বন্যা

সিলেটের আড়তদারদের শতকোটি টাকার ক্ষতি

প্রকাশ: ২২ মে ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ২২ মে ২২ । ০২:২৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

সমকাল ডেস্ক

কমতে শুরু করেছে সুরমা নদীর পানি। তবে দুর্ভোগ এখনও কমেনি। ছবিটি শনিবার সিলেট নগরীর শেখঘাট ঘাসিটুলা এলাকা থেকে তোলা - ইউসুফ আলী

সিলেট অঞ্চলের পাইকারি বাজারখ্যাত সুরমাতীরের কালীঘাটের কয়েকশ গুদাম বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ায় আড়তদারদের শতকোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এদিকে সিলেটের সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পয়েন্টসহ প্রায় সব পয়েন্টেই পানি কমছে। পাবনার ভাঙ্গুড়ায় স্লুইসগেট দিয়ে বিল অঞ্চলের বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় চার হাজার হেক্টর জমির পাকা ধান তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। সুনামগঞ্জে বন্যার পানিতে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা মাছের ১ হাজার ২৫০টি পুকুর তলিয়ে গেছে। ব্যুরো ও প্রতিনিধিরা এসব খবর দিয়েছেন।

পাবনার ভাঙ্গুড়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের পুঁইবিল স্লুইসগেট দিয়ে বিল অঞ্চলের বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। ফলে ওই এলাকার চার হাজার হেক্টর জমির পাকা ধান তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রকল্পের ভেতর পানি ঢুকে পড়ায় কৃষকরা ধান কাটতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। কিছু কৃষক কোমর পানিতে নেমে ধান কাটছেন। পানির মধ্যে পলিথিনের নৌকায় বোরো ধান পরিবহন করতে দেখা যায়।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, স্লুইসগেটে গেটম্যান না থাকায় ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দিন দিন সেটি অনেকটা অকেজো হয়ে পড়েছে। নতুন করে স্লইসগেট নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। ভাঙ্গুড়া উপজেলার পুঁইবিল কৈচারকোনা বোরো স্কিমের মালিক বকুল সরকার সমকালকে বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় গুমানি নদীর পানি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় স্লুইসগেটের ভাঙা অংশ দিয়ে প্রকল্পের ভেতর পানি যাচ্ছে। এরই মধ্যে তিন শতাধিক বিঘা জমির পাকা ধান তলিয়ে গেছে। শনিবার সকালে পানির গতি আরও বেড়েছে। পুঁইবিল গ্রামের কৃষক আবদুল আলিম সমকালকে বলেন, একদিনে গুমানি নদীর পানি প্রায় দুই হাত বৃদ্ধি পেয়েছে। রাতের মধ্যে স্লুইসগেটের পুরোনো দরজা ভেঙে গেলে ইরি-বোরো প্রকল্প সয়লাব হয়ে যাবে।

উপজেলার তারাপুর গ্রামের কৃষক সোহরাব হোসেন বলেন, খাওয়াসহ জনপ্রতি দৈনিক ৮০০ টাকা দিয়েও প্রয়োজনীয় শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। পাবনা পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী আলা আমিন সমকালকে বলেন, গত বৃহস্পতিবার স্লুইসগেটের দরজা বন্ধ করা হয়েছে। তবে পুরোপুরি বন্ধ না হয়ে থাকলে পানি ঢুকতে পারে। আবার চেক করা হবে বলে তিনি জানান। ইউএনও নাহিদ হাসান খান বলেন, ঘটনাটি শুনেই সেখানে গেছেন তিনি। দ্রুত ব্যবস্থা নিতে কৃষি বিভাগ ও পাউবোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সিলেট অঞ্চলের পাইকারি বাজারের মর্যাদা দখল করেছে সুরমাতীরের কালীঘাট। নদীর উত্তরপাড়ে কালীঘাট, মহাজনপট্টি এলাকায় অধিকাংশ নিত্যপণ্যের ব্যবসায়ীর গদি (পাইকারি পণ্য আড়তদারদের দোকান) রয়েছে। তাঁদের বেশিরভাগের গুদাম বা গোডাউন নদীর তীরে। পার্শ্ববর্তী কাজিরবাজার, শেখঘাট কিংবা দক্ষিণপাড়ে টেকনিক্যাল রোড ও চাঁদনীঘাট মিলে নদীর তীরে ৬-৭ শ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও মিল রয়েছে। সিলেটে ভয়াবহ বন্যায় এসব গদি ও গুদাম পানিতে ডুবেছে। নগরীর এসব এলাকার পাইকারি ব্যবসায়ীরা শতকোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। কালীঘাটে বন্যায় ৫-৭ দিন ধরে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। গদি ও রাস্তায় কমবেশি পানি থাকায় বাকিগুলোতেও স্বাভাবিক লেনদেন বিঘ্নিত হচ্ছে।

