গল্প

হাসির আওয়াজ শোনা যায়

প্রকাশ: ২০ মে ২২ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পৃথ্বীশ চক্রবর্ত্তী

সবকিছুতেই হি হি করে হেসে ওঠা সুচিন্তার একটা স্বভাব হয়ে গেছে বলে তার পরিবারের সবার ধারণা। পাড়াপড়শি মনে করে, সুচিন্তার এই হাসি একদিন বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনতে পারে। তারা এমন করে ভাববেই-বা-না কেন? মেয়েটার দশ-বারো বছর হয়ে গেল, পঞ্চম শ্রেণির বারান্দায় পা রাখল; অথচ বিষয়টা ভালো হোক আর মন্দ হোক, সে বুঝুক বা না বুঝুক, একেবারে হি হি করে হেসে উঠবেই। সুচিন্তার এ রকম হাসির জন্য প্রতিদিনই মানুষের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গালমন্দ শুনতে হয় তার মাকে। কিন্তু কী হবে? এই হাসির জন্য তিনি কত কবিরাজের তাবিজ পরিয়েছেন তার গলে-হাতে, কত পানিপড়া খাইয়েছেন, বকাঝকা করেছেন, সর্বোপরি কতটা বেত সুচিন্তার পিঠে ভেঙেছেন, গুনে শেষ করতে পারবেন না। সুচিন্তা যখন ঘুমায় তখন তার মুখের দিকে তাকালেই মায়ের এসব মনে পড়ে। আর মনে হলে খুব খারাপই লাগে তার, মেয়ের জন্য কষ্ট পান। এত বড় মেয়ের ওপর মানুষ কি হাত তোলে? কিন্তু মানুষের তিরস্কার তিনি সহ্য করতে পারেন না।

সুচিন্তা যে কারও কষ্ট দেখলেই হাসে, তা কিন্তু নয়। যখন মানুষ কাঁদে বা হাসে বা রাগ করে বা মিথ্যে কথা বলে, তখন চেহারা পাল্টে যায়। তার মুখমণ্ডল সে নতুনভাবে আবিস্কার করে। তখন এমন চেহারার ভঙ্গিটঙ্গি দেখলেই হাসি ওঠে; যা তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সে তখন নিজে চেষ্টা করেও হাসি আটকাতে পারে না।

সেদিন তার পাশের ঘরের ঠাকুরদা তাদের উঠোনে কলার ছোলা পিছলে চিতপটাং হলে সে হি হি করে হেসে উঠলে বুড়ো কোনোমতে ওঠে তার মাকে নালিশ করতে গিয়ে অভিশাপই দিয়ে গেলেন বলে তার মায়ের কাছে লাগল। তিনি বললেন-

তোমার অসভ্য মেয়েকে বিয়ে দিয়েও তুমি শান্তিতে থাকবে না, এই বলে গেলাম।

ওই বাড়ির তার বাবার কাকিমা সেদিন মারা গেলে মায়ের সঙ্গে সেও গিয়েছিল। আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ভরপুর বাড়িতে অনেকেই কান্নাকাটি করছিলেন, তবে কেউ সত্যিকারভাবেই, কেউবা সম্পূর্ণ কৃত্রিমতার আশ্রয়ে, কারও কারও কান্না দেখলে কান্না অটো এসে যায়, এমন লোকও কম নয়, অনেকে রুমাল দিয়ে চোখে জল না এলেও ভান করে একটু পরপর চোখ মোছার অভিনয় করে যাচ্ছিলেন। তিনি জীবিত থাকতে যারা হরহামেশা বদনাম করে বেড়াত আজ তার দেহাবসান ঘটলে তাদের মুখে প্রশংসাসুলভ কথাবার্তা শুনে সুচিন্তা না হেসে পারল না। আরেকটা সমস্যা হলো তার একবার হাসি উঠলে সহজে থামেও না। সেদিনও তার হাসি থামছিল না। এমন অবস্থায় তার মা লোকলজ্জার ভয়ে মরাবাড়ি থেকে সুচিন্তাকে নিয়ে গা ঢাকা দিয়ে কোনোমতে ঘরে ফিরেছিলেন। সুচিন্তার হাসির জন্য এ রকম কতবার যে তার মাকে মানুষের সামনে লজ্জায় পড়তে হয়েছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই।

