দিবস

পরিবারবান্ধব নগরায়ণ হোক

প্রকাশ: ১৫ মে ২২ । ২০:০২ | আপডেট: ১৫ মে ২২ । ২০:১৫

ফারহানা জামান ও আশেক মাহমুদ

নগরায়ণ প্রক্রিয়াকে পরিবারবান্ধব করা জরুরি

বিশ্ব পরিবার দিবস ১৫ মে। ১৯৮৩ সালে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক কাউন্সিলের সুপারিশমালার ভিত্তিতে সামাজিক উন্নয়ন কমিশন উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবারের অন্তর্ভুক্তি এবং পরিবারের ভূমিকার গুরুত্ব সম্পর্কে নীতি প্রণয়নকারীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে জাতিসংঘের মহাসচিবের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৯ সালের ৯ ডিসেম্বর রেজুলেশনে সাধারণ পরিষদ এক প্রস্তাবে ১৯৯৩ সালকে বিশ্ব পরিবার বর্ষ এবং ১৫ মে'কে বিশ্ব পরিবার দিবস হিসেবে অনুমোদন করে।

এবারের বিশ্ব পরিবার দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় 'পরিবার ও নগরায়ণ' অর্থাৎ টেকসই এবং পরিবারবান্ধব নগরায়ণবিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধি। আধুনিক নগরায়ণ প্রক্রিয়ায় পরিবার কাঠামোর উন্নয়ন আজকের যুগে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। সেই চিন্তা থেকে নগরায়ণ প্রক্রিয়াকে পরিবারবান্ধব করা অতি জরুরি।

পরিবার একটি চিরায়ত প্রতিষ্ঠান যা মানব সভ্যতার সূতিকাগার। অন্যদিকে আধুনিক সভ্যতার বিকাশের ধারায় নগরায়ণ শুধু প্রশাসনিক আর যোগাযোগব্যবস্থায় উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়; পারিবারিক ও সামাজিক জীবনমানের পরিবর্তনে এর ভূমিকা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিল্পবিপ্লবের মধ্য দিয়ে নগরায়ণ পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সঙ্গে সুদৃঢ় সেতুবন্ধন স্থাপন করতে সক্ষম হয়। নগর ও পুঁজির এই আন্তঃসম্পর্ক নগরের পারিবারিক জীবন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে অনেক বেশি মাত্রায়। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে যোগাযোগব্যবস্থায় আধুনিকায়নের ফলে শিল্প নগরকেন্দ্রিক সভ্যতার বিকাশ ঘটে। নগরায়ণের এই ধারায় গতি সৃষ্টি করে চলেছে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা। শিক্ষা ও পেশাগত জীবনযাপনের তাগিদ থেকে নগর হয়ে উঠেছে 'উন্নত জীবন' গঠনের মুখ্য কেন্দ্র। সে কারণে গ্রাম থেকে শহরে মানুষের ভিড় বেড়েই চলেছে।

ইউএনএফপিএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পৃথিবীর মেগাসিটিগুলোর মধ্যে জনঘনত্ব সবচেয়ে বেশি ঢাকায়। প্রতিদিন ঢাকায় যুক্ত হচ্ছে ১ হাজার ৭০০-এর অধিক মানুষ। গ্রাম থেকে শহরে স্থানান্তরের প্রক্রিয়ায় শহরবাসীর পরিবার কাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। এর কারণ- শহরের পরিবার কাঠামো অনেকাংশে নগরায়ণ প্রক্রিয়া দ্বারা প্রভাবিত। কৃষিভিত্তিক সমাজে যে যৌথ পরিবারের কদর ছিল তা এখন বিলুপ্তির পথে। 'উন্নত' জীবনযাপনের তাগিদ থেকে একক পরিবারের সংখ্যা যেমন অত্যাধিক বেড়ে গেছে, তেমনি অপরিকল্পিত নগরায়ণ কেড়ে নিয়েছে পারিবারিক জীবনের সুখ শান্তি। বিষয়টি আমরা তিন ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে পারি- সামাজিক সমস্যা সংক্রান্ত, সাংস্কৃতিক সংকট সংক্রান্ত এবং নগর পরিকল্পনা সংক্রান্ত।

