শ্রদ্ধাঞ্জলি

স্বকীয় উজ্জ্বলতায় ভাস্বর

প্রকাশ: ২০ মে ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ২০ মে ২২ । ০৩:৫৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

সেলিনা হোসেন

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী (১২ ডিসেম্বর ১৯৩৪ - ১৯ মে ২০২২)

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর ব্যাপ্তি, সৃষ্টি কীভাবে বিশ্নেষণ করব; তাঁকে কীভাবে নির্ণয়ইবা করব একজন ব্যক্তি আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী তাঁর জীবনের গণ্ডি ছাড়িয়ে আমাদের জাতীয় জীবনের অক্ষয় অধ্যায় হয়ে ওঠেন আপন কর্ম ও সৃষ্টিগুণে। তাঁর ব্যাপকত্ব, বিশালত্ব; তাঁর সৃষ্টি, তাঁর কর্ম; তাঁর অক্লান্ত প্রয়াস- এসব কোনো কিছুই সহজে কিংবা ছোট্ট পরিসরে বিশ্নেষণ করে শেষ করার মতো নয়। গতকাল দুপুরে যখন খবর পেলাম- তিনি আর আমাদের মাঝে নেই; মনে হলো, একটা স্তম্ভ ধসে পড়েছে। কিন্তু সান্ত্বনা এখানেই- তিনি আমাদের মাঝে অমর হয়ে থাকবেন তাঁর কর্ম ও সৃষ্টিগুণে।

সাংবাদিক হিসেবে দেশে-বিদেশে তাঁর খ্যাতির সীমানা বিস্তৃত হলেও ছাত্রজীবনেই সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় শুরু হয় তাঁর পরিভ্রমণ। বাঙালি জাতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে তিনি নিজেকে প্রকাশ করেন অন্যভাবে এবং ওই প্রকাশই তাঁর অনেক সৃষ্টিকর্মের মাঝেও একটি নির্দিষ্ট কর্মের জন্য তাঁকে অমর করে রাখবে। বায়ান্নর ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে রচিত তাঁর কবিতা, পরে যেটি সুরারোপিত হয়ে 'একুশের গান' হিসেবে খ্যাতি পায়; এর বিস্তার আজ বিশ্বের দেশে দেশে। কারণ আমাদের একুশে ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বিশ্বের দেশে দেশে পালিত হয় এবং এই গানটি গীত হয়। এ জন্যই তিনি বাঙালির ইতিহাসে অক্ষয় অধ্যায় এবং এখন তা আরও বিস্তৃত পরিসরে।

'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি'- এই গানটিই একুশের মৃত্যুগাথা বা শোকস্তোত্র। ১৯৫২ সালে বাঙালি জাতির যে জাগরণ সূচিত হয়, তা সর্বজনের অন্তরে এবং সর্বকালের জন্য ঠাঁই করে নেয় তখনকার দুই নবীনের কথা ও সুরের সম্মিলনে। সেই থেকে বাঙালির জাতীয় চেতনার বিকাশের প্রতিটি সংগ্রাম ও তার বিভিন্ন উত্থান পর্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর নাম। 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো...' গানটির মধ্য দিয়ে যে মৃত্যুগাথা বা শোকস্তোত্রে বায়ান্নর মর্মন্তুদতা ফুটে উঠেছে, তা আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীকে আরও বরেণ্য করে।

১৯৬৪ সালে সাংবাদিকতা ছেড়ে দিয়ে ব্যবসায় নামার আগে আরও দুটি পত্রিকায় কাজ করেন তিনি। ব্যবসা বলতে তিনি অনুপম মুদ্রণ নামে একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন। আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী ১৯৫৮ সালে বিয়ে করেন। স্ত্রী সেলিমা আফরোজ অবশ্য তাঁর আগেই ২০১২ সালে পরপারে পাড়ি জমান।

শিক্ষাজীবন শেষে কর্মজীবনে সাংবাদিকতার মধ্য দিয়ে তিনি যেভাবে ক্রমেই বিকশিত হয়েছেন, তা তাঁর সাহিত্য প্রতিভাকে অনেকটা চাপা দিয়ে ফেলে। তিনি তো সাহিত্যেও সিদ্ধির পরিচয় দিয়েছিলেন শুরুতেই। কিন্তু সেই সাধনায় তিনি স্থিত হতে পারেননি। দেশ-জাতির প্রয়োজন তাঁকে খুব বেশি টানে প্রভাবসঞ্চারী সাংবাদিকতা পেশায়। এক পর্যায়ে তিনি স্বদেশে-বিদেশে কলাম লিখে খ্যাতি অর্জন করতে থাকনে। তাঁর সমালোচকরাও অপেক্ষা করতেন তাঁর কলামের জন্য। তাঁকে কেউ কেউ বলতেন ঘটনার চলন্ত অভিধান। সবকিছু তাঁর মনে থাকত এবং সময়, জীবন, ইতিহাসের যেসব উদ্ৃব্দতি দিতেন, তা স্মরণশক্তি থেকেই দিতেন; কোনো সঞ্চিত তথ্যভান্ডার থেকে সংগ্রহ করে নয়।

