সিলেট ও সুনামগঞ্জ শহরে বন্যা

ময়লার দুর্গন্ধ ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে বাড়ছে ডায়রিয়া

প্রকাশ: ২৫ মে ২২ । ২১:৪৫ | আপডেট: ২৫ মে ২২ । ২১:৪৫

সিলেট ব্যুরো ও সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

সিলেট নগরীর কিছু এলাকা থেকে পানি নামার পর নতুন দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। রাস্তায় ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকায় দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। বিশেষ করে সেপটিক ট্যাঙ্কের ময়লার দুর্গন্ধে শহরবাসীর নাভিশ্বাস উঠেছে। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট। এ কারণে নগরীতে ডায়রিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। এদিকে সুনামগঞ্জ পৌরসভা থেকে পানি নেমে গেলেও কাঁচা ঘরবাড়ির বাসিন্দাদের দুর্ভোগ বেড়েছে। পচা দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে দুর্ভোগে পড়েছে মানুষ। এ পানিতে গোসল করলে শরীর চুলকায়; অ্যালার্জির মতো গোটা বের হয়। ঘরে ঘরে জ্বর ও ডায়রিয়া দেখা দিচ্ছে। পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুসহ নানা বয়সী মানুষ।

সিলেটে বন্যার পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিয়েছে ডায়রিয়ার প্রকোপ। দুই সপ্তাহ আগে বন্যা শুরুর পর নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়িতে পানি প্রবেশ করে। অনেক ঘরের ভেতর হাঁটু ও কোমরপানি উঠে যায়। বিশেষ করে নগরীর বাসাবাড়ির সেপটিক ট্যাঙ্ক বন্যার পানিতে তলিয়ে একাকার হয়ে পড়ে। বাসাবাড়ি, সড়ক হয়ে ওঠে দুর্গন্ধময়।

সরেজমিন দেখা যায়, সিলেট নগরীর কিছু এলাকার বাসাবাড়ি থেকে পানি নামলেও নিম্নাঞ্চলে এখনও সমস্যা রয়ে গেছে। দুর্গন্ধের কারণে নগরীর কিছু এলাকায় বাসিন্দাদের নাকে রুমাল দিয়ে চলাফেরা করতে হচ্ছে। জীবন-জীবিকার তাগিদে ময়লা পানি মাড়িয়ে অনেকে বাসাবাড়ি থেকে বের হচ্ছে। ময়লা ও নোংরা পানির দুর্গন্ধে পানিবাহিত সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।

সিলেট সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বন্যা শুরুর পর থেকে বুধবার পর্যন্ত সিলেটে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে ৪৩১ জন। এর মধ্যে কেবল বুধবারই বিভিন্ন উপজেলায় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৫২ জন। আক্রান্তদের মধ্যে বেশিরভাগ সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকার। ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আউটডোরেও প্রতিদিন পানিবাহিত রোগ নিয়ে লোকজন আসছে।

সিভিল সার্জন ডা. এসএম শাহরিয়ার সমকালকে বলেন, পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে ইতোমধ্যে ১৪০টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। এসব টিমের সদস্যরা বিভিন্ন উপজেলায় বন্যার্তদের সেবায় কাজ করছেন।

সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. বিশ্বনাথ পাল সমকালকে বলেন, এই মুহূর্তে শিশু ও ছাত্রছাত্রীদের এসব পানি থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করতে হবে। দুটি বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। প্রথমত, কষ্ট করে হলেও বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ময়লা ও নোংরা পানি মাড়িয়ে গেলে দ্রুত সাবান দিয়ে পরিস্কার করতে হবে। বিশেষ করে শিশুদের ময়লা পানি থেকে অবশ্যই দূরে রাখতে হবে।

তিনি বলেন, এই সময়ে চর্মরোগ বেশি হয়ে থাকে। হাসপাতালের আউটডোরে এ রকম রোগী এখন খুব বেশি আসছে। এর মধ্যে শিশুর সংখ্যা বেশি। তিনি বলেন, এই সময়ে কেবিস রোগ খুব বেশি হয়ে থাকে। এ ছাড়া ছত্রাকজনিত রোগও হয়। তাই দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে।

সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম জানান, নগরীতে ডায়রিয়ার প্রকোপ রোধে কাজ করছে তাদের মেডিকেল টিম। এ ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন হেলথ ক্যাম্প পরিচালনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বন্যার কারণে অনেক স্থানে টিউবওয়েল ডুবে যায়। অনেক ক্ষেত্রে সাপ্লাইয়ের পানিও হয়তো দূষিত হয়ে পড়েছে। এ দূষণ ৫-৭ দিন থাকতে পারে। প্রতিটি ওয়ার্ডের কাউন্সিলরের কাছে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট আছে। প্রয়োজনে সেখান থেকে ট্যাবলেট সংগ্রহ করা যেতে পারে।

সুনামগঞ্জেও দুর্গন্ধ, রোগব্যাধি

সুনামগঞ্জ শহরের পশ্চিম হাজীপাড়া, নবীনগর, পূর্ব-পশ্চিম নতুনপাড়া, কালীপুর, হাছনবসত, সুলতানপুর, শান্তিবাগ এলাকায় পচা ও জমাট বাঁধা পানি দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এ কারণে পানিবাহিত রোগবালাই বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। টানা ১৫ দিন ভারি বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলে সুনামগঞ্জ সদর, দোয়ারাবাজার ও ছাতক উপজেলার বেশিরভাগ এলাকা ডুবে গিয়েছিল। চার দিনের রোদে পরিস্থিতি বদলেছে। তবে বন্যাপরবর্তী দুর্ভোগ থামেনি।

সুনামগঞ্জ পৌরসভার মধ্য শহর থেকে বর্ধিত এলাকার কোথাও কোথাও কোমরপানি ছিল। ঢলের পানি ঘরবাড়ি থেকে নেমেছে। তবে কাঁচা ঘরবাড়ির বাসিন্দাদের দুর্ভোগ বেড়েছে। একই সঙ্গে পচা দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে দুর্ভোগের পড়েছে মানুষ। গত চার দিন বৃষ্টিপাত না হওয়ায় স্বস্তি ফিরলেও পানিবাহিত রোগের আতঙ্ক আছে অনেক এলাকায়।

সুনামগঞ্জ শহরতলির কালীপুর এলাকার দেওয়ান আলী বলেন, ঢেউয়ের পানিতে শহরের বিভিন্ন এলাকার ময়লা পলিথিনের প্যাকেট কালীপুর-হাছনবসত এলাকার বাড়িঘরের উঠোন ও সড়কে আসছে। ঘরে ঘরে জ্বর-ডায়রিয়া দেখা দিচ্ছে। পানিবাহিত রোগে শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে বেশি।

একই এলাকার বাসিন্দা আকলিমা বেগম বললেন, ক্ষেতের ড্যাংগা পচে ও ঢলের সঙ্গে ময়লা-আবর্জনা এসে পানি নষ্ট হয়ে গেছে। পানি যতই কমছে ততই দুর্গন্ধ বাড়ছে। এ পানিতে গোসল করলে শরীর চুলকায়; অ্যালার্জির মতো গোটা বের হয়। গোসল না করেও উপায় নেই।

জেলার দোয়ারাবাজার হাসপাতালের উপসহকারী মেডিকেল অফিসার ডা. হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, বুধবার হাসপাতালের আউটডোরে অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে পানিবাহিত রোগীর সংখ্যা বেশি ছিল। দোয়ারাবাজার উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়া টিউবওয়েলের পানি বিশুদ্ধকরণ না করেই পান করছে অনেকে।

সুনামগঞ্জ জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কাসেম বলেন, সুনামগঞ্জ সদর, দোয়ারাবাজার ও ছাতকের সহস্রাধিক টিউবওয়েল ডুবে ছিল। সেগুলো মেরামত করে পানি বিশুদ্ধকরণ করে ব্যবহার উপযোগী করতে কাজ করছেন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের কর্মীরা। যেসব টিউবওয়েল বিকল হয়নি, সেগুলো থেকে পানি সরার সঙ্গে সঙ্গে এক বালতি পানির মধ্যে ২০০ গ্রাম ব্লিচিং পাউডার মিশিয়ে ৫-৭ মিনিট চাপ দিয়ে পানি বের করে ফেলে দিলেই টিউবওয়েলটির পানি বিশুদ্ধকরণ হয়ে যাবে। মাটির নিচের পানি কখনোই দূষিত হয় না। পাইপের পানি পরিস্কার করে টিউবওয়েলের পানি খেতে বাধা নেই।

সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বুধবার পেটের অসুখ নিয়ে ৪১ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি ছিল বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. রফিকুল ইসলাম।

সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. আহম্মদ হোসেন বলেন, খাবার পানি বিশুদ্ধকরণে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন কমিউনিটি ক্লিনিকে পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট সরবরাহ করা হয়েছে।

এদিকে বন্যার পানি কমলে নাগরিকদের পরবর্তী সমস্যায় করণীয় ঠিক করতে সভা করেছে সুনামগঞ্জ পৌরসভা। সেখানে বন্যার পানিতে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা দ্রুত পরিস্কার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মেয়র নাদের বখত বলেন, বন্যাপরবর্তী নানা রোগবালাই দেখা দিতে পারে। ঢলের সঙ্গে আসা ময়লা-আবর্জনা ভাসছে। যতই দিন যাচ্ছে, ততই পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। ময়লা-আবর্জনা দ্রুত সরানোর কাজ শুরু হবে। প্রয়োজনসাপেক্ষে ব্লিচিং পাউডার ছিটানো হবে।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com