চট্টগ্রাম

বর্ষা আসে শঙ্কা নিয়ে

প্রকাশ: ১৪ মে ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ১৪ মে ২২ । ১৪:০৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

সারোয়ার সুমন ও আবদুল্লাহ আল মামুন, চট্টগ্রাম

সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় বন্দরনগরী চট্টগ্রামের রাস্তাঘাট - ফাইল ফটো

১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে চার প্রকল্প চলমান থাকলেও চট্টগ্রামে আতঙ্ক নিয়েই আসছে বর্ষা। নগরের জলাবদ্ধতা নিরসন করতে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), সিটি করপোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও কোনো কাজে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নেই। সিডিএর অধীনে থাকা জলাবদ্ধতার মূল প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়েছে মাত্র ৬০ শতাংশ। আট বছর আগে নতুন খাল খননের প্রকল্প নিয়ে এখনও জমি অধিগ্রহণের কাজটিও শেষ করতে পারেনি সিটি করপোরেশন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্পেও নেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। তাই অন্যবারের মতো এবারও বর্ষা নগরের ৬০  লাখ বাসিন্দার কাছে হবে চরম আতঙ্কের। এ আতঙ্কে নতুন মাত্রা যোগ করছে খালে থাকা বাঁধ। জলাবদ্ধতা প্রকল্পের আওতায় খালের পাড়ে প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণের জন্য দেওয়া হয়েছিল বাঁধগুলো। ৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত সর্বশেষ বৈঠকেও এসব বাঁধ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন খোদ সিটি মেয়র ও কাউন্সিলররা।

একই বৈঠকে আলোচনা হয়েছিল মরণফাঁদ হয়ে ওঠা উন্মুক্ত খাল ও নালা নিয়েও। খালে থাকা বাঁধ ও উন্মুক্ত খাল-নালার সমস্যা বর্ষার আগে দূর করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল এই বৈঠকে। কিন্তু তার কোনোটাই হয়নি বাস্তবে।

চট্টগ্রামে গত ছয় বছরে খাল ও নালায় পড়ে মৃত্যু হয়েছে ৯ জনের। একজনেরও লাশ মেলেনি। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নগরের ৪১ ওয়ার্ডে এখনও নিরাপত্তা বেষ্টনী ছাড়া খাল রয়েছে ১০ কিলোমিটারের বেশি। এখনও নগরজুড়ে উন্মুক্ত নালা রয়েছে পাঁচ সহস্রাধিক। সর্বশেষ সমন্বয় সভায় এপ্রিলের মধ্যে খালের বাঁধ সরানোর কথা থাকলেও সরেজমিন গিয়ে অন্তত পাঁচটি খালে বাঁধ দেখা গেছে। ফলে ঈদের তৃতীয় দিন হালকা বৃষ্টিতেও চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু পর্যন্ত পানি জমে যায়। তলিয়ে যায় অনেক এলাকার রাস্তাঘাট। বৃষ্টি হওয়ায় ২৪ ঘণ্টায়ও সরেনি অনেক এলাকার জমে থাকা পানি।

চট্টগ্রাম নগরে খাল রয়েছে ৫৭টি। জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় ৩৬টি খালে কাজ চলছে। এসব খালের মধ্যে কী পরিমাণ অস্থায়ী বাঁধ রয়েছে তার সঠিক কোনো হিসাব প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা বা সিটি করপোরেশনের কাছে নেই। তবে সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরী সমন্বয় সভাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে খালের ভেতর থেকে বাঁধ অপসারণের জন্য দাবি জানিয়ে আসছেন। এ জন্য সিডিএ ও সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের বারবার তাগাদাও দেন তিনি।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী বিদেশ সফরে থাকায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে বিদেশ যাওয়া আগের স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাতেও তিনি আসন্ন বর্ষার জলাবদ্ধতা নিয়েও কথা বলেন। বর্ষার আগে খালের বাঁধগুলো সরানো না হলে জলাবদ্ধতা ভয়াবহ হবে বলে শঙ্কাও প্রকাশ করেছিলেন তিনি।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম বলেন, 'সর্বশেষ সমন্বয় সভায় সিডিএর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, বর্ষা শুরুর আগেই খালের বাঁধ সরিয়ে নেওয়া হবে। এখন কিছু কিছু বাঁধ সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আর যেখানে যেখানে রয়ে গেছে সেগুলো দ্রুত অপসারণের জন্য সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে তাগাদা দেওয়া হচ্ছে।'

জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাহ মো. আলী সমকালকে বলেন, 'চট্টগ্রাম নগরের পানি নিস্কাশনের প্রধান মাধ্যম চাক্তাই ও রাজাখালী খালে কোনো বাঁধ নেই। বর্ষার আগে যেসব খালে মাটির স্তূপ আছে এগুলো সরিয়ে নেওয়া হবে। জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় নগরের ৫৭টি খালের মধ্যে ৩৬টি খালে কাজ করছি আমরা। বাকিগুলো পরিস্কার করা না হলে স্বাভাবিকভাবে জলাবদ্ধতা হবে।'

এখনও রয়ে গেছে খালের ভেতর বাঁধ

জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় খালের পাড়ে প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণের জন্য খালে বাঁধ দিয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা। বাঁধগুলোর কারণে পানি চলাচলের পথ সরু হয়ে পড়েছে। অনেক জায়গায় পুরো খাল ভরাট হয়ে আছে। আবার বাঁধের কারণে খালের সঙ্গে সংযুক্ত নালার পথ বন্ধ হয়ে আছে। যার কারণে বৃষ্টি হলে পানি খালে নামতে পারছে না।

সরেজমিন নগরের ২ নম্বর গেট থেকে বহদ্দারহাট পর্যন্ত চশমা খালের বিভিন্ন এলাকায় খালে বাঁধ দেখা গেছে। বহদ্দারহাট থেকে উত্তর দিকে চলে গেছে হাজী চাঁন মিয়া সড়ক। এই সড়কের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে মির্জাখাল। খালটির বিভিন্ন এলাকায় প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছে। এ জন্য বাঁধ দেওয়া হয়েছে। বর্ষা ঘনিয়ে এলেও এখনও বাঁধ সরানো হয়নি।

খালপাড়ের বাসিন্দা আবদুল মোনাফ সমকালকে বলেন, 'বৃষ্টি হলেই হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যায়। মানুষকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়। কয়েক দিন আগের বৃষ্টিতেও পানি উঠেছিল। এখন খালের ভেতর বাঁধ রয়ে গেছে। এগুলো যদি সরানো হয় তাহলে তো পানি নামবে না।'

নগরের চান্দগাঁও এলাকার আরাকান সড়কের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ডোমখাল। খালটি হামিদচরে গিয়ে কর্ণফুলী নদীতে পতিত হয়েছে। খালটির একাংশে প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণকাজ শেষ হলেও এখনও খাল থেকে বাঁধ সরানো হয়নি। ফলে হালকা বৃষ্টিতে পুরো এলাকা ডুবে যায়।

চান্দগাঁও গোলাম আলী নাজির বাড়ি এলাকার বাসিন্দা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইসমাইল হোসাইন বলেন, 'খালে বাঁধ থাকায় দীর্ঘদিন ধরে কষ্ট পাচ্ছে এই এলাকার অর্ধলাখ বাসিন্দা। একটু বৃষ্টি হলেই পাঠানিয়া গোদা থেকে খাজারোড পর্যন্ত আশপাশের পুরো এলাকা পানি জমে যায়। এমনকি বাসা-বাড়িতেও হাঁটুপানি জমে যায়। যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে।'

চট্টগ্রাম নগরের ফিরিঙ্গিবাজার এলাকায় কখনও জলাবদ্ধতার সমস্যা ছিল না। ফিরিঙ্গিবাজার খালে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ শুরুর পর এখানে পানি জমে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। খালে বাঁধ থাকায় গত বছরও এই এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। ইতোমধ্যে আশপাশের খালগুলো থেকে বাঁধ অপসারণ করা হলেও ফিরিঙ্গিবাজার খালের বিশাল অংশজুড়ে বাঁধ রয়ে গেছে। তা সরানো না হলে এবারও পানি জমে দুর্ভোগ সৃষ্টি করবে বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।

আতঙ্কের নতুন নাম উন্মুক্ত নালা-খাল

চট্টগ্রামে বর্ষা এলে নগরের একেকটি খাল-নালা উন্মুক্ত ফাঁদ হয়ে ওঠে। সম্প্রতি এসব খাল-নালায় পড়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীসহ মারা গেছেন পাঁচজন। গত ছয় বছরে মারা গেছেন ৯ জন। এর মধ্যে একজনের খোঁজ মেলেনি। আহত হয়েছেন অনেকে। সিটি করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, নগরের ৪১ ওয়ার্ডে খাল-নালা রয়েছে এক হাজার ১৩৭ কিলোমিটার। এর মধ্যে নিরাপত্তা বেষ্টনী ছাড়া খালের পাড় রয়েছে ১৯ কিলোমিটার। উন্মুক্ত নালা রয়েছে ৫ হাজার ৫২৭টি স্থানে। গত বছরের অক্টোবরে নগরের এসব ঝুঁকিপূর্ণ খাল-নালা সিটি করপোরেশন চিহ্নিত করলেও এখনও নগরবাসীর জন্য নিরাপদ করতে পারেনি।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com