সামাজিক সমস্যা সংক্রান্ত দিক বিবেচনা করলে দেখা যায়, দরিদ্রতা, বেকারত্ব, ভূমিহীনতা ও জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত কারণে নগরমুখিতা বাড়ছে। নগরায়ণের প্রভাব ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের পরিবারের ওপর ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব বিস্তার করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্র উপকূলবর্তী গ্রামের পরিবারগুলো নানা ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে অবস্থান করছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, জলাবদ্ধতা, পানির লবণাক্ততার কারণে গ্রামবাসীকে খাদ্যের অভাব আর পুষ্টিহীনতার মধ্যে বাস করতে হয়। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ত পানির প্রভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভপাত ও মাতৃত্বজনিত জটিলতাসহ বিভিন্ন রকম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকতে হচ্ছে মা ও কিশোরীদের। এ থেকে নিস্তারের জন্য নগরের দিকে তাদের যাত্রা। শহরে এসে কারখানায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। অক্লান্ত খাটুনির পরও স্বল্প মজুরির কারণে তাদের থাকতে হয় নিম্নমানের অপরিচ্ছন্ন বস্তিতে। উদ্বাস্তুর মতো এসব বস্তির ছোট্ট কুঠুরিতে থাকছে গড়ে ৬ থেকে ৭ জন। এসব বস্তিতে স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশনের ব্যবস্থা নেই। আলাদা রান্নাঘরের ব্যবস্থা না থাকায় বস্তির সব পরিবারকে থাকতে হয় বস্তি পুড়ে যাওয়ার ভয়ে। নারী ও শিশুদের নিরাপদ জীবন বলতে এখানে কিছু নেই। এখানে নগরায়ণ মানেই হলো অসম উন্নয়ন। একপাশে অট্টালিকা আর একপাশে বস্তি। পুঁজির সূত্রে নগরায়ণ হচ্ছে বলেই গ্রামের দরিদ্র মানুষ শহরে এসে সেই দারিদ্র্যকেই আলিঙ্গন করছে। এর ফলে শ্রমিকের পরিবার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। সেই বঞ্চনা থেকে অনেকেই পা বাড়ায় অপরাধের জগতে।

দ্বিতীয়ত, নগরায়ণের গতানুগতিক ধারায় সাংস্কৃতিক সংকট প্রকট হয়ে উঠছে। নগর সংস্কৃতি অতি মাত্রায় ভোগকেন্দ্রিক হয়ে পড়ায় মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক লেনদেনের সূত্রে চালিত হয়। অর্থমূল্যে জীবনের অর্থ রচিত হয় বলে এখানে সামাজিক সম্পর্ক এমনকি পারিবারিক সম্পর্ক দুর্বল ও ক্ষয়িষুষ্ণ। নগর সমাজতাত্ত্বিক জর্জ জিমেলের মতে- এখানে জ্ঞান বুদ্ধির প্রয়োগ আছে, আছে অবাধ স্বাধীনতা আর ভোগ কালচারের সুযোগ। এখানে আছে অন্যকে পেছনে ফেলে নিজের সমৃদ্ধির প্রতিযোগিতা। নগর সমাজতাত্ত্বিক লুইচ রিথ ও ফারদিনান্দ টনিস সে কারণে বলেন, নগর জীবনে একে অন্যের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস নেই বলে সম্পর্কের স্থায়িত্ব নেই। স্মার্টফোন এসে আস্থার সংকট আরও বাড়িয়ে তুলেছে। নারী ও পুরুষের স্বাধীনতা এখানে অধিক, কিন্তু পারস্পরিক বোঝাপড়ার তীব্র অভাব। সে কারণে এখানে ডিভোর্সের হার অধিক। যৌথ পরিবারের অভাবে সন্তানদের জীবন এখানে একাকিত্বের মেঘে ঢাকা।

অন্যদিকে আবাসন প্রকল্প অপরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার ফলে পরিবারের শিশুরা হারাচ্ছে খেলার মাঠ, পার্ক আর বাউন্ডারিসহ বিদ্যালয়। বহুতলবিশিষ্ট ভবনের কয়েকটি ফ্লোর নিয়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়। শিশুদের মনোরঞ্জনের জন্য রাখা হয়েছে কিছুসংখ্যক প্লাস্টিকের ঘোড়া, এক-দুটি দোলনা অথবা প্লাস্টিকের কিছু বল। পরিপূর্ণ মানসিক বিকাশ ঘটাতে অক্ষম এসব বিদ্যালয় শিশুদের করে তুলছে ডিভাইস নির্ভর। নির্মল পরিবেশে খেলাধুলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে শিশুরা কৃত্রিম বিনোদন খোঁজে স্মার্টফোনে। স্মার্টফোন নির্ভরতা আসক্তিতে রূপ নেয় বলেই শিশুদের সামাজিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে। সামাজিকতার সংস্কৃতি থেকে তারা বঞ্চিত।

এর মানে, সুষ্ঠু নগর পরিকল্পনার বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে সমৃদ্ধ পারিবারিক কাঠামো বিনির্মাণের স্বার্থেই। বস্তিতে বসবাসের প্রথা বাতিল করে শ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত আবাসন নিশ্চিত করতে হবে। স্বল্প আয়ের পরিবারের সন্তানদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবাদান জরুরি। প্রতিটি স্কুল-কলেজের পরিসরে খেলার মাঠ রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে। নগরে জনসংখ্যার ঘনত্ব কমানোর জন্য রাজধানীর বাইরে আলাদা শিল্পনগর প্রতিষ্ঠাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। স্মার্টফোনে আসক্তি থেকে মুক্ত হওয়ার শিক্ষাসহ সততা ও মূল্যবোধ নির্ভর মানুষ গড়ার শিক্ষা চলমান শিক্ষাব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তির মধ্য দিয়ে সুখী সমৃদ্ধ পরিবার কাঠামো নির্মাণের প্রতি যত্নবান হতে হবে। নগরায়ণ সংস্কারের মধ্য দিয়ে বিকশিত হোক আগামীর সমৃদ্ধ পরিবারব্যবস্থা- এই হোক আমাদের প্রত্যয়।

ড. ফারহানা জামান ও ড. আশেক মাহমুদ :যথাক্রমে অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়


© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com