এই হাসির জন্য সুচিন্তা স্কুলেও বকাঝকা কম খায় না। সেদিন দুষ্টুমির জন্য প্রধান শিক্ষক তার এক বন্ধুকে বেত্রাঘাত করার পর সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলে সুচিন্তার যে হাসি উঠল তা আর কোনোমতেই থামল না। শেষ পর্যন্ত প্রধান শিক্ষক তাকে বেত্রাঘাত করতে বাধ্য হলেন।

সুচিন্তার বাবা ভাবুক স্বভাবের। সংসার কীভাবে চলছে সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তার এক বেহালা আছে আর তিনি আছেন। তা নিয়ে তিনি পথে পথে গান গেয়ে বেড়ান। সকালে চা খেয়ে যে বের হন আর দুপুরের আগে তাকে পাওয়া যাবে না। দুপুরে স্নান-পানি শেষে খেয়েদেয়ে যে বের হন আর রাত ১০টা-১১টায় ফিরবেন। ফলে সুচিন্তার মাকেই সংসারের দায়িত্ব নিতে হয়েছে। তিনি খুবই কর্মঠ মহিলা। সুচিন্তার সুপ্রকাশ নামে একটা ছোট ভাইও আছে। সে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। সংসার চালানোর পাশাপাশি দুই ভাইবোনের পড়াশোনার খরচও তাকে জোগাতে হয়। তিনি ঢেঁকি ভানেন। গ্রামের বাজার দূরে থাকায় পাড়াপড়শিরা বাজারের কলে না গিয়ে চাল করতে সুচিন্তার মায়ের কাছেই ধানের বস্তা নিয়ে আসে। কিছু ক্ষেত গেরস্তও আছে। হাঁস-মুরগি, কবুতর, ছাগল, গরু পালন করেও কিছু আয় হয়। ষাটোর্ধ্ব সুচিন্তার ঠাম্মাও বউমাকে যতটুকু পারেন সহযোগিতা করেন। আর এভাবেই সংসার চলে কোনোমতে।

গত ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু ভাষণ দিয়েছেন। সবাইকে শত্রুর বিরুদ্ধে পরোক্ষভাবে লড়াই করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাই এখানে-ওখানে সবখানে আসন্ন সংগ্রামের গুঞ্জন শুরু হয়ে গেছে। আজ সন্ধ্যার পরপরই গ্রামের পুরুষ মানুষ ভিড় জমিয়েছেন সুচিন্তাদের উঠোনে। তার বাবাও আজ সন্ধ্যার সঙ্গে সঙ্গেই বাড়ি ফিরেছেন। আঙিনা বড় থাকার কারণেই মূলত গ্রামের ছোটখাটো সভা বা উঠান বৈঠকগুলো সুচিন্তাদের আঙিনায় অনুষ্ঠিত হয়। কূরালীলক্ষ্মীপুর গ্রাম হিন্দু-মুসলিম অধ্যুষিত হলেও নব্বই ভাগই হিন্দু জনসাধারণ। এজন্য ভয়ও বেশি। সভার শুরুতেই সভাপতি গ্রামের মুরব্বি পঞ্চানন হালদার বলেন, পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ থেকেই তা বোঝা যায়। তিনি কি না বুঝে বলেছেন-

'ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল, তোমাদের যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।'

যে কোনো সময় ওরা আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। সভাপতির বক্তব্য শুনে সবাই শঙ্কিত হয়ে পড়লেন। কখন কী হয়, বলা যায় না। অন্যরাও তাদের বক্তব্যে শঙ্কা প্রকাশ করলেন। সবার চোখেমুখেই আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠল। সভা শেষে কেউ আল্লাহ আর কেউ ভগবানের কাছে দেশকে ও দেশের মানুষকে বাঁচানোর প্রার্থনা করলেন। আচমকা ঝড় এলে সবাই যেভাবে সৃষ্টিকর্তাকে ডাকে, সভার মানুষজন সেভাবেই বিধাতাকে ডাকলেন। সভার কথা জেনে আশপাশের বউ-ঝিসহ বয়স্ক মহিলা, যারা সুচিন্তাদের ঘর ও দাওয়ায় ভিড় জমিয়েছিলেন তাদের অনেকেই বক্তাদের বক্তব্য শুনে শুনে আসন্ন বিপদের আশঙ্কায় কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তাদের কান্নাকাটি দেখে সুচিন্তার যে হাসি উঠল আর থামায় কে! এ হাসির জন্য তার মা-সহ সবাই খুব একটা লজ্জা পাচ্ছিলেন।

