সম্পাদক পরিষদের সেমিনার

'স্বাধীন সাংবাদিকতার বড় অন্তরায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন'

প্রকাশ: ১৪ মে ২২ । ২১:৫৯ | আপডেট: ১৪ মে ২২ । ২৩:১৮

বিশেষ প্রতিনিধি

সম্পাদক পরিষদ আয়োজিত সেমিনারে অতিথিরা। ছবি- সমকাল

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে স্বাধীন সাংবাদিকতার বিকাশের সবচেয়ে বড় অন্তরায় হিসেবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে চিহ্নিত করেছেন সাংবাদিক নেতারা। এছাড়া প্রস্তাবিত নতুন আইনগুলোতে স্বাধীন সাংবাদিকতাকে বাধাগ্রস্ত করে- এমন ধারা-উপধারা সংযোজন নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারা। একই সঙ্গে ১৯২৩ সালের পরিত্যক্ত অফিস সিক্রেটস অ্যাক্ট বর্তমান সময়ে সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে ব্যবহার করার কঠোর সমালোচনা করা হয়। তারা বলেন, সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের পাশে নাগরিক সমাজ না দাঁড়ালে দেশে স্বাধীন সাংবাদিকতা রক্ষা করা সম্ভব নয়।

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে শনিবার 'ডিজিটাল নজরদারিতে সাংবাদিকতা' শিরোনামে সম্পাদক পরিষদ আয়োজিত সেমিনারে এসব কথা বলেন তারা।

ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের সভাপতিত্বে ও সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় সেমিনারে বক্তব্য দেন সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন 'নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ' (নোয়াব) সভাপতি এ. কে. আজাদ, বিএফইউজের সাবেক সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল, সম্পাদক পরিষদের সহসভাপতি ও নিউ এজ সম্পাদক নুরুল কবীর, ভোরের কাজগ সম্পাদক শ্যামল দত্ত, সম্পাদক পরিষদের কোষাধ্যক্ষ ও মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, বিএফইউজের একাংশের বর্তমান সভাপতি ওমর ফারুক, অপর অংশের সভাপতি এম আব্দুল্লাহ, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সভাপতি কাদের গনি চৌধুরী এবং ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি নজরুল ইসলাম মিঠু।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন, প্রকাশিতব্য প্রতিদিনের বাংলাদেশ সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি, ইনকিলাব সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দীন এবং বগুড়া থেকে প্রকাশিত করতোয়া সম্পাদক মোজাম্মেল হক লালু। মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন আজকের পত্রিকার সম্পাদক গোলাম রহমান, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সাধারণ সম্পাদক আখতার হোসেন প্রমুখ।

আলোচনায় অংশ নিয়ে সম্পাদক পরিষদের সভাপতি মাহফুজ আনাম বলেন, একটা প্রশ্ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সাংবাদিকরা কী করেন, কেন তাদের ধরার জন্য এত আইন? সেই ব্রিটিশ আমলের আইন দিয়ে সাংবাদিকদের এ সময়ে এসেও ধরা হচ্ছে। মানহানির আইন, আদালত অবমাননার আইন দিয়ে সাংবাদিকদের ধরা হচ্ছে। এরপর নতুন করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন হয়েছে। এই আইন সাংবাদিকতা বিকাশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হিসেবে দেখা দিয়েছে। এরপর ডাটা প্রটেকশন অ্যাক্ট হচ্ছে, ওটিটি নিয়ে প্রবিধানমালা হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, সব ক্ষেত্রেই সাংবাদিকদের ধরার ব্যবস্থা রাখাটাই মুখ্য হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ডিজিটাল অপরাধ যারা করছে, তাদের ধরার জন্য আইন করুন। তাদের ধরুন, আমাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু সে আইনে 'এই আইন সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না'- এমন একটি ধারা কেন যোগ করা হচ্ছে না? এই ধারা যোগ করলেই তো এই আইন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ থাকে না। এখন অবস্থাটা এমন হচ্ছে, ডিজিটাল অপরাধ বন্ধের জন্য আইন যতটা না ব্যবহার হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, স্বাধীন সাংবাদিকতা ছাড়া গণতন্ত্র কোনোভাবেই বিকশিত হওয়া সম্ভব নয়।

সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে বিদ্যমান নতুন ও পুরোনো আইন পর্যালোচনা করে সেগুলো সম্পর্কে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে একটি সমন্বিত বক্তব্য তৈরির জন্য কমিটি গঠনের ঘোষণা দিয়ে তিনি আরও বলেন, সেমিনারের আলোচনায় সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে ব্যবহার হয় এমন আইনগুলো সার্বিকভাবে পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি গঠন করার প্রস্তাব এসেছে। সম্পাদক পরিষদ এই কমিটি গঠন করবে। এ ছাড়া ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং নারী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল মাধ্যমে হয়রানি বন্ধের বিষয়েও সম্পাদক পরিষদ উদ্যোগ নেবে।

