় বাংলাদেশকে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) তথ্য মতে, সর্বশেষ ২০২০-২১ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ১২ দশমিক ৩৪ লাখ টন গম। কিন্তু খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশে বছরে চাহিদা রয়েছে ৭০ থেকে ৭৫ লাখ টনের। সেই হিসেবে বাকি ৫৮ থেকে ৬৩ লাখ টন গম আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে মাত্র পাঁচ থেকে ছয় লাখ টন সরকারিভাবে আমদানি হয়। বাকিটা আমদানি হয় বেসরকারিভাবে।

গম আমদানিকারক ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারীরা বলছেন, ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে বিশ্বে গমের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। দামও বেড়েছে। এসব কারণে আটা-ময়দা ও প্রক্রিয়াজত খাদ্যের দাম বাড়ছে।

টি কে গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ কালাম সমকালকে বলেন, যুদ্ধের কারণে গম পাওয়াই মুশকিল। ইউক্রেনে বর্তমানে প্রতি টনের দাম পড়ছে ৪৭০ থেকে ৪৮০ ডলার। যা যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ছিল ৩৫০ থেকে ৩৬০ ডলার। কানাডার গমের দাম আরও বেশি ৫০০ থেকে ৫২০ ডলার। অস্ট্রেলিয়ার গম ৪৮০ থেকে ৯০ ডলার। ভারতেও গমের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০০ ডলারে।

আমদানি পরিস্থিতি: খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, গত ২০২০-২১ অর্থবছরে মোট ৫৩ লাখ ৪২ হাজার টন গম আমদানি করা হয়। চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১১ মে পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ৩৪ লাখ ৭ হাজার ৭৯০ টন। বাংলাদেশ যে পরিমাণ গম আমদানি করে তার সিংহভাগই আসে ইউক্রেন ও রাশিয়া থেকে। এ ছাড়া ভারত, কানাডা থেকেও আমদানি হয়। তবে বর্তমানে ইউক্রেন-রাশিয়ার মধ্যে যুদ্ধ চলমান থাকায় দেশ দুটি থেকে আমদানি প্রায় বন্ধ।

উৎপাদন পরিস্থিতি: বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, গত ২০২০-২১ অর্থবছরে গম উৎপাদন হয়েছে ১০ লাখ ৮৫ হাজার টন। চলতি অর্থবছরে এই লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১২ লাখ ২৬ হাজার টন। এ ছাড়া গত অর্থবছরে ভুট্টা উৎপাদন হয়েছে ৬৫ লাখ ৬২ হাজার টন। দেশে প্রতি বছর গমের চাহিদা বাড়ছে ১১ থেকে ১৫ শতাংশ। এর বিপরীতে উৎপাদন বেড়েছে সাড়ে ৩ শতাংশ হারে।

এদিকে সরকারের গুদামেও গমের মজুত কমে আসছে। সর্বশেষ গত ১১ এপ্রিলের হালনাগদ তথ্যানুযায়ী, গমের মোট মজুত আছে এক লাখ ১৮ হাজার টন। মজুত কমে আসায় এপ্রিলের শুরুতে চাল ও গমের বরাদ্দ বাড়াতে খাদ্য অধিদপ্তর চিঠি দিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়কে। অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী জুন সমাপনীতে নিরাপত্তা মজুত হিসেবে সরকারি গুদামে দুই থেকে আড়াই লাখ টন গম মজুত থাকা দরকার। কিন্তু বর্তমানে গম আছে এক লাখ ৪৯ হাজার টন। অর্থাৎ ঘাটতি আছে ৫৩ হাজার টন। এমতাবস্থায় সারাদেশের ওএমএস চালু রাখতে জরুরিভিত্তিতে কমপক্ষে আরও ৫০ হাজার টন গমের বরাদ্দ দিতে অর্থ বিভাগে চিঠি দিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়।

কী উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার: খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বিশ্বে সংকট থাকায় তুলনামূলক কম প্রোটিন সমৃদ্ধ গমও এখন আমদানি করা হচ্ছে। আগে ইউক্রেন, রাশিয়া ও আর্জেন্টিনা থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ প্রোটিন সমৃদ্ধ গম আমদানি হতো। এখন ভারত থেকে সাড়ে ১১ শতাংশ প্রোটিন সমৃদ্ধ গমও আমদানি করা হচ্ছে। প্রতি টনের দাম প্রায় ৪০০ ডলার।

খাদ্য সচিব ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম সমকালকে বলেন, গম আমদানি অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে আড়াই লাখ টন গমের ওয়ার্কঅর্ডার দেওয়া আছে। এর মধ্যে ভারত থেকে আগামী ১৫ বা ১৬ মের মধ্যে দেশে এক লাখ টন গম এসে পৌঁছবে। তাছাড়া গম আমদানিতে কোনো শুল্ক্ক না থাকায় বেসরকারিভাবে সবসময় আমদানি হচ্ছে। তিনি বলেন, এতদিন গম আমদানির জন্য শুধু রাশিয়া ও ইউক্রেনের সঙ্গে চুক্তি ছিল। কিন্তু সম্প্রতি বুলগেরিয়ার সঙ্গে চুক্তি হয়েছে, দেশটি এক লাখ টন গম দিতে ইচ্ছুক। এ ছাড়া বিকল্প দেশ খোঁজা হচ্ছে। যাতে আমদানি কার্যক্রম চলমান থাকে। এ ছাড়া তুলনামূলক কম দামে গম পেতে দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বাড়ানো হচ্ছে। এতদিন ১৩টি প্রতিষ্ঠান ছিল। এখন ১১৩টি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নেওয়ার জন্য আবেদন করেছে।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com