বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা: ইউজিসিকে তৎপর হতে হবে

প্রকাশ: ২৮ মে ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ২৮ মে ২২ । ০২:৫৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পাদকীয়

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা কার্যক্রম সম্পর্কে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২০ সালে পরিচালিত এবং সম্প্রতি প্রকাশিত এক সমীক্ষার বরাত দিয়ে শুক্রবার সমকালের এক প্রতিবেদনে যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে তা নিঃসন্দেহে হতাশাব্যঞ্জক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজেদেরই দেওয়া তথ্য থেকে বিবিএস জানতে পেরেছে, দেশের ২৪টি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা খাতে এক টাকাও খরচ করেনি। শুধু তাই নয়, কিছু বিশ্ববিদ্যালয় জমি কেনা ও ভবন নির্মাণের মতো সম্পর্কহীন খরচও গবেষণা খাতে দেখিয়েছে। দেশে গবেষণা খাতে বরাদ্দ অপ্রতুল বলে বহু বছর ধরেই আলোচনা আছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি এ খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেওয়ার জন্য সরকারের ওপর যেমন চাপ বাড়ছে, তেমনি সরকারও গবেষণায় বর্ধিত হারে অনুদান প্রদানে এগিয়ে আসার জন্য বিভিন্ন বেসরকারি উদ্যোক্তার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে। আর এমন এক সময়ে প্রকাশিত হলো গবেষণা কাজে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এমন উদাসীনতার চিত্র। যদি অল্প বরাদ্দই খরচ করা না যায়, তাহলে গবেষণা খাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অধিক বরাদ্দ দিতে সমাজে কেন উৎসাহ সