বইয়ের ভুবন

বিজ্ঞান সংস্কৃতির জন্য

প্রকাশ: ২০ মে ২২ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জিয়া হাসান

বিজ্ঞান ভাবনা, লেখক-মো. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া, প্রকাশক-গ্রন্থকুটির, প্রচ্ছদ-ধ্রুব এষ, মূল্য-২০০ টাকা

সাধারণ সাহিত্যের মতো বিজ্ঞানসাহিত্যেও একটা জোয়ার এসেছে নতুন করে। বেশ কয়েক বছর ধরেই ভালো কিছু বিজ্ঞানের বই প্রকাশিত হচ্ছে। আশার কথা হলো, বিজ্ঞানবিষয়ক লেখকের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে ভালো মানের বিজ্ঞান বইয়ের সংখ্যাও। সাম্প্র্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বিজ্ঞানবিষয়ক বই প্রকাশিত হয়েছে। তেমনই একটি বিজ্ঞানবিষয়ক বই হচ্ছে 'বিজ্ঞান ভাবনা'। লিখেছেন ড. মো. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া; তেতাল্লিশ বছর ধরে বিজ্ঞান চর্চার বিস্তৃতি ঘটানোর জন্য বাংলা ভাষায় বই লিখছেন তিনি। তাঁর সে প্রয়াস শুরু হয় উদ্ভিদ প্রজনন গ্রন্থের মধ্য দিয়ে ১৯৯২ সালে, বাংলা একাডেমির প্রকাশনার মধ্য দিয়ে। এরপর আর কখনও থামেননি ড. রশীদ ভূঁইয়া। দেশে জীববিজ্ঞান শিক্ষায় শিশু-কিশোরদের আগ্রহী করার জন্য জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন ২০১৫ সাল থেকে। জীববিজ্ঞান শিক্ষায় শিশু-কিশোরদের মনোযোগী করার এই আন্দোলনের বর্তমান সভাপতি তিনি। তাঁর বাংলা ভাষায় প্রকাশিত বিজ্ঞানগ্রন্থের সংখ্যা ২৫ ছাড়িয়ে গেছে।

বইটির ভূমিকায় তিনি লিখেছেন- একটা সময় ছিল যখন ক্লাসের ফার্স্টবয় প্রায় অনিবার্যভাবে বিজ্ঞান শাখায় পড়াশোনা করত। চিকিৎসক কিংবা প্রকৌশলী হওয়ার লক্ষ্য নিয়েই অধিকাংশ বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী বিজ্ঞান শাখা বেছে নিত। চিকিৎসক কিংবা প্রকৌশলী হয়ে তারা বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ হয়ে উঠবে এবং বিজ্ঞান চর্চা ও বিজ্ঞান গবেষণায় মনোনিবেশ করবে- এমন লক্ষ্য প্রায় শত ভাগেরই ছিল না তা নিশ্চিত করে বলা চলে; বরং তারা সহজেই একটি সরকারি চাকরিতে যোগদান করে প্রচুর অর্থ আয় করতে পারবে, সেটিই ছিল লক্ষ্য। সাদামাটাভাবে বললে এ রকম লক্ষ্য নিয়েই বিজ্ঞান পড়ায় ঝুঁকে যেত ক্লাসের ভালো ছাত্ররা। সেজন্য এখন বিজ্ঞান শিক্ষা, বিজ্ঞান চর্চা, বিজ্ঞান গবেষণা এবং প্রযুক্তি উদ্ভাবন সহায়ক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং এর বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষাকে সেভাবে সাজিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। আধুনিককালের বিজ্ঞান গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন খুব সহজ কাজ নয়। এর জন্য সরকারের প্রণোদনা ও আর্থিক সংশ্নেষের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহও নিশ্চিত করতে হবে।

