মতামত

পাকিস্তানে শাসকরা মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেন না কেন?

প্রকাশ: ২২ মে ২২ । ১৮:২৭ | আপডেট: ২২ মে ২২ । ১৯:৪৬

আজাদ খান ভাসানী

সম্প্রতি ইমরান খানের অপসারণে আবারও আমরা পাকিস্তানের রাজনীতিতে আমেরিকার হস্তক্ষেপ অবলোকন করলাম।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ০+০=০ তত্ত্বের কথা নিশ্চয়ই আমাদের মনে আছে। মূলত এই তত্ত্বের মধ্য দিয়েই পাকিস্তানের রাজনীতিতে আমেরিকার প্রভাব বলয় পাকাপোক্ত হয়েছিল। আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্র এবং যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা ভূলুণ্ঠিত করে প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী সেদিন নগ্নভাবে পাকিস্তান-মার্কিন সামরিক জোট সিয়াটো, স্যান্টোর পক্ষাবলম্বন করেছিলেন। সেই থেকে পাকিস্তানের ললাটে মার্কিন আধিপত্যের প্রভাব বিরাজ করছে। অপরদিকে ভারত জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্র নীতি অবলম্বন করে তার সুফল ভোগ করে আসছে।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পরও বস্তুত নিজেদের মধ্যে অন্তঃকলহ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন, জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্র নীতি এবং পশ্চিম পাকিস্তানের এক ইউনিট বাতিল ইস্যুগুলো উপেক্ষিত থেকে যায়। অথচ অনেক স্বপ্ন আর আশা নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ এসব ইস্যুর পক্ষে আওয়ামী লীগ ও যুক্তফ্রন্টকে ভোট দিয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে মুসলিম লীগের ভুল রাজনীতির বৃত্ত থেকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টও বেরিয়ে আসতে পারল না। ফলে জনমনে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। 

শুরুটা হয়েছিল মওলানা ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অনুপস্থিতিতে ৩০ মে গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ কর্তৃক ৯২-ক ধারা জারি করে হক মন্ত্রিসভা বহিস্কারের মধ্য দিয়ে। তখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বগুড়ার মোহাম্মদ আলী, যিনি এর আগে একজন ঝানু আমলা ও মার্কিন রাষ্ট্রদূত ছিলেন। লিয়াকত আলী খান ও খাজা নাজিমুদ্দিনের পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বগুড়ার মোহাম্মদ আলীর নিযুক্তিও ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি ঘুঁটি। সোহরাওয়ার্দী কিছুদিন সেই ঘুঁটি সরকারের আইনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। যদিও এই মোহাম্মদ আলী একসময় সোহরাওয়ার্দীর একান্ত সচিব হিসেবেও কাজ করেছেন। তারপর অনেক জল গড়িয়ে কেন্দ্রে ও পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠিত হলো। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৫৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করলেন। কিন্তু ক্ষমতায় আরোহণ করেই তিনি মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় যেন অধিক মনোযোগী হলেন। প্রথমে সুয়েজ খাল জাতীয়করণের বিরুদ্ধে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সদ্য উত্থিত দেশগুলোর জোট নিরপেক্ষতার বিপক্ষে অবস্থান নিলেন। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল শাসকশ্রেণি ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থসিদ্ধি হওয়ার পর যথারীতি এক বছর এক মাসের মাথায় ১৯৫৭ সালের ১৭ অক্টোবর তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।

১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনকে ঘিরে ভাসানী-সোহরাওয়ার্দী বিরোধ প্রকাশ্যে চলে আসে। বিশেষ করে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতি প্রশ্নে সোহরাওয়ার্দীর নমনীয়তা এবং মওলানা ভাসানীর অনড় অবস্থান তৎকালীন পাকিস্তানের রাজনীতিতে আলোড়ন সৃষ্টি করে। ঢাকার এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী ঘোষণা করেন পূর্ব পাকিস্তান ৯৮ ভাগ স্বায়ত্তশাসন অর্জন করেছে। এ ছাড়া ১৯৫৬ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্র সভায় পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তির পক্ষে এবং জোট নিরপেক্ষতাকে বিদ্রুপ করে তার কুখ্যাত ০+০=০ (শূন্যের সঙ্গে শূন্য যোগ করলে ফলাফল শূন্যই হয়) তত্ত্ব হাজির করেন। মওলানা ভাসানী তা মেনে নিতে পারলেন না। প্রকাশ্যেই এর বিরোধিতা করেন। এরই পরিপ্রক্ষিতে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে দল দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি 'ন্যাপ' গড়েন। ওই কাগমারী সম্মেলনেই মওলানা ভাসানী পশ্চিম পাকিস্তানকে 'আসসালামু আলাইকুম' জানিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজমন্ত্র বপন করেছিলেন। 

সাতচল্লিশ থেকে একাত্তর, একাত্তর থেকে দুই হাজার বাইশ- পাকিস্তানের রাজনীতি আজও সেই ভুল বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। পরিহাসের বিষয়, ৭৫ বছরের ইতিহাসে আজ পর্যন্ত পাকিস্তানের কোনো প্রধানমন্ত্রী তার দায়িত্বপ্রাপ্ততার মেয়াদ পরিপূর্ণ করতে পারেননি। সম্প্রতি ইমরান খানের অপসারণে আবারও আমরা পাকিস্তানের রাজনীতিতে আমেরিকার হস্তক্ষেপ অবলোকন করলাম।

ধারণা করা যায়, বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনকে ঘিরে আমেরিকা নানা ছক কষছে। নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় দেশে দেশে তাঁবেদার সরকার প্রতিষ্ঠায় তারা সিদ্ধহস্ত। আমাদের দেশে যে অংশগ্রহণমূলক অবাধ নির্বাচন জরুরি, তা নিয়ে দ্বিমতের সুযোগ নেই। আমাদের সবকিছু ভাবতে হবে আমাদের প্রেক্ষাপটেই।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com