ঢাকা ও চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা: সমস্যাই দেখি, সমাধান দেখি না

প্রকাশ: ১৫ মে ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ১৫ মে ২২ । ০৩:০৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পাদকীয়

জলাবদ্ধতার কারণে বর্ষা মৌসুম দেশের বড় শহরগুলোর অধিবাসীদের কাছে কয়েক দশক ধরে এক ধরনের যন্ত্রণায় পরিণত হয়েছে-এমনটা বললে হয়তো অত্যুক্তি হবে না। তবে রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের জন্য তা ইতোমধ্যে এক আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটু ভারি বৃষ্টি হলেই রাজধানীর বেশিরভাগ রাস্তায় কোথাও হাঁটুজল, কোথাও কোমরসমান পানি জমে যায়। সাগরপাড়ের চট্টগ্রাম তো রীতিমতো সাগরে রূপ নেয়। দুঃখজনকভাবে, এ বছরের বর্ষায়ও নগর দুটির চিত্র ভিন্ন কিছু হচ্ছে না বলে শনিবার সমকালের প্রথম পৃষ্ঠার দুটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে '৩ হাজার কোটি টাকা জলে' শিরোনামের প্রতিবেদনেতে বলা হয়েছে, আসন্ন বর্ষায় অল্প সময়ে অতি ভারি বর্ষণের পূর্বাভাস রয়েছে। তাই এ বছরও ডুববে রাজধানী। 'বর্ষা আসে শঙ্কা নিয়ে' শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্ষা ৬০ লাখ চট্টগ্রাম নগরবাসীর জন্য অন্যবারের মতো এবারও চরম আতঙ্কের হবে। অথচ সংশ্নিষ্ট বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের পুনঃপুন আশ্বাসের পাশাপাশি দুটি নগরে জলাবদ্ধতা নিরসনে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণের পরিপ্রেক্ষিতে জনমনে এমন একটা ধারণা গড়ে উঠেছিল- এবার হয়তো ওই যন্ত্রণা থেকে একটু হলেও নিস্কৃতি মিলবে। ২০২০ সালের শেষদিকে রাজধানীর খালগুলো ঢাকা ওয়াসার কাছ থেকে দুই সিটি করপোরেশন অর্থাৎ ঢাকা দক্ষিণ ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তরের পর সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্পের কথা আমাদের মনে আছে। বিশেষজ্ঞরা বহু বছর ধরে বলে আসছিলেন, রাজধানীর জলাবদ্ধতা দূর করতে হলে আগে নগরীর খালগুলোকে দ্রুত পানি নিস্কাশনের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। অনেকটা সে পরামর্শ মেনে ওইসব প্রকল্পের অধীনে দুই সিটি করপোরেশনই বেশ কয়েকটি বেদখল খাল উদ্ধারের পর ময়লা-আবর্জনামুক্ত করে। গত বছর এর সুফলও পায় নগরবাসী। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, প্রতিবেদনে যেমনটা বলা হয়েছে, যথাযথ ব্যবস্থাপনার অনুপস্থিতিতে অনেক খাল আবারও আবর্জনায় ভরে গেছে। ইতোমধ্যে এর কুফলও দেখা গেছে। গত ২০ এপ্রিল ৬ ঘণ্টায় ৪৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হওয়ার পর রাজধানীর অনেক এলাকায় প্রচুর পানি জমে যায়। ঘূর্ণিঝড় আসানির প্রভাবে বৃষ্টি হওয়ায় সে সময়ও নগরীর অনেক জায়গায় একই অবস্থা তৈরি হয়।

১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় একই সময়ে চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনেও নেওয়া হয় একাধিক প্রকল্প। কিন্তু এগুলো বাস্তবায়নের পরও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নেই। উপরন্তু, গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো এ সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন খালে থাকা বাঁধ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলাবদ্ধতা প্রকল্পের আওতায় খালের পাড়ে প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণের জন্য দেওয়া বাঁধগুলো চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বারবার তাগিদ সত্ত্বেও সরিয়ে নেওয়া হয়নি। শুধু তাই নয়, চট্টগ্রাম নগরীতে এখন নতুন আতঙ্কের নাম উন্মুক্ত নালা ও খাল। একটু ভারি বৃষ্টি হলেই কোনো রকম নিরাপত্তা বেষ্টনীবিহীন এসব নালা-খাল রাস্তার সঙ্গে একাকার হয়ে যায়। পরিণত হয় মৃত্যুফাঁদে। জানা গেছে, চট্টগ্রামে গত ৬ বছরে খাল ও নালায় পড়ে মৃত্যু হয়েছে ৯ জনের, যাদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীসহ পাঁচজনই মারা গেছেন এ বছর। একজনেরও লাশ মেলেনি। আরও দুঃখজনক হলো, গত বছরের অক্টোবরে নগরের এসব ঝুঁকিপূর্ণ খাল-নালা সিটি করপোরেশন চিহ্নিত করলেও এখনও নগরবাসীর জন্য নিরাপদ করতে পারেনি।

ঢাকা ও চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতার সমস্যা যতটা পুরোনো ঠিক ততটাই পুরোনো তা সমাধানের চেষ্টা। দুই নগরীতেই জলাবদ্ধতার যন্ত্রণা থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দিতে এর আগে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে বহু প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কিন্তু মূলত ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে সেগুলোর কোনোটাই সুফল বয়ে আনেনি। সাম্প্রতিক সময়ে দুই নগরীতে গৃহীত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলেও নগরী দুটো যে রাতারাতি জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত হয়ে যাবে, তা নয়। কারণ সমস্যাটা বহুমাত্রিক; এর সমাধানও একমাত্রিক হতে পারে না। কিন্তু এটা বলা যায় যে, প্রকল্পগুলোর দ্রুত ও যথাযথ বাস্তবায়ন অন্তত সমস্যাটার তীব্রতা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। সেদিকে সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষ মনোযোগ দেবে- এমনটাই আমাদের প্রত্যাশা।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com