২০-২২ দিনের মধ্যেই যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। ইতোমধ্যে পাঞ্জাবিরা এসে সুচিন্তাদের মুন্সিবাজারে ঘাঁটি গেড়েছে। বাজারে গিয়ে দোকানদারি বা বাজারহাট করা এখন ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারের আশপাশের প্রতিটি গ্রামের দুয়েকজন লোক রাজাকারের তালিকায় এর মধ্যে নামও উঠিয়েছে। সুচিন্তাদের গ্রামও বাদ পড়েনি। তাদের গ্রামের দু'জন রাজাকার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তাদের পাঞ্জাবিদের ক্যাম্পে প্রায়ই যাওয়া-আসা করতে দেখা যায়। এও শোনা যাচ্ছে সারাদেশের ন্যায় হিন্দু বা আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত এলাকা বা গ্রাম দেখে দেখে রাজাকারদের সহায়তায় পাঞ্জাবিরা হানা দিচ্ছে। তারা লাইন ধরিয়ে মানুষকে পাখির মতো গুলি করে মেরে ফেলছে, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছে, যুবতী মেয়ে, সুন্দরী মহিলাদের পাঞ্জাবিদের ক্যাম্পে নিয়ে যাচ্ছে, লুটপাট করছে। আর এসবই হচ্ছে এ দেশের কতিপয় রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীর সহযোগিতায়। দলে দলে লোক পূর্ববঙ্গ থেকে শরণার্থী হিসেবে ওপারে পাড়ি দিচ্ছে। তবে অধিকাংশই হিন্দু জনসাধারণ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী পূর্ববঙ্গের লাখ লাখ মানুষকে আশ্রয় দিয়েছেন, দিচ্ছেন। অনেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। অনেকে যুদ্ধে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অনেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিশেষ প্রশিক্ষণের জন্য ভারত যাচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে আজ সন্ধ্যায় আবার উঠান বৈঠক শুরু হয়েছে সুচিন্তাদের উঠোনে। গ্রামের এক-দু'জন যুবক মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের ইচ্ছে ব্যক্ত করলেন। বেশির ভাগ হিন্দু পরিবারের বক্তার কাছ থেকে সীমান্তের ওপারে চলে যাওয়ার কথা উঠেছে। আজকের সভাপতি গ্রামের আরেকজন মুরব্বি ছাদী মিয়া। গ্রামের হিন্দু জনসাধারণের ভারত চলে যাওয়ার বক্তব্যে তিনি মর্মাহত হলেন। তিনি বললেন-

আমি যতদিন জীবিত আছি আপনারা কেউ ভারত যাবেন না। আপনারা আমার ওপর বিশ্বাস রাখুন, মহান আল্লাহতায়ালা আমাদের সহায় থাকলে আপনাদের কেউ কিছু করতে পারবে না। ছাদী মিয়া গ্রামের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। তিনি ধার্মিক, মানবতাবাদী, পরহিতৈষী, সুবিচারক, সর্বোপরি একজন সজ্জন হিসেবে এলাকায় ব্যাপক পরিচিত। তাঁর কথায় সবাই আশ্বস্ত হলেন আর ভারত চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এলেন।

গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে ছাদী সাহেবের সব সময় ওঠাবসা। সময়-সুযোগ পেলেই তিনি হিন্দুদের বাড়িতে, বিশেষ করে সুচিন্তাদের বাড়িতে যাওয়া-আসা করেন। সুচিন্তার ঠাকুরমা ছাদী সাহেবকে ধর্মের ভাই বানিয়েছিলেন। সেই থেকে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরালো হয়েছে। হিন্দুদের যে কোনো পূজা-অর্চনা, বিয়ে, শ্রাদ্ধ সব ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠানে ছাদী সাহেবের বিশেষ নিমন্ত্রণ থাকে। তাঁর বাড়িতে কোনো প্রোগ্রাম হলেও গ্রামের হিন্দুদের নিমন্ত্রণ থাকে। সারা গ্রামের প্রতিনিধিত্ব তিনিই করেন। কাজেই তাদের রক্ষা করা তাঁর ফরজ হয়ে উঠেছে। তিনি বিভিন্ন দিক চিন্তাভাবনা করেই গ্রামের হিন্দু জনসাধারণের ভারত গমনে বাধা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন-

আপনাদের মারার আগে আমাকে মারতে হবে।

তিনি আরও বললেন-

যে দুয়েকজন রাজাকারের তালিকায় প্রবেশ করেছে তাদেরও একদিন বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে ছাড়বেন। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন-

ভারত যেহেতু আমাদের সঙ্গে আছে সেহেতু দেশ আজ হোক আর কাল হোক, একদিন স্বাধীন হবেই। তখন আমরা এ চিহ্নিত রাজাকারদের সাজা দেব, পাকিস্তান পাঠাব।

গত পরশু বিকেলে রাজাকারদের সহযোগিতায় মুন্সিবাজারের পাশের হিন্দুবহুল হরিশ্বরণ গ্রামে ঢোকে পাঞ্জাবিরা বিখ্যাত শ্রী শ্রী ঠাকুরবাণী পরিবারের সবাইকে লাইনে দাঁড় করিয়েছিল। হঠাৎ তাদের একজন উর্দুতে বলল দ্রুত ক্যাম্পে চলে যেতে, ফলে গুলি করতে পারেনি; অল্পের জন্য ওই পরিবার বেঁচে যায়। শ্রী শ্রী ঠাকুরবাণীই সবাইকে বাঁচিয়েছেন বলে তাদের বিশ্বাস।

গতকাল দুপুরেও সুচিন্তাদের গ্রামের পশ্চিমপাড়ায় ওরা হানা দিয়েছে। তুমুল দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়েছিল। মানুষ যে যেদিকে পারছে লুকিয়ে-টুকিয়ে বেঁচেছে। সুচিন্তাদের পরিবারসহ অনেকেই দৌড়াতে দৌড়াতে গ্রামের পূর্বপাড়ায় ছাদী সাহেবের বাড়িতে গিয়ে উঠেছে।



এ সময় গোঁসাই বাড়ির প্রবীণ নরেন্দ্র গোঁসাই, তার পুত্র নীরদ গোঁসাই পুকুরপাড়ে খলায় ধান মাড়াই করছিল। হঠাৎ অতর্কিত আক্রমণে তারা আর পালাতে পারেনি। গুলি করে বুট দিয়ে লাথি মেরে বাবা- ছেলেকে পুকুরে ফেলে দিয়েছিল হায়েনার দল। এমন সময় তাদের বাড়িতে আশ্রয় নিতে এসেছিল পাশের গ্রামের জগু সরকার, মাথায় লেপ-তোশক, বালিশের বস্তা আর অন্যান্য জিনিসের আরেকটি বস্তা হাতে নিয়ে পুকুরপাড় দিয়ে বাড়িতে ঢোকার সময় এদের গুলি করতে দেখে আর সহ্য করতে পারেনি, এগিয়ে এসে বলেছিল-

এ নিরপরাধ দুই ব্যক্তিকে মারলেন কেন?

সঙ্গে সঙ্গে তাকেও গুলি করে লাথি মেরে পুকুরে ফেলে দেয় হায়েনারা। গোঁসাই বাড়ির গেরস্তের লোক অমিয় দেবমন্দিরের পাশে কলাগাছের ঝোপের ভেতর লুকিয়ে থেকে তাদের তাণ্ডব প্রত্যক্ষ করছিল।

সুচিন্তাদের বাড়ি গ্রামের মধ্যখানে। গ্রামের পশ্চিমপাড়া বাজার-সংলগ্ন। কাজেই পাঞ্জাবিরা যখন গ্রামের দিকে আসে, তখন পশ্চিমপাড়ার লোকজন সুচিন্তাদের বাড়ির দিকে ছুটে আসে।

তখন তারাও অন্যদের সঙ্গে পূর্ব দিকে ছুটতে থাকে। ছাদী সাহেবের বাড়িই সবার আশ্রয়স্থল। তবে মধ্যপাড়া পর্যন্ত পাঞ্জাবির দল এলেও গ্রামের পূর্বপাড়ায় এখনও আক্রমণ করেনি। সম্ভবত রাজাকারদের মাধ্যমে জেনেছে পূর্বপাড়া মুসলিম অধ্যুষিত আর। তাই ওপাড়ায় এখন পর্যন্ত তারা হানা দেয়নি। এজন্য ছাদী সাহেবের বাড়ি হিন্দুদের জন্য নিরাপদ। পাঞ্জাবিরা চলে গেলে তারা আবার যার যার বাড়িতে চলে আসে।

