ছুরি-ব্যাট দিয়ে স্ত্রী ও ২ সন্তানকে খুন করেন স্বামী

প্রকাশ: ২২ মে ২২ । ১৯:৫৬ | আপডেট: ২২ মে ২২ । ২০:২১

নরসিংদী ও বেলাব প্রতিনিধি

আটক শেখ গিয়াসউদ্দীন

এক ঘরের মেঝেতে মায়ের রক্তাক্ত লাশ। অন্য ঘরে শিশু দুই সন্তানের নিথর দেহ। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আপনজন বাবার হাতেই নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার হলো দুই শিশু সন্তানসহ তাদের মা। মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে বেলাব উপজেলার ভাবলা গ্রামে। শনিবার রাতের কোনো একসময় ঘাতক স্বামী শেখ গিয়াসউদ্দীন ছুরি-ক্রিকেট খেলার ব্যাট দিয়ে কুপিয়ে ও পিটিয়ে স্ত্রী রহিমা বেগম (৩৬), ছেলে শেখ রাব্বি (১৩) ও মেয়ে রাকিবাকে (৬)  হত্যা করেন।

স্ত্রী-সন্তানদের হত্যা করে গাজীপুরে রংমিস্ত্রির কাজ করার কারণে বাড়িতে ছিল না বলে নাটক সাজায় গিয়াস উদ্দীন। শুধু নাটকই সাজায়নি, প্রতিবেশী রেনু শেখই তার স্ত্রী-সন্তানদের হত্যা করেছে বলে পুলিশের কাছে অভিযোগ করে গিয়াসউদ্দীন ও তার পরিবার। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি গিয়াসউদ্দীনের। পিবিআইয়ের কাছে অবশেষে নিজেই স্বীকার করেছেন স্ত্রী-সন্তানদের হত্যা করার কথা।

জানা যায়, নিহত গৃহবধূ রহিমা আক্তার নিজ বাড়িতে দর্জির কাজ করতেন ও নিহত শিশুসন্তান রাব্বি শেখ পার্শ্ববর্তী মনোহরদী উপজেলার মনারটেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থী ও মেয়ে রাকিবা শেখ ভাবলা সরকারি প্রাথমিক বিদালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী।

লোমহর্ষক এই হত্যাকাণ্ডে এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ঘটনাস্থলে পুলিশ, সিআইডি, ডিবি, পিবিআই কর্মকর্তারা পরিদর্শন করেছেন। এ রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত পুলিশ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নিহতের স্বামী গিয়াসউদ্দীনকে আটক করেছে। এ ঘটনায় এখনো থানায় কোনো মামলা দায়ের করা হয়নি। তবে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে নিশ্চিত করেছে পিবিআই নরসিংদী।

নিহতদের স্বজনের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে আশপাশের পরিবেশ

সরেজমিনে দেখা যায়, গ্রামের এক পাশে শেখ গিয়াস উদ্দীনের বাড়ি। কাছাকাছি কোনো বাড়িঘর নেই। গিয়াসউদ্দীনের বাড়ি ঘিরে রয়েছে পুলিশ, ডিবি, পিবিআই, সিআইডিসহ হাজার হাজার মানুষ। পশ্চিম পাশের ঘরটি মাটির তৈরি। এ ঘরের মেঝে পড়ে আছে গৃহবধূ রহিমার রক্তাক্ত লাশ। তার মাথা, কপাল ও পেটে ধারালো অস্ত্রের আঘাত।

দক্ষিণের ঘরে নিহত রহিমার ১৩ বছর বয়সী শিশুসন্তান শেখ রাব্বির রক্তাক্ত দেহ পড়ে আছে। রাব্বির পাশেই ৬ বছর বয়সী কন্যাশিশু রাকিবার নিথর দেহ। ঘাতক গিয়াসউদ্দীন স্ত্রী রহিমা ও ছেলে রাব্বিকে ছুরি দিয়ে আঘাত করে ও মেয়ে রাকিবাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন।