শত শত বস্তা চাল, পেঁয়াজ, আলু, আদার মতো পণ্য পানিতে ভিজে নষ্ট হয়েছে। দু'দিন ধরে সুরমায় পানি কমার প্রবণতা দেখা গেলেও পাইকারি বাজারের নিত্যদিনের স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্য ফেরেনি। পাইকারি-আড়তদারি ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি জড়িত কয়েকশ শ্রমজীবী মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।

কালীঘাটের চাল বাজারের মেসার্স দেব কমার্শিয়ালের বাবুল দেব বলেন, ২০০৪ সালের পর এত পানি কখনও হয়নি। তাঁর গুদামের শতাধিক বস্তা চাল পানিতে ভিজে নষ্ট হয়েছে।

কালীঘাট কাঁচামাল আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক খালেদ আহমদ বলেন, কালীঘাটের অধিকাংশ ব্যবসায়ীর গোডাউন সুরমা নদীর তীরে। সেখানে ১২০-১২৫টি আড়তের গোডাউন রয়েছে। হঠাৎ বন্যার পানিতে প্লাবিত হওয়ায় কমবেশি সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রত্যেকের গড়ে ২-৩শ বস্তা পেঁয়াজ বিক্রির অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, অন্তত ৬০ শতাংশ পেঁয়াজ ব্যবসায়ীর পণ্য পানিতে নষ্ট হয়েছে

সুনামগঞ্জে মাছের ১ হাজার ২৫০ পুকুর তলিয়েছে: ভারি বর্ষণ শুরু এবং উজানের ঢলের পানিতে সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার আলীপুরের মাছের খামারি আবদুর রহিমের ৯টি মাছের পুকুর ভেসে যায়। গেল পৌষ মাসে ১০২ বিঘা জমির ৯টি পুকুরে রুই, মৃগেল, কাতল, তেলাপিয়া মাছের লাখো পোনা ছেড়েছিলেন এই খামারি। ঢলের পানিতে তাঁর বেশিরভাগ মাছই ভেসে গেছে। এতে তাঁর প্রায় ৩০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। সেরা খামারি হিসেবে পুরস্কারপ্রাপ্ত আবদুর রহিম জানালেন, কৃষি ব্যাংক থেকে ১২ লাখ টাকা ঋণ তুলেছিলেন এবার। এখন কী করবেন বুঝতে পারছেন না।

কেবল এই মাছের খামারি নয় দোয়ারাবাজারের টেংরাটিলা, আজবপুর, গিরিসনগর, টেবলাই, বৈঠাখাই, পশ্চিম টিলাগাঁওসহ সীমান্তবর্তী এলাকার ৩০টি গ্রামের কয়েকশ খামারির শত শত পুকুর ডুবেছে। সুনামগঞ্জ সদর, শান্তিগঞ্জ ও ছাতক উপজেলার শত শত মাছের খামারির স্বপ্ন ভেঙেছে ঢলে। হাওরাঞ্চলে পাহাড়ি ঢল ও ভারি বর্ষণে ১৯টি হাওরের ফসল নষ্ট হওয়ার পর মাছের খামারের এমন ক্ষতি হাওর অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা সীমা রানী বিশ্বাস বলেন, জেলার ২০ হাজার ৪৬৯টি মাছের পুকুরের মধ্যে ১ হাজার ২৫০টি পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। এতে জেলার ১৬ হাজার ৫০০ খামারির মধ্যে ১ হাজার ১০০ খামারি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রায় তিন কোটি টাকার বড় মাছ ও ৩০ লাখ টাকার পোনা ভেসে গেছে। ১২ লাখ টাকার অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে। সুনামগঞ্জে গত ১৫ দিন ধরে টানা বৃষ্টি হচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যাপক পাহাড়ি ঢল নামছে। এতে জেলার পাঁচটি উপজেলা বন্যাকবলিত হয়েছে। এর মধ্যে ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলা বেশি আক্রান্ত।

