অর্থনীতি

ভেবেচিন্তে পা ফেলতে হবে বাজেটপ্রণেতাদের

প্রকাশ: ২২ মে ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ২২ মে ২২ । ০১:৩৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

আতিউর রহমান

এই সময়ে বাজেট প্রণয়ন মোটেও সহজ নয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের বহিঃঅর্থনীতির যে টালমাটাল অবস্থা, তাতে ভেবেচিন্তে পা ফেলতে হবে বাজেটপ্রণেতাদের। স্বদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং এশীয় ও বৈশ্বিক আর্থিক সংকটে বাংলাদেশের উতরে যাওয়ার অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে চলমান সংকটকে সম্ভাবনায় রূপান্তরের বার্তাও আগামী বাজেটে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কেননা, সংকটকালেও স্বদেশি অর্থনীতি পরিচালনার বিরল অভিজ্ঞতার অধিকারী আমরা।

সারাবিশ্ব যখন দুই বছরব্যাপী করোনা সংকট থেকে বের হয়ে এসে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখনই শুরু হয়ে গেল রুশ-ইউক্রেন অনাকাঙ্ক্ষিত যুদ্ধ। করোনার কারণে এমনিতেই বিশ্ব সরবরাহ চেইনগুলো হয়ে পড়েছিল বিপর্যস্ত। জ্বালানির দাম ছিল বাড়ন্ত। জাহাজ পরিবহন খরচও ছিল ঊর্ধ্বমুখী। এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যেই শুরু হলো এই যুদ্ধ। ফলে জ্বালানি তেল, গ্যাস, ভোজ্যতেল, সার, গমসহ বিশ্ব খাদ্য সরবরাহে দেখা দিয়েছে অকল্পনীয় অনিশ্চয়তা। তদুপরি প্রচলিত বিশ্ব আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থা স্যাংকশন পরবর্তী অবস্থায় প্রায় ভেঙে পড়েছে। সুইফট পদ্ধতি রুশদের জন্য বন্ধ। এসবের প্রভাব সারাবিশ্বেই পড়েছে।

আমাদের মতো দেশের খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা বেশ কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি আমদানি ও রপ্তানির সার্বিক মূল্যে ব্যাপক ভারসাম্যহীনতা দেখা দিয়েছে। বাণিজ্য ঘাটতির হাত ধরে চলতি হিসাবেও ঘাটতি বেড়ে চলেছে। খুব স্বাভাবিক নিয়মেই দেশীয় মুদ্রার মানের ওপর চাপ পড়তে শুরু করেছে। চাপ সামলাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ থেকে ডলার ছেড়ে দিচ্ছে। তবে তারও তো একটা সীমা রয়েছে। তাই রিজার্ভ নিয়মিত কমছে।

এই প্রেক্ষাপটে আসন্ন বাজেটটি হতে হবে আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষার বড় নীতি-দলিল। এই বাজেটের মাধ্যমেই সব অংশীজনকে স্থিতিশীলতা রক্ষা করার পদ্ধতি সম্পর্কে নির্দেশনা দিতে হবে। অর্থনীতিতে ডলারের প্রবাহ বাড়ানো এবং অপচয় রোধে সরকার ইতোমধ্যে কিছুটা সংকোচনমুখী নীতি গ্রহণের আভাস দিয়েছে। এই অবস্থানকে স্বাগত জানিয়ে আরও কিছু প্রস্তাবনা এখানে দেওয়া হলো, যেগুলো অর্থনীতিতে বিদেশি মুদ্রা সরবরাহ বাড়াতে পারে :

১. সরকার প্রবাসীদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে যে ইনভেস্টমেন্ট বন্ড এবং প্রিমিয়াম বন্ড বাজারে ছেড়েছে, সেগুলো কেনার প্রক্রিয়া অনলাইনে যতটা সম্ভব সহজ করতে হবে। এই বন্ড কেনার ক্ষেত্রে এক কোটি টাকার সীমানা উঠিয়ে নিলে অনেক সচ্ছল প্রবাসী দেশে আরও বিনিয়োগে উৎসাহিত হবেন। তাদের সহজেই ডিজিটালি ডলার ডিপোজিট হিসাব খোলার সুযোগ এবং ফিক্সড ডিপোজিটে বাড়তি মুনাফা দেওয়ার কথা ভাবা যায়।

২. তরুণদের একটি বিপুল অংশ অনলাইনে আউটসোর্সিংয়ের কাজ করে দেশে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আনছে। দেশে টাকা নিয়ে আসার পদ্ধতিটি আরও সহজ করা গেলে এ খাত থেকে আয় উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বাড়ানো সম্ভব।

৩. যারা বাংলাদেশ থেকে বিদেশে রপ্তানি করছেন, তাঁদের রপ্তানি আয়ের একটি অংশ যে দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে, সেখানে রেখে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। রিটেনশন কোটায় রাখা এই ডলার সাময়িকভাবে হলেও দেশে নিয়ে আসতে রেমিট্যান্সে যেমন প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে, তেমন প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে।

৪. দেশের জাহাজ পরিবহন শিল্প বিকশিত করা গেলে বিদেশি সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে এবং আমদানি পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমানো সম্ভব হবে।

৫. ইতোমধ্যে অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা জোরদার করতে হবে। প্রয়োজনে দামি কিছু বিলাস পণ্য আমদানি কয়েক মাসের জন্য বন্ধ করা যেতে পারে।