ঘটনার পর থেকে ঘাতক গিয়াস উদ্দীন ও তার পরিবারের সদস্যরা ঘটনাটি অন্যদিকে নিতে পুলিশ, সাংবাদিক ও এলাকায় প্রচার করেন প্রতিবেশী আব্দুর রহমানের ছেলে রেনু মিয়ার সঙ্গে গিয়াসউদ্দীনের জমি ও একটি কাটা গাছ নিয়ে দ্বন্দ্ব কয়েকদিন ধরে। রেনু মিয়া সম্পর্কে গিয়াস উদ্দীনের চাচাতো ভাই। গিয়াস উদ্দীনের বাড়ি থেকে বের হতে হলে রেনু মিয়ার জমির ওপর দিয়ে বের হতে হয়।

দুই-তিন দিন আগে গিয়াসউদ্দীন তার ঘরের পেছন থেকে একটি গাছ কাটে। উক্ত গাছ যাতে রেনু মিয়ার জমির ওপর দিয়ে না নেওয়া হয় এ নিয়ে শনিবারকে রেনু মিয়ার সঙ্গে ঝগড়া হয় গিয়াস উদ্দীনের। এ সময় রেনু মিয়া গিয়াসউদ্দীনের বড় ক্ষতি করবে বলে হুমকিও দেয়। এ কারণে রেনু মিয়াই ভাড়াটিয়া কিলার দিয়ে তাদের পরিবারের তিনজনকে হত্যা করেছে বলে মিথ্যা নাটক সাজায়।

কিন্তু পিবিআই পুলিশের সন্দেহ হলে গিয়াসউদ্দীনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটকের বেরিয়ে আসে হত্যার আসল রহস্য। পিবিআই জানায়, স্বামী গিয়াস উদ্দীন তার স্ত্রী রহিমা বেগম, ছেলে রাব্বি শেখ ও মেয়ে রাকিবাকে ছুরি এবং ক্রিকেট খেলার ব্যাট দিয়ে হত্যা করার কথা স্বীকার করেছে। গিয়াসউদ্দীনের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী পিবিআই পুলিশ হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরি ও ব্যাটটি উদ্ধার করেছে।

নিহতদের দেখতে এলাকাবাসীর ভিড়

প্রত্যক্ষদর্শী বিলকিছ বেগম জানান, নিহত রহিমা বাড়িতে দর্জির কাজ করত। রোববার সকাল ৬টায় আমি কাপড় বানানোর জন্য তার বাড়িতে যাই। এ সময় দেখি ঘরের দরজা খোলা। ঘরের মেঝে রহিমার রক্তাক্ত লাশ। এ সময় আমি ভয়ে চিৎকার দিলে আশেপাশের মানুষ ছুটে আসে।

ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে শেখ গিয়াস উদ্দীনের বড় ভাই শেখ নাসির উদ্দীন জানান, শনিবার ভাই গিয়াস উদ্দীন গাজীপুরে কাজে চলে যাওয়ার সময় আমাকে বলে গিয়েছে আমি যেন তার বাড়ির দিকে একটু খেয়াল রাখি। কিন্তু রাতেই ঘাতকরা ছোট ভাইয়ের বউ ও আমার ভাতিজাদের হত্যা করল। প্রতিবেশী রেনু মিয়ার সঙ্গে আমাদের দ্বন্দ্ব। গতকালকেও (শনিবার) সে আমার ভাইকে হুমকি দিয়েছে। আমাদের ধারণা রেনু এ কাজ করেছে।

নিহত গৃহবধূর ছোট ভাই মোশারফ হোসেন কান্নাজড়িত কণ্ঠে সমকালকে জানান, আমার বোন ও দুই ভাগনে-ভাগনিকে যারা নৃশংসভাবে হত্যা করেছে আমি তাদের ফাঁসি চাই।

বেলাব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাফায়েত হোসেন পলাশ বলেন, খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে এসেছি। লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হবে। হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিহত গৃহবধূর স্বামীকে আটক করা হয়েছে।

ঘটনাস্থলে থাকা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) সাহেব আলী পাঠান জানান, ঘটনাস্থলে এসে ঘটনার সত্যতা পেয়েছি। হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।

জেলা পিবিআই পুলিশ সুপার এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, গিয়াসউদ্দীন আমাদের কাছে তার স্ত্রী ও এক ছেলে ও এক মেয়েকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি ও ক্রিকেট ব্যাট উদ্ধার করা হয়। গিয়াসউদ্দীন বলছে, প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন তিনি। তার এ কথা কতটুকু সত্য তা এখনো বলা যাচ্ছে না। আমরা জানতে পেরেছি গিয়াসউদ্দীন জুয়া খেলা, মাদকে আসক্ত ছিল।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com