সুরমা-কুশিয়ারার সব পয়েন্টে পানি কমছে: সিলেটের সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পয়েন্টসহ প্রায় সব পয়েন্টেই পানি কমছে। গতকাল শনিবার থেকে সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন ৯টি পয়েন্টের মধ্যে ৮টিতে পানি কমতে দেখা গেছে। পাশাপাশি সিলেট নগরীর বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও রাস্তাঘাট থেকেও পানি নামতে শুরু করেছে। তবে এখনও চলাচল ও বাসযোগ্য হয়ে ওঠেনি নগরীর পানিবন্দি এলাকাগুলো। এ জন্য আর এক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে তাঁদের।

গতকাল নগরীর তালতলা, সোবহানীঘাট ও উপশহর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, গত দু'দিনে কম হলেও দুই ফুট পানি কমেছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে এক সপ্তাহের মধ্যে বাসাবাড়ি থেকে পানি নামবে বলে মনে করছেন সংশ্নিষ্টরা।

ছাতকে বন্যায় ব্যবসায়ীদের ক্ষতি দেড় কোটি টাকা: সুনামগঞ্জের ছাতকে পাহাড়ি ঢল ও ব্যাপক বৃষ্টিপাতে বন্যার কারণে উপজেলা সদরসহ বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ফলে শহর ও উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজারের দোকানপাট ও মার্কেটে বন্যার পানি ঢুকে প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও এখনও সুরমা নদীর পানি ৬ দশমিক ০৫ সেন্টিমিটার বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

সুনামগঞ্জে ধান শুকানোর জায়গা নেই: সপ্তাহ দুয়েকেরও বেশি সময় ধরে টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে হাওর ও নদনদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় হাওরবহির্ভূত উঁচু জমির বোরো ধান নিয়ে বিপাকে পড়েছেন সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের কৃষকরা। একদিকে চোখের সামনে তলিয়ে যাচ্ছে পাকা ধান অন্যদিকে শ্রমিক সংকট আর শ্রমিকের বাড়তি মজুরি কৃষকের দুর্ভোগের মাত্রাকে বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েক গুণ।

পানি বাড়ার কারণে একদিকে যেমন জমি তলিয়ে গেছে অন্যদিকে ধান মাড়াই ও শুকানোর কাজে ব্যবহূত খলা (উঁচু কান্দা) পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। ফলে ধান মাড়াই ও শুকানোর জন্য স্থানীয় সড়কগুলো একমাত্র ভরসা। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ার কারণে রোদের দেখা না পাওয়ায় ধান শুকাতে পারছেন না কৃষক। ধান মাড়াইয়ের পর খড় শুকাতে না পারার কারণে গো-খাদ্য তৈরির প্রক্রিয়াও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এদিকে দীর্ঘদিন ধরে ধান স্তূপাকারে রাখার কারণে অঙ্কুরিত হয়ে চারা গজাচ্ছে।

ফেঞ্চুগঞ্জে বন্যার অবনতি: অব্যাহত বর্ষণ আর উজানের নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হুহু করে কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। এতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বিভিন্ন গ্রাম। ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষাদান কার্যক্রম। গ্রামের রাস্তাঘাট, ঘরবাড়িতে পানি প্রবেশ করায় দুর্ভোগে পড়েছে বাসিন্দারা। গতকাল পর্যন্ত উপজেলার নতুন করে প্লাবিত হওয়াসহ বিপৎসীমার ওপর প্রবাহিত হচ্ছে কুশিয়ারা নদীর পানি। পানির বৃদ্ধির ফলে উপজেলা সদরের আশপাশের আবাসিক এলাকায় বন্যার পানি ঢুকতে শুরু করেছে।

কোম্পানীগঞ্জে ত্রাণের প্যাকেট নিয়ে মারামারি: সিলেটের সীমান্তবর্তী উপজেলা কোম্পানীগঞ্জে অন্তত ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছেন। এর মধ্যে ১২০ জনের তালিকা করে ত্রাণের প্যাকেট বিতরণের উদ্যোগ নেয় উপজেলা প্রশাসন। কিন্তু ত্রাণপ্রত্যাশী প্রায় ৩০০ লোক জমায়েত হয় অনুষ্ঠানস্থলে। গতকাল সকালে উপজেলা পরিষদে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধনও করেন স্থানীয় এমপি, প্রবাসী ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমদ। কিন্তু তিনি চলে যাওয়ার ৫ মিনিটের মধ্যে ত্রাণ বিতরণে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। ত্রাণপ্রত্যাশী ও প্রশাসনের লোকদের মধ্যে হাতাহাতি ও মারামারির কারণে ত্রাণ বিতরণ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ত্রাণপ্রত্যাশীদের ওপর লাঠিচার্জ করলে ৪-৫ জন আহত হন।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com