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী ১৯৬৩ সালে ইউনেস্কো পুরস্কার ছাড়াও সাংবাদিকতা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য পেশাগত কাজে সফলতার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক, ইউনেস্কো পুরস্কার, বঙ্গবন্ধু পুরস্কার, মানিক মিয়া পদকসহ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নানা পদক ও পুরস্কারে ভূষিত হন।

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আস্থাভাজন ও ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। ১৯৭৩ সালে তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলজিয়ার্সে ৭২ জাতি জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে সফরসঙ্গী ছিলেন। দেশে ফেরার পর অসুস্থ হলে তাঁকে চিকিৎসার জন্য প্রথমে কলকাতা নিয়ে যান। পরে স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য ১৯৭৪ সালে লন্ডনে যান। প্রবাস জীবনের শুরু সেখানেই।

তাঁর স্পষ্টবাদিতা তাঁকে আরও অনন্য করে তুলেছিল। তাঁর ৮০তম জন্মদিন উদযাপন উৎসবে বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে জাতীয় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, 'যতদিন পারি লিখে যাব।' তাই তো করেছেন। সাতাশি-ঊর্ধ্ব বয়সেও তাঁর কলম চলেছে ক্ষিপ্র গতিতে। গত কয়েক মাস ধরে তাঁর কলাম নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছিল না। কিন্তু সচল জীবনে তিনি থেমে থেকেছেন খুব কম সময়। সম্প্রতি বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ে হাসপাতালগামী হয়েছেন, কিন্তু সেখান থেকে ফিরে এসেই আবার কলম ধরেছেন। তাঁর জীবনসায়াহ্নে কন্যাবিয়োগ তাঁকে খুব কাতর করে ফেলেছিল। তবুও তিনি সবার কাছাকাছি থাকতে চেয়েছেন।

কবি, প্রাবন্ধিক, কথাশিল্পী, নাট্যকার, গীতিকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা ইত্যাদি অভিধায় তিনি ভূষিত হয়েছেন। এক কথায় বলা যায়, তিনি ছিলেন স্বকীয় উজ্জ্বলতায় ভাস্বর অনন্য গুণীজন। তাঁর জীবন অধ্যায় বৈচিত্র্যপূর্ণ ও সংগ্রামমুখর। তাঁর গল্পগ্রন্থ- কৃষ্ণপক্ষ, সম্রাটের ছবি, সুন্দর হে সুন্দর উল্লেখযোগ্য। 'চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান' তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস। তাঁর শেষ রজনীর চাঁদ, নাম না জানা ভোর, নীল যমুনা উপন্যাসও কম আলোচিত নয়। তাঁর রাজনৈতিক নিবন্ধের গ্রন্থও রয়েছে ১০টির মতো। স্মৃতিকথামূলক বইও রয়েছে কয়েকটি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে লিখেছেন ইতিহাসের রক্ত পলাশ :পনেরোই আগস্ট পঁচাত্তর।

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী লন্ডনে প্রবাস জীবন কাটালেও দেশপ্রেম তাঁকে সবসময় মাতৃভূমির দিকেই টেনেছে। তাঁর জীবনপ্রত্যয় ও সাফল্য অনুসরণযোগ্য হয়েই থাকবে। তিনি আমাদের জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন। তিনি ছাত্রজীবন থেকেই জড়িত ছিলেন রাজনীতির সঙ্গে। তিনি যে রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন, সেই দলের সমালোচনা করতেও কুণ্ঠিত হননি। এখানেই তিনি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। সংবাদমাধ্যম, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক বুদ্ধিজীবী পরিমণ্ডলে তিনি থাকবেন চিরভাস্বর। ইতিহাসের বাঁক বদলের সাক্ষী আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

সেলিনা হোসেন: কথাসাহিত্যিক; সভাপতি, বাংলা একাডেমি

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com