কানের ফাঙ্গাস সংক্রমণ

প্রকাশ: ১৪ মে ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ১৪ মে ২২ । ১১:৩০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ডা. মো. আব্দুল হাফিজ (শাফী)

রোগটা তাদেরই বেশি হয়, যারা কোনো কারণবশত দীর্ঘ সময় ধরে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করছেন। অথবা কান পাকা রোগের কারণে অনেক দিন ধরে স্টেরয়েড-সংবলিত কানের জীবাণুনাশক ড্রপ ব্যবহার করে থাকেন। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি অথবা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার অভাব রয়েছে



চল্লিশোর্ধ্ব এক ভদ্রমহিলা কয়েক দিন আগে চেম্বারে কানের চিকিৎসা নিতে আসেন। সমস্যা কী হয় প্রশ্ন করতেই তিনি বলেন, কয়েক দিন ধরে কানে অসহ্য চুলকানি হচ্ছে এবং কান বন্ধ হয়ে আছে। আজ থেকে ডান কানে প্রচণ্ড ব্যথা করছে এবং পানির মতো কালো ময়লা কানের ভেতর থেকে বেরুচ্ছে, যা আগে কোনো দিন বের হয়নি। ভদ্রমহিলা আরও যোগ করলেন, তিনি একজন ডায়াবেটিস রোগী। রোগীর আক্রান্ত কান পরীক্ষা করে দেখা গেল, কানে ছত্রাক সংক্রমণ অটোমাইকোসিস হয়েছে।

অটোমাইকোসিস নামক কানের রোগের পেছনে কোন ধরনের জীবাণু দায়ী?

কানের এ ধরনের চুলকানি হয় ছত্রাকজাতীয় জীবাণুর সংক্রমণ থেকে। এদের মধ্যে অ্যাসপারজিলাস নাইজার দায়ী ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ, যেখানে কালো ময়লার মতো ফাঙ্গাশের দলা কানে জমা হয় এবং ক্যানডিডা অ্যালবিকানস দায়ী ১০ থেকে ২০ শতাংশ; এ ক্ষেত্রে যেখানে ভেজা পত্রিকার পাতার মতো সাদা দলা কানের ভেতরে দেখা যায়।

কানের ছত্রাক রোগ অটোমাইকোসিসে আক্রান্ত হলে রোগীরা কী কী সমস্যা নিয়ে আসেন?

১. অতিরিক্ত চুলকানির সঙ্গে কানে অস্বস্তি।

২. কানে অসহ্য ব্যথা (যদি এর সঙ্গে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ যুক্ত হয়)।

৩. কানের ভেতর কিছু জমা হয়ে বন্ধ হয়ে আছে এমন অনুভূতি। কান ভারী ভারী লাগতে পারে।

৪. কান থেকে ধূসর, হলুদ বা সাদা রঙের তরল পদার্থ বেরিয়ে আসতে পারে।

৫. কানে শুনতে সমস্যা হওয়া।

কাদের ক্ষেত্রে কানের এই সমস্যা হয়ে থাকে?

১. রোগটা তাদেরই বেশি হয়, যারা কোনো কারণবশত দীর্ঘ সময় ধরে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করছেন। অথবা কান পাকা রোগের কারণে অনেক দিন ধরে স্টেরয়েড-সংবলিত কানের জীবাণুনাশক ড্রপ ব্যবহার করে থাকেন।

২. ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি অথবা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার অভাব রয়েছে।

৩. রোগটা আমাদের দেশে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বেশি দেখা যায়। কারণ এখানকার আবহাওয়া উষ্ণ ও আর্দ্র। এই ধরনের পরিবেশ ছত্রাকের জন্য অনুকূল।

৪. কান পরিস্কারের নামে যারা ঘন ঘন পরম আয়েশে কানে কটনবাড দিয়ে কান থেকে যাবতীয় ময়লা বের করে আনার চেষ্টা চালাতে থাকেন।

৫. রাস্তায়, ফুটপাতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে যারা কান পরিস্কার করেন, তারাও অটোমাইকোসিসে আক্রান্ত হয়ে থাকেন।

চিকিৎসা

রোগীরা কানের উল্লিখিত সমস্যা নিয়ে এলে নাক-কান-গলার চিকিৎসকরা কারণ জানতে একটা অটোস্কোপ (কানের ভেতরটা পরীক্ষা করার যন্ত্র) ব্যবহার করে কানের পরীক্ষা করে থাকেন। কানের রোগ নির্ণয়ের ওপর নির্ভর করে চিকিৎসার ধরন। অটোমাইকোসিস হলে চেম্বারে মাইক্রোইয়ার সাকার মেশিনের সাহায্যে অথবা ড্রাই মপিংয়ের মাধ্যমে ধীরে ধীরে পরিস্কার করে কানের ভেতর থেকে ছত্রাকের দলা বের করে এনে কান শুকনা করেন।

ষতারপর বাজারে বিভিন্ন নামে বিভিন্ন রকমের ছত্রাকরোধী মলম বা ড্রপ পাওয়া যায়; সেগুলো রোগের ধরন দেখে দিয়ে থাকেন। পুরো মাত্রায় পুরো মেয়াদে যথাযথভাবে ওষুধ ব্যবহার করলে পুরোপুরি রোগমুক্ত হওয়া সম্ভব।

-কানে চুলকানি কমানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিহিস্টামিন থেকে সঠিক ওষুধটি বেছে নিতে হবে।

- এ ছাড়া কানে যদি ব্যথা শুরু হয়, তা হলে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের চিকিৎসা করণীয় হয়ে পড়ে। সে ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। সঙ্গে প্রয়োজনবোধে ব্যথানাশক দেওয়া হয়ে থাকে।

-এর পাশাপাশি রোগীর ডায়াবেটিস থাকলে তার যথাযথ চিকিৎসা করতে হবে, নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

-ওষুধ ব্যবহার শেষে শিডিউল অনুযায়ী ফের কান পরীক্ষা করাতে হবে।

জটিলতা প্রতিরোধে চাই সতর্কতা

কান চুলকানির এই সমস্যা খুব সতর্কতার সঙ্গে মোকাবিলা না করলে কানের পর্দায় অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। অটোমাইকোসিস রোগটি যদিও বহিঃকর্ণের; কিন্তু কান পাকা রোগীদের কানেও এই জীবাণু দিয়ে মিশ্র সংক্রমণ হতে পারে। কানে প্রায়ই কটনবাড, দিয়াশলাইয়ের কাঠি, মুরগির পালক, চুলের ক্লিপ ঢোকানোর কারণে চুলকানোর সমস্যা হতে পারে। ঘন ঘন এ ধরনের বস্তুর সংস্পর্শে আসার কারণে হিতে বিপরীত হয়ে কানে প্রদাহ তৈরি হতে পারে। তাই সতর্ক হই, সুস্থ থাকি। আর তাছাড়া কানে কোনো সমস্যা হয়েছে বলে মনে হলে তখন অবশ্যই নাক-কান-গলা রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।


[নাক-কান-গলা রোগ বিশেষজ্ঞ এবং হেড-নেক সার্জন, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিলেট]

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com