৬. এলটিআরের ভিত্তিতে স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্য অর্থায়নকে মধ্য বা দীর্ঘমেয়াদি ঋণে রূপান্তরের সুযোগ আপাতত বন্ধ করা হোক। এলসি করা পণ্য ঠিকঠাক রপ্তানি হচ্ছে কিনা; হলেও তার মূল্য দেশে আসছে কিনা তা কঠোরভাবে মনিটর করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

৭. ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বেশি বেশি ডলার বাইরে পাচারে লাগাম টানতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআরকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

৮. বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে আরও সাশ্রয়ী হতে হবে। এ খাতে আমদানিতে লাগাম টানতে হবে।
উল্লিখিত পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে তা আসন্ন অর্থবছরে আন্তর্জাতিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষা তুলনামূলক সহজ করবে। একই সঙ্গে টেকসই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে মাথায় রেখে আসন্ন বছরের আর্থিক পরিকল্পনা সাজাতে হবে।

প্রথমেই আসে কৃষি খাত। বর্তমান সরকার ধারাবাহিকভাবে কৃষিতে যে ভর্তুকি দিয়ে আসছে তা খুবই কার্যকর ও সময়োচিত বিনিয়োগ। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে কৃষক যেন চাপে না পড়েন, সে জন্য আসছে অর্থবছরে এ খাতে ভর্তুকি তিন গুণ করে ৩০ হাজার কোটি টাকা করা দরকার। পাশাপাশি কৃষি গবেষণা ও উন্নয়নে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ ও কৃষি বিপণন কর্তৃপক্ষগুলোর সক্ষমতা বাড়াতেও কৃষিতে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া দরকার। কৃষি বিপণনে আইসিটির ব্যবহার ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণে দেওয়া প্রণোদনা ইতোমধ্যে সুফল দিয়েছে। এগুলোর আরও প্রসারে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই।

মনে রাখতে হবে, বাজেটের কাটছাঁট যেন স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার মতো খাতগুলোতে নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে। স্বাস্থ্য খাতে গতানুগতিকভাবে বাজেটের ৫ শতাংশ বরাদ্দ না দিয়ে এই অনুপাত আসন্ন অর্থবছরে অন্তত ৮ শতাংশ করতে হবে। পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় বিশেষত চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রেক্ষাপটে যথাযথ মানবসম্পদ উন্নয়ন খুবই জরুরি। এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে আসছে অর্থবছরের বাজেটের ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করতে হবে (চলতি বছরে রয়েছে ১৬ শতাংশ)। বিদ্যমান অবস্থায় কম আয়ের পরিবারগুলো বেশি চাপে পড়ছে। এ জন্য সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে নতুন নতুন সুরক্ষা কর্মসূচি নিতে হবে। চলতি বছরে পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া মাথায় রেখেই সামাজিক নিরাপত্তা বাবদ বাজেটের ১৮ শতাংশ রাখা হয়েছে। আসন্ন অর্থবছরেও এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা চাই এবং সম্ভব হলে ২০ শতাংশে উন্নীত করা চাই।

'মেড ইন বাংলাদেশ' অভিযানকে আরও গতি দিতে দেশি শিল্পায়নে দেওয়া বাজেটারি সুবিধাগুলো আরও কিছু বছর চালু রাখতে হব। আমদানি-বিকল্প শিল্পায়নে কর ছাড়ে কার্পণ্য ঠিক হবে না। মনে রাখতে হবে, আমাদের প্রবৃদ্ধির ৬০ শতাংশেরও বেশি আসে অভ্যন্তরীণ ভোগ থেকে। আর তা মেটায় এসব শিল্প। বাড়ন্ত মধ্য ও উচ্চ আয়ের ভোক্তাদের আমদানি-বিকল্প ভোগ্যপণ্যের জোগানদাতা এসব শিল্পকে বাজেটারি সমর্থন দিয়ে যেতেই হবে।

আসন্ন অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা হতে পারে বলে শোনা যাচ্ছে। এটি জিডিপির ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। চলতি বছরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও জিডিপির ১১ শতাংশের কিছু বেশি। অর্থাৎ জিডিপির শতাংশ হিসেবে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা আসলে কমতে পারে। এমনিতেও বাংলাদেশের মতো একটি বর্ধিষুষ্ণ অর্থনীতির দেশের জন্য কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশের আশপাশে হওয়াটি কাম্য নয়। এই অনুপাত বাংলাদেশের জন্য ১৫ থেকে ২০ শতাংশ হওয়া চাই। এ জন্য এনবিআরের সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে আলাদা নজর দেওয়া দরকার।

সর্বোপরি 'আয় বুঝে ব্যয় করা'ই হতে হবে আসন্ন বছরের আর্থিক নীতির মূল কথা। বিশেষ করে এক্ষুণি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াবে না এমন অবকাঠামো খাতে এ  বছর বাড়তি অর্থ বরাদ্দ না করাই সমীচীন। এই নীতি মেনে সব অংশীজন সুসমন্বিতভাব কাজ করতে পারলে আসন্ন অর্থবছরের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা খুব কঠিন হবে না।

ড. আতিউর রহমান: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর এবং উন্নয়ন সমন্বয়ের সভাপতি

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com