নোয়াব সভাপতি এ. কে. আজাদ বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ভীষণ উদ্বেগের সৃষ্টি করছে। সত্তর-আশির দশকে মেধা, দক্ষতা ও সাহসিকতার সমন্বয়ে যে সাংবাদিক নেতৃত্ব গড়ে উঠেছিল, এখন তা নেই। ফলে চ্যালেঞ্জটা অনেক বেশি বেড়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশে স্বাধীন সাংবাদিকতার বিকাশ নিয়ে সবাইকে খুব গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।

সম্পাদক পরিষদ আয়োজিত সেমিনারে অতিথিরা- সমকাল

তিনি আরও বলেন, সংবাদপত্রগুলো নিজের আয়ের ওপর না দাঁড়ালে শুধু অন্য প্রতিষ্ঠানের সিএসআর (করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি) কার্যক্রম হিসেবে টিকিয়ে রাখা যাবে না। বর্তমানে এক কপি সংবাদপত্র ছাপতে ২৭ থেকে ২৮ টাকা খরচ হয়। সেই পত্রিকা বিক্রি হয় প্রতি কপি ১০ টাকা, যেখান থেকে সংবাদপত্র পায় ৬ টাকা। আবার সংবাদপত্রের মূল আয়ের ক্ষেত্র হিসেবে যে বিজ্ঞাপনের কথা বলা হয়, সেটিও কমে গেছে। বেসরকারি বিজ্ঞাপন কমে গেছে। সরকারি বিজ্ঞাপনের বিলও মাসের পর মাস পড়ে থাকছে। বর্তমানে সংবাদপত্রগুলোতে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার বেশি সরকারি বিজ্ঞাপনের বিল বাকি রয়েছে।

মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৫৭ ধরনের আইন করা হয়েছে সাংবাদিকদের নজরদারিতে নিয়ে আসার জন্য। আবার পুরোনো আইন, যেমন- ১৯২৩ সালের অফিস সিক্রেটস অ্যাক্ট দিয়ে কিছুদিন আগে সাংবাদিকতা করার জন্য সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এরপর নতুন করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করা হয়েছে, যেটাও মূলত ব্যবহার হচ্ছে সাংবাদিকদের জন্য। আরও নতুন আইন আসছে। এ কারণে এখন দরকার সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে আইনগত বিষয় পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি গঠন করা। এরপর সার্বিক পর্যালোচনার মাধ্যমে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে একটি সমন্বিত বক্তব্য নিয়ে যাওয়া দরকার। তিনি আরও বলেন, নাগরিক সমাজ সাংবাদিকদের পক্ষে না থাকলে স্বাধীন সাংবাদিকতা ও সংবাদমাধ্যম রক্ষা করা সম্ভব নয়।

নুরুল কবীর বলেন, কোনো সরকারের আমলেই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীন পথচলা নিরঙ্কুশ ছিল না। সব সময়ই স্বাধীনতার জন্য সাংবাদিকদের আন্দোলন করতে হয়েছে। এটা একটা নিরন্তর ধারা। তবে যে সরকার যত বেশি কর্তৃত্বপরায়ণ হয়, সে সরকারের আমলে সংবাদমাধ্যমের ওপর তত বেশি খড়গ নেমে আসে।

শ্যামল দত্ত বলেন, ডিজিটাল নজরদারির এ সময়ে এসে সত্যিই কি আমরা মুক্ত সাংবাদিকতা করতে পারছি? আগে সম্পাদকরা যে ধরনের মন্তব্য প্রতিবেদন লিখতেন, এখন কি সে ধরনের লেখা দেখা যাচ্ছে? ডিজিটাল অবরোধের ভেতরে সাংবাদিকতা কতটা মুক্ত থাকবে, তা নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে ভাবার সময় এসেছে। তিনি আরও বলেন, কোন নাগরিক সমাজ সাংবাদিকদের পক্ষে থাকবে? এই নাগরিক সমাজও তো স্পষ্টভাবে রাজনৈতিক বিভাজনে বিভাজিত।

মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, বর্তমান সময়ে 'সেলফ সেন্সরশিপ' প্রকট হয়ে উঠেছে। কারণ আসলে ডিজিটাল নজরদারি নয়, বরং ডিজিটাল অ্যাকশন চলছে। আইন এমনভাবে করা হয়েছে, যে কোনো সমালোচনা, আলোচনাকেই ডিজিটাল আইনে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যায়। এ কারণে সাংবাদিকরা ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে পড়ে 'সেলফ সেন্সরড' হয়ে যাচ্ছেন। এর ফলে শেষ বিচারে দেশ-জাতিরই ক্ষতি হচ্ছে।

ওমর ফারুক বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যেসব ধারা সম্পর্কে সাংবাদিকরা আপত্তি দিয়েছিলেন, তা সরকার মানেনি। পরে এই আইনের অপপ্রয়োগের বিষয়ে সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের আশঙ্কাই সত্য প্রমাণিত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, নবম ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন না করার কারণে বর্তমানে সংবাদপত্র মালিকদের কাছে সাংবাদিকদের ৫৪০ কোটি টাকা পাওনা আছে। সে টাকা দিয়ে দেওয়া উচিত।

এ ছাড়া অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন এম আব্দুল্লাহ, কাদের গনি চৌধুরী, নজরুল ইসলাম মিঠু প্রমুখ।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com