এভাবে কয়েকদিনই হানা দিল পাঞ্জাবির দল। ইতোমধ্যে পাঞ্জাবিরা রাজাকারদের মাধ্যমে জেনে গেছে হিন্দুদের আশ্রয়দাতা হিসেবে ছাদী মিয়ার নাম। গত দু'দিন এই গ্রামে তারা ঢোকেনি। তবে সবাই সজাগ, চকিতচরণ হরিণীর মতো। যে কোনো সময় আক্রমণ করতে পারে হায়েনারা।

আজ সন্ধ্যায় হঠাৎ হইহুল্লোড় শোনা গেল। পশ্চিমপাড়ার পুরুষ, মহিলা, মেয়ে, ছেলেশিশুরা দৌড়াতে দৌড়াতে পূর্ব দিকে ছুটে আসছে। পাঞ্জাবিরা নাকি দ্রুতপদে এগিয়ে আসছে, তা জেনে সুচিন্তার পরিবার ও আশপাশের সবাই ছুটল ছাদী সাহেবের বাড়ির দিকে। ভাগ্য ভালো, এ সময় ছাদী সাহেব বাড়িতেই ছিলেন। তিনি এইমাত্র মসজিদ থেকে মাগরিবের নামাজ পড়ে এসেছেন। গ্রামের সব মানুষ এসে তাঁর বাড়িতে ভিড় করেছে। একসঙ্গে এত মানুষ আশ্রয়ের জন্য এর আগে আর কোনোদিন আসেনি। তিনি চিন্তা করে দেখলেন তাঁর ঘরে কোনোমতেই এত মানুষের স্থান হবে না। তাই তিনি অনুরোধ করে বললেন-

নারী, বালক, বালিকারা শুধু আমার ঘরে আশ্রয় নিতে পারবেন। পুরুষ মানুষ অনুগ্রহ করে অন্যত্র চলে যান।

পুরুষরা আরও পূর্ব দিকে গমন করলেন। ছাদী সাহেব আশ্রিত মহিলা, মেয়ে, ছেলেদের অভয় দিয়ে বললেন-

আপনারা তাড়াতাড়ি আমার ঘরে লুকিয়ে পড়ুন। ওরা আমার বাড়ির দিকেই আসছে। আপনারা ভয় পাবেন না। আল্লাহ আমাদের সহায় হবেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই বেশ কিছু বুটের আওয়াজ পাওয়া গেল। নিশ্চিত মৃত্যু জেনে কেউ কেউ কান্নাকাটি, কেউবা শেষবারের মতো ভগবানকে ডাকতে শুরু করল। ছাদী সাহেবের পরিবারের লোকজনও ভয়ে আল্লাহকে ডাকতে শুরু করলেন। এ ঘরের মহিলারা তো বলেই ফেললেন-

হিন্দু মা-ঝিদের জন্য আজ আমাদেরও মরতে হবে পাঞ্জাবির হাতে।

সবাই শঙ্কিত, তবে সুচিন্তা শঙ্কিত কিনা বোঝা গেল না। মহিলাদের মুখের দিকে তাকানোর পর তার যে হি হি করে হাসি উঠেছিল তা আর থামেনি। তার মা ও ঠাম্মা ফিসফিস করে আসন্ন বিপদের কথা তাকে অনেক বুঝিয়েও হাসি থামাতে পারেননি। কান্নাকাটির শব্দ মোটেও শোনা যাচ্ছিল না বাইরে থেকে। কেবল সুচিন্তার হাসির আওয়াজই শোনা যাচ্ছিল।

ছাদী সাহেবের বাড়ি ঘিরে ফেলল পাকিস্তানি সৈন্যরা। হিন্দু নারী-পুরুষ এই বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে বলে রাজাকাররা দূর থেকে তাদের দেখিয়ে দিয়েছে। একজন সৈন্য ঘরের সামনে এসে টুপি মাথায় পরিহিত ছাদী সাহেবকে উর্দু ভাষায় প্রশ্ন করল-

এটি কি ছাদী মিয়ার বাড়ি? তিনি কি বাড়িতে আছেন?

ছাদী সাহেবও উর্দু ভাষায় উত্তর দিলেন। আর তিনিই যে ছাদী মিয়া তাও অকপটে তাদের জানালেন। পাঞ্জাব সৈন্য বলল-

আমরা জানতে পেরেছি, এই গ্রামের হিন্দু নারী-পুরুষ আপনার বাসায় আশ্রয় নিয়েছে।

ছাদী সাহেব বললেন-

না, তা সঠিক নয়।

তখন আরেক সৈন্য বলল-

আপনার ঘর আমরা চেক করতে চাই।

তখন ছাদী মিয়া মহান আল্লাহতায়ালাকে স্মরণ করে বললেন-

অবশ্যই দেখতে পারেন।

তিনি যে ধার্মিক মানুষ এবং মিথ্যা বলবেন না পাঞ্জাবিরা ইতোমধ্যে বুঝে গেছে।

তারা ঘরে প্রবেশ করবে, এমন সময় টিমলিডার বলল-

প্রয়োজন নেই। চলে এসো। রাজাকারদের তথ্য ভুল ছিল। ঘর থেকে হাসির আওয়াজ আসছে, শুনতে পাচ্ছ না? এখানে হিন্দু পুরুষ-মহিলা নেই। থাকলে পরিবেশ অন্যরকম হতো। চলো চলো। ব্যারাকে দ্রুত ফিরতে হবে।

ছাদী সাহেবের অপূর্ব সাহসী ভূমিকা এবং সুচিন্তার হাসির কারণে গ্রামের ৫০-৬০ জন নারী, মেয়ে, ছেলে, শিশু নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেল। পাঞ্জাবিরা চলে যাওয়ার পর ছাদী সাহেব হাত দুটি উঁচিয়ে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করলেন। এত মানুষকে বাঁচাতে পেরে তিনি আল্লাহকে কৃতজ্ঞতা জানালেন। মানুষকে বাঁচাতে তিনি যে মিথ্যে কথা বলেছেন, তাতে তাঁর কোনো মনস্তাপ নেই। তিনি জানেন আশ্রিত, নিরীহ, অসহায় মানুষকে বাঁচানোর জন্য মিথ্যে বললেও পাপ হয় না। আর পাপ হলেও মহান আল্লাহ মাফ করে দেবেন। এর মধ্যে বিভিন্ন স্থানে লুকিয়ে থাকা পুরুষ মানুষ ধীরে ধীরে এসে জড়ো হলো। ছাদী মিয়া সবাইকে বললেন-

আপনারা এখন নিরাপদ। মহান আল্লাহ আপনাদের রক্ষা করেছেন। আল্লাহ সহায় থাকায় নাতিন সুচিন্তার হাসিটাই আজ আপনাদের বাঁচিয়ে দিল।

তিনি সুচিন্তার মাথায় হাত বুলালেন আর মনভরে দোয়া করে বললেন-

তোর হাসিই মা আজ আমাদের সবাইকে প্রাণে বাঁচাল।

ছাদী সাহেব না বললে সুচিন্তার হাসি যে তাদের বাঁচিয়েছে কেউ বিশ্বাসই করত না। পাঞ্জাবিরা যদি সত্যি সত্যিই ঘরে ঢুকে যেত তাহলে তো সবার সঙ্গে ছাদী সাহেবসহ তাঁর পরিবারের সবাইকে মেরে ফেলত, তা বুঝতে কারও বাকি রইল না।

নিজের ও পরিবারের সবার জীবন বিপন্ন করে বিপদের সময় আশ্রয় দিয়ে এবং অসাধারণ সাহসী ভূমিকা রেখে প্রাণ রক্ষা করার জন্য ছাদী সাহেবকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সুচিন্তার প্রশংসা করতে করতে সবাই নিজ নিজ বাড়ির দিকে প্রস্থান করল।

সুচিন্তাকে আদর করার লোকজনের এখন আর অভাব নেই। এই হাসির জন্য তাকে যারা পছন্দ করত না, এখন তারাও তাকে খুব ভালোবাসে আর তাদের এই আকস্মিক পরিবর্তন দেখে সুচিন্তাও হাসতে থাকে হি হি হি...

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com