চমৎকার সব বষয়ভিত্তিক আয়োজন দিয়ে পুরো বইটি সাজানো হয়েছে। বইয়ের প্রথম আলোচনাটি করা হয়েছে 'বিজ্ঞান শিক্ষা নিয়ে হেলাফেলা নয়'। এখানে বিজ্ঞান শিক্ষার ক্ষেত্রে আমরা কেন পিছিয়ে আছি সেটি তুলে ধরেছেন বিস্তারিতভাবে। আমাদের দেশে বহু স্কুল-কলেজে বিজ্ঞান ভবন নেই, নেই ব্যবহারিক বিজ্ঞান শেখানোর জন্য সস্তা এবং অতি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। আগামী দিনের বিজ্ঞান শেখা আরও বেশি প্রযুক্তিময় হবে। আর সে কারণেই এই বিষয়গুলো কেন গুরুত্ব দিতে হবে তা তুলে ধরেছেন তিনি।

'জ্ঞানবিজ্ঞানে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা' বিষয়ক লেখাটিতে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে বিশ্বের সঙ্গে জ্ঞানবিজ্ঞানে তাল মেলাতে হলে সবাইকে বিজ্ঞান পাঠের মধ্য নিয়ে আসতে হবে। তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেছেন বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতি মমতা আছে, এমন শিক্ষকদের নিয়োগ দিতে হবে এবং পাশাপাশি প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করতে হবে।

'বিজ্ঞান ও গবেষণায় আমাদের সম্ভাবনা'- এই আলোচনায় তিনি তুলে ধরেছেন দেশে বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষিত এক বিশাল জনবল আমাদের রয়েছে। দেশে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানসহ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিজ্ঞান গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন একদল বিজ্ঞানী ও গবেষক। আমাদের অনেক গবেষকই দেশে-বিদেশে উচ্চতর শিক্ষায় শিক্ষিত। উচ্চশিক্ষিত এই বিজ্ঞান গবেষক দল আমাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রধান নিয়ামক শক্তি। উপযুক্ত পরিকল্পনা, অর্জনযোগ্য বাস্তবমুখী বিজ্ঞান গবেষণা কর্মসূচি, দেশি-বিদেশি গবেষকদের মাধ্যমে সমন্বিত গবেষণা কর্মকাণ্ড পরিচালনা, দেশের এবং শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবন, প্রযুক্তির সঙ্গে শিল্পের মেলবন্ধন ঘটানো এবং উৎপাদিত প্রযুক্তিনির্ভর প্রোডাক্ট ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর আয়োজন সম্পন্ন করার কৌশলই আগামী দিনের বিজ্ঞানে আমাদের সম্ভাবনার ক্ষেত্র উন্মোচিত করতে পারে। অবিরত লক্ষ্যভিত্তিক বিজ্ঞান চর্চা ও গবেষণা প্রযুক্তি উদ্ভাবন সহায়ক হতে বাধ্য।

এই রকম বিভিন্ন বিশ্নেষণধর্মী আলোচনা দিয়ে সাজানো হয়েছে পুরো বইটি। এর অধ্যায় সংখ্যা মোট ১৫। বইয়ের অন্য অধ্যায়গুলো হচ্ছে- প্রয়োজন আনন্দময় বিজ্ঞান শিক্ষার আয়োজন, বিজ্ঞান চর্চা ও গবেষণার কালচার গড়ে তোলা, জীবপ্রযুক্তি-বিষয়ক গবেষণা, আমাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি, একটাই পৃথিবী, একে বাঁচাতে হবে, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ও বাংলাদেশ, জীববিজ্ঞান প্রাণেরই বিজ্ঞান, জীবকুলের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কই কাম্য, কভিডের নতুন ভ্যারিয়েন্ট প্রসঙ্গ, করোনাভাইরাস টিকার মেধাস্বত্ব ছাড়, বিজ্ঞানেরও নান্দনিক রূপ আছে, ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া মেলবন্ধন কতদূর?

জ্ঞানবিজ্ঞানে পৃথিবীর সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে আমাদের অবশ্যই চিরাচরিত ধ্যানধারণা ও কাঠামোর বাইরে গিয়ে ভাবতে হবে। তাই আজকের দিনে অতিসাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক চর্চার সাথে নিজেদের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির ভাবিষ্যৎকে একিভুত করতে চাইলে বিজ্ঞান শিক্ষা, চর্চা, গবেষণা এবং প্রযুক্তি উদ্ভাবন সহায়ক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা যেমন নেয়া প্রয়োজন, তেমনি তার বাস্তাবয়নে প্রয়োজন যথাযোগ্য পদক্ষেপ। া

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com