সমাজ

ধরুন, সবার হাতেই বন্দুক আছে

প্রকাশ: ২৫ মে ২২ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইকরাম কবীর

১৯৮২ থেকে ১৯৯০। এরশাদের আধিপত্যের যুগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ছিল আগ্নেয়াস্ত্রে ভরপুর। ব্যবহার-অপব্যবহার- দুটোই চালু ছিল। হাবাগোবা আমরা দেখতাম সেই আগ্নেয়াস্ত্রের যথেচ্ছ ব্যবহার। এক রোদজ্বলা দুপুরে আমরা টিএসসির বারান্দায় খই ভাজছি, এক বন্ধু এসে ফিসফিসিয়ে জানাল, সে এক নেতার কাছ থেকে একটি রিভলবার ধার করে এনেছে। বলার সময় তাঁর লালচে চেহারা আরও লালচে হয়ে গেল। সে আমাদের অস্ত্রটি দেখাতে চায়। উত্তেজনায় থরথর করছে সে।

কথা শুনে আমরাও একই উত্তেজনায় কেঁপে সড়াৎ করে উঠে দাঁড়ালাম। এরচেয়ে সাহসী ঘটনা এ জীবনে আর ঘটতেই পারে না! বন্ধু আমাদের এক এক করে প্রক্ষালন কক্ষে নিয়ে গিয়ে বন্দুকটি দেখাল। ছুঁতেও দিল। কার্তুজ নেই। তা ছাড়া বন্দুকে জং ধরেছে। কার্তুজ থাকলেও কাউকে গুলি করে জখম করা বা মেরে ফেলা যাবে না।

আমাদের উত্তেজনার কারণ ছিল। আমরা চেয়ে চেয়ে দেখতাম সারাক্ষণ যাঁদের বন্দুক হাতে থাকত, তাঁরা অসম্ভব রকমের উদ্ধত-আকর্ষণীয় একটা ঢঙে হাঁটাচলা করতেন। অত্যন্ত স্মার্ট যাঁকে বলে। চারদিকে হাজারো ছাত্রছাত্রী এবং তাঁদের মধ্যে শুধু তাঁরাই স্মার্ট। কী অপরূপ আত্মবিশ্বাস ওই বন্দুকওয়ালাদের!

বলুন আকাঙ্ক্ষা কার না থাকে?

আমাদেরও ছিল; আমাদের বন্ধুরও ছিল। তাই থরথরিয়ে, তড়াং করে উঠে দাঁড়িয়ে জং ধরা বন্দুকে হাত রেখেই নিজেকে স্মার্ট মনে করার চেষ্টা।

নিজেকে স্মার্ট মনে করতে পারা এক ধরনের শিল্প। এর সঙ্গে আগ্নেয়াস্ত্র যোগ হলে তো কথাই নেই।

যেমনটা দেখেছি আশির দশকের শুরুতে চুয়াডাঙ্গা-কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ অঞ্চলে অপরাধ-জর্জরিত তথাকথিত বাম আন্দোলনের সময়। সত্তরের দশক দেখার এবং বোঝার অভিজ্ঞতা আমার নেই, তবে বিভিন্ন লেখা পড়ে জেনেছি- শুরুটা সেই দশকেই। প্রতি সপ্তাহেই কোনো না কোনো কমরেডের প্রাণহীন দেহ রাস্তায় পড়ে থাকত। অজ্ঞাত ঘাতকের বন্দুকের গুলিতে তাঁরা মারা যেতেন।

ওই যুগে সব কমরেডের হাতেই বন্দুক থাকত। তাঁরা বন্দুক ছাড়া বিপ্লব ঘটাতে পারবেন বলে বিশ্বাস করতেন না। যেই কমরেডের নিথর দেহ পড়ে থাকত তিনিও বন্দুকধারী। বন্দুক সঙ্গে থাকা সত্ত্বেও তিনি আরেক বন্দুকধারীর গুলি থেকে বাঁচতে পারেননি। কিছুটা শুনে এবং মাঝে মাঝে সেই দেহগুলো দেখে আমরা 'ওয়েস্টার্ন' সিনেমার কথা ভাবতাম। দু'জনের হাতেই বন্দুক- যে বেশি তাড়াতাড়ি চালাতে পারে সেই জিতে যায়। একেই বলে সমানে সমান, কিন্তু কেউ কেউ সমানের চেয়ে একটু বেশি।

