ওয়াটার ট্যাক্সি

নগরে বিকল্প পরিবহন

প্রকাশ: ২১ মে ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ২১ মে ২২ । ১১:৫৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

মোশারফ হোসাইন

ছবি :: তৌফিক সুহাশ

রাজধানীর হাতিরঝিলে ২০১৬ সালে যাত্রা করা ওয়াটার ট্যাক্সি সেবা ইতোমধ্যে নগরবাসীর কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। যানজটবিঘ্ন নগরীর যাতায়াত ব্যবস্থায় এ এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আরামদায়ক ও নির্বিঘ্ন ভ্রমণের পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কারণে দিন দিন এই নাগরিক নৌসেবার চাহিদা বেড়েই চলেছে। লিখেছেন মোশারফ হোসাইন

শিক্ষার্থী, কর্মজীবী ও ভ্রমণপিপাসুদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে হাতিরঝিলের 'ওয়াটার ট্যাক্সি সেবা'। ঢাকা শহরের তীব্র যানজটে যখন নগরের বেশিরভাগ মানুষ অতিষ্ঠ, তখন এ শহরেরই একটি অংশের মানুষের কাছে স্বস্তির নাম 'ওয়াটার ট্যাক্সি'। যান্ত্রিক শহরে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা, নারীর ভোগান্তি থেকে শুরু করে নানান জটিলতা থাকে যাতায়াতে। জ্যামে আটকে যখন চাকরিজীবীরা অফিসে দেরিতে পৌঁছাচ্ছেন, শিক্ষার্থীরা যখন সঠিক সময়ে ক্লাসে পৌঁছাতে পারছেন না, তখন শহরের একাংশের মানুষ 'ওয়াটার ট্যাক্সিতে' যাতায়াত করে সময়ের সঠিক ব্যবহার করতে পারছেন।

২০১৬ সালের বিজয় দিবসে রাজধানীর হাতিরঝিলে চালু হয় ওয়াটার ট্যাক্সি সেবা। পরে ২০১৮ সালে এর পরিধি বাড়ানো হয়। যুক্ত হয়েছে নতুন নৌপথ। হাতিরঝিলে এখন পাঁচটি ঘাট- রামপুরা, এফডিসি, গুলশান, বাড্ডা ও পুলিশ প্লাজা। সুবিধাভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাড্ডা, গুলশান, রামপুরা, খিলগাঁওসহ নগরীর পূর্বাংশের মানুষ কারওয়ান বাজার, মগবাজার, দিলু রোড, ইস্কাটন, বাংলামটর, তেজগাঁও এলাকায় সহজে যাতায়াত করতে পারছেন।

সরেজমিন কারওয়ান বাজার (এফডিসি) ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, কেউবা অফিস করছেন এই ওয়াটার ট্যাক্সিতে যাতায়াত করে, শিক্ষার্থীরা যাচ্ছেন স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে। হাতিরঝিলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে অনেক ভ্রমণপিপাসুর কাছেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ওয়াটার ট্যাক্সি সেবা। ইট-পাথরের যান্ত্রিক শহরে ক্লান্তিকে ক্ষণিকের জন্য বিদায় জানাতে বিনোদনের খোঁজে অনেকেই আসেন ওয়াটার ট্যাক্সিতে ঘুরতে।

৩০ টাকার টিকিটে গুলশান-১ থেকে কারওয়ান বাজার এফডিসি পয়েন্টে যেতে সময় লাগে ১৫ মিনিট, বাসে সময় কতক্ষণ লাগবে সেটা অনিশ্চিত। হাতিরঝিল পুলিশ প্লাজা থেকে ২০ টাকার টিকিটে এফডিসি পয়েন্টে যেতে সময় লাগে সর্বোচ্চ ৮ মিনিট। সময় সাশ্রয়ী এই ওয়াটার ট্যাক্সি সেবা যেমন পরিবেশবান্ধব, তেমনি ভ্রমণকালে নিরাপদও বোধ করছেন যাত্রীরা। হাতিরঝিল এলাকায় রামপুরা, গুলশান, পুলিশ প্লাজা ও এফডিসি পয়েন্টে চলাচল করে এই ওয়াটার ট্যাক্সি। জানা গেছে, ৪টি ট্যাক্সি নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও এখন সেই সংখ্যা ১৫। বড় ট্যাক্সি রয়েছে তিনটি। আর ছোট ১২টি। এসব ট্যাক্সিতে আকারভেদে ৩৬ থেকে ৬০ জনের আসন রয়েছে।