বলে রাখি, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাঁদের গুলি খেয়ে মৃত্যুবরণ করতে দেখেছি, তাঁদের বেশিরভাগই বন্দুকহীন ছিলেন। কোমর থেকে বন্দুক বের করে নিজেকে যে বাঁচানোর চেষ্টা করবেন তার উপায় ছিল না।

ঠিক ওই অসময়েই এই চিন্তাটি আমাদের মস্তিস্কে খেলেছিল। সবার হাতে যদি বন্দুক থাকত, তাহলে বন্দুকধারী ঘাতক কি আরেকজনের দিকে গুলি করতে সাহস করত?

সেই সময়, সাহিত্যের ছাত্র হিসেবে লক্ষ্য করেছিলাম- আমাদের পাঠ্য কাব্য, গল্প, উপন্যাস, নাটক, কবিতা- সবই ভয়ংকর রক্ত ঝরানো সংঘাত, যুদ্ধ ও গণহত্যার উপাখ্যান, যা আমাদের পড়ে, বিশ্লেষণ করে পরীক্ষার খাতার প্রশ্নের উত্তর লিখতে হবে। সংঘাতগুলোতে নানারকমের অস্ত্রের ব্যবহার। হাতুড়ি, তলোয়ার, বন্দুক, কামান, মেশিনগান, ট্যাঙ্ক ইত্যাদি।

যুদ্ধের সময় সৈন্য সৈন্য লড়াই হবে; একে অপরকে আক্রমণ করবে; মারবে, জিতবে। ইতিহাস ঘাঁটলে তাই-ই জানা যায়। তবে যুদ্ধের পর বিজয়ীরা বিজিতদের ওপর যে অত্যাচার, হত্যা, ধর্ষণ এবং ডাকাতি চালাত- তা চিন্তা করলে নিজেকে পাশবিক পূর্বপুরুষদের উত্তরাধিকারী বলে মনে হয়। তাঁরা নিরস্ত্র মানুষদের অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ করতেন।

মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, সাধারণ মানুষের হাতেও যদি অস্ত্র থাকত তাহলে অন্য অস্ত্রধারীরা এই পাশবিক কাণ্ডগুলো চালানোর সাহস পেত? হয়তো না।

অবশ্য এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া খুব সহজ নয়। গেল ইউনিয়ন পরিষদ ভোটের সময় সারাদেশে প্রতিদ্বন্দ্ব্বী এবং সমর্থক মিলিয়ে একশরও বেশি মানুষ গুলি খেয়ে এবং অন্য অস্ত্রের আঘাতে মারা গেছেন। আমরা এখনও জানি না, যাঁরা মারা গেছেন তাঁদের হাতেও আগ্নেয়াস্ত্র ছিল কিনা।

তবে দুটো বিষয় এখানে পরিস্কার, রাজনৈতিক কর্মীরা নিজ দলের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে ও অপরাধীরা অপকর্ম এবং খুন করতে বন্দুক ব্যবহার করে। আরেকদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মীরা বন্দুক ব্যবহার করেন যেন অপরাধীদের হাতে থাকা অস্ত্রগুলো অন্যান্য সামাজিক বিপদ না তৈরি করে।

রাজনীতি এবং যুদ্ধ বাদ দিয়ে এবার একটু ব্যক্তি পর্যায়ের সংঘর্ষের দিকে তাকাই। একজন মানুষের আরেকজনকে খুন করার জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নানা ধরনের অস্ত্রের প্রয়োজন হয়। খালি হাতে বা বিষ খাইয়ে কাউকে মারা একটু কঠিন। আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে আরও তাড়াতাড়ি মেরে ফেলা যায়। যে ব্যক্তি খুন হলেন, তাঁর হাতেও যদি মারণাস্ত্র থাকত তাহলে তাঁর খুনিরা কি তাঁকে খুন করতে উদ্যত হতো? হয়তো হতো। তবে সেই ক্ষেত্রে ঘটনাটি একপক্ষীয় থাকত না। বিষয়টি তখন লড়াইয়ের পর্যায়ে চলে যেত- সমানে সমান।

সমাজে বন্দুক ব্যবহারের অনুমতি মেলে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কারণে। অনেক দেশ আছে, যেমন- আমেরিকায় নিজের নিরাপত্তার জন্য যে কেউই বন্দুক কিনে কাছে রাখতে পারে। তবে আমাদের মতো দেশে আগ্নেয়াস্ত্রের উচ্চমূল্যের কারণে শুধু ধনীরাই অস্ত্রধারী হতে পারে। অস্ত্রের মূল্য এমনভাবে নির্ধারণ করা হয় যেন গরিব মানুষ তা কিনতে না পারে। গরিবের হাতে অস্ত্র থাকলে মহাবিপদ হবে।

আগ্নেয়াস্ত্র আসলে নিষ্ঠুরতা এবং হিংস্রতার এক প্রতীক, যা অন্যান্য নিষ্ঠুরতাকে প্রতিহত করার জন্য ব্যবহার করা হয়। এই নিষ্ঠুরতাকে আমরা 'অপরাধ' বলে ডাকি। তবে একটি অস্ত্রমুক্ত সমাজের স্বপ্ন দেখার কথা ভাবা যেতে পারে। আমরা কি অস্ত্রহীন একটি পরিণত সমাজ গড়তে পারতাম, যেখানে রক্তপাত নেই, রক্তারক্তির হানা-পাল্টা হানা নেই? কারও হাতে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র নেই? অস্ত্র না থাকলে মানব কি সংঘাত-সংঘর্ষে নিজেকে জড়াবে না? যার শারীরিক বল আছে, সে শারীরিকভাবে দুর্বলকে ঘায়েল করবেই, নিষ্ঠুরতা প্রকাশ করবেই। তবে সেক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক মৃত্যুর আশঙ্কা কম।

ধরুন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছাড়াও কিছু মানুষের হাতে বন্দুক আছে। অনেকেই অস্ত্র নিয়ে আইনবহির্ভূতভাবে ঘোরাফেরা করে। আমার মনে হয় তারা ভাগ্যবান এবং বিশেষ অধিকারপ্রাপ্ত। তারা পারে, আর কেউ পারে না। তারা এই অস্ত্র দেখিয়ে এবং ব্যবহার করে ধর্ষণ, খুন, রাহাজানি, জখম- সবই করতে পারে। অস্ত্র ব্যবহারের বলি যাঁরা হলেন তাঁরা কিছুই বলতে পারেন না।

তাহলে আমাদের সবার হাতে বন্দুক নেই কেন? যদি থাকত, তাহলে কী হতো? মানুষে মানুষে শক্তির সমতা কি তৈরি হতে পারত? আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে যেসব অপরাধ ঘটে তা নিশ্চয়ই ঘটত না। নারীরা যদি একটি করে বন্দুকের মালিক হতেন তাহলে যৌন সন্ত্রাসীরা কি কোনো নারীকে আক্রমণ করতে সাহস পেত? ধর্ষক তুমি যতই শক্তিশালী হও, নারীর হাতে কার্তুজের আগুন থাকলে তুমি আর আক্রমণ করতে সাহস পাবে না। তোমার অপরাধ নারী রুখে দিতে পারবেন।

সবার হাতে বন্দুক থাকলে এক ধরনের ইতিবাচক অস্ত্র ব্যবসার প্রচলন হতে পারত। একে ঘিরে একটা বড় অর্থনীতির ক্ষেত্রও তৈরি হতো। অপরাধ কমে যেত। সমাজ কিছুটা শান্ত হতো।

তাহলে বলুন, আমরা কী চাইতে পারি? হয় সারাবিশ্বে কারও কাছেই অস্ত্র থাকবে না; না হয় সবাই-ই অস্ত্রধারী হবেন। এই লেখাটি আমাদের দেশে এক ধরনের প্রলাপ মনে হতে পারে, তবে বিশ্বের অনেক দেশেই আলোচনাটি চলছে। আসুন আমরা আরও বেশি আলোচনা করি বিষয়টি নিয়ে। কোনটি বেশি স্মার্ট তা বোঝার চেষ্টা করি।

ইকরাম কবীর :গল্পকার ও সংযোগ পেশায় নিয়োজিত

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com