সময় সাশ্রয়ী এই বাহনে যাতায়াতের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে শামছুল আলম নামের এক যাত্রী জানান, সারাদিনে অফিসের ক্লান্তি শেষে যখন বাসায় ফিরি তখন মনে হয় আমি বাসায় যাচ্ছি না, ভ্রমণ করছি। পরিবেশবান্ধব এই বাহন ঢাকা শহরের জন্য খুবই দরকার। বাসের জন্য কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকব! জ্যামে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে যায়। তার চেয়ে বরং ওয়াটার ট্যাক্সিতে যাই, আরামদায়ক ভ্রমণও হয়ে যায়, কম সময়ে অফিসে আসি, বাসায় ফিরি। ঢাকা শহরে আর কোথাও যদি এ ধরনের সেবা চালু করা যায়, এতে মানুষের দুর্ভোগ কমে আসবে, যানজট নিরসনে অনেক ভূমিকা রাখবে।

যাত্রী ইকবাল আহমেদ বলেন, আমি নিয়মিত যাতায়াত করি। এটি অত্যন্ত আরামদায়ক একটি বাহন, সময়ের সঙ্গে অর্থটাও বাঁচে। কম টাকায় কম সময়ে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছানোর জন্য ঢাকা শহরের সবচেয়ে সুবিধাজনক যাতায়াত ব্যবস্থা এটি। তবে এ নিয়ে তেমন কোনো প্রচার-প্রচারণা দেখা যায় না। ওয়াটার ট্যাক্সি সেবা নিয়ে প্রচারণা চালালে আরও মানুষ জানতে পারবেন; তারাও যাতায়াতে উদ্বুদ্ধ হবেন।

ওয়াটার ট্যাক্সিতে যাতায়াতকালেই এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় শিরিন আক্তারের। তিনি বলেন, 'প্রায়ই আমি আমার শিশুসন্তান নিয়ে ওয়াটার বাসে যাতায়াত করি, আমার চেয়ে আমার মেয়ের আগ্রহই বেশি এটা দিয়ে যাওয়ার। তিনি সাঁতার জানেন কিনা বা ঝুঁকির কথা মাথায় আছে কিনা- জানতে চাইলে বলেন, বিপদ আল্লাহর হাতে। কখন কী হবে আমরা জানব না। লাইফ জ্যাকেট আছে। যাতায়াত করি, বিপজ্জনক মনে হয় না।'

তবে এ সেবা নিয়ে শিক্ষার্থীদের কিছু অভিযোগও আছে। কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, ওয়াটার ট্যাক্সির সংখ্যা খুব কম। আবার সব ওয়াটার ট্যাক্সি চলে না। প্রায় সময়ই ওয়াটার ট্যাক্সির জন্য অপেক্ষা করতে হয়। ওয়াটার ট্যাক্সির সংখ্যা বাড়ালে যাতায়াত ব্যবস্থাটা আরও ভালো হবে। বিকেল গড়িয়ে এলে ভিড় বাড়ে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটি হয়, কর্মস্থল থেকে মানুষ বাসায় ফেরে। তাই চাপ থাকে বেশি।

সবসময় যাত্রীর ভিড় একই রকম থাকে না। সেই সঙ্গে হাতিরঝিলের দুর্গন্ধ পানি নিয়েও অনেকের অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণে যাত্রীর সাড়া কিছুটা কম। এ প্রসঙ্গে বোটমাস্টার বিধান মজুমদার বলেন, 'যাত্রীরা অনেক সময় পানিতে ময়লা-দুর্গন্ধ থাকায় ট্যাক্সিতে উঠে বিরক্ত হন। কিন্তু আমাদের কিছু করার থাকে না। আবার যাত্রী না ভরলে তো ট্যাক্সি ছাড়া যায় না। অফিস শুরু আর শেষের সময়ে এ সমস্যা হয় না। তখন যাত্রী থাকে কিন্তু অন্য সময়ে যাত্রীসংখ্যা অনেক কম থাকে।' ঘাট-সংশ্নিষ্টরা বলেন, সোনারগাঁও হোটেলের পাশে ঘাট হলে যাত্রীসংখ্যা অনেক বেড়ে যেত। ঘাট দূরে হওয়ায় অনেকে হাঁটতে চান না।

হাতিরঝিল ওয়াটার ট্যাক্সি সার্ভিসের দায়িত্বে রয়েছে করীম গ্রুপ। ঘাট-সংশ্নিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, 'দিন দিন চাহিদা বাড়ছে। মানুষ খুব পছন্দ করে। প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৬০০ মানুষ যাতায়াত করে। আমরা মানুষের পছন্দকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। তবে আশপাশে আবর্জনা থাকায় অনেক দুর্গন্ধ ছড়ায়, এতে যাত্রীদের যেমন অসুবিধা হয়, তেমনি আমাদেরও। এ বিষয়টির প্রতি কর্তৃপক্ষ বা প্রশাসন নজর দিলে আরও পরিবেশবান্ধব হবে এই সার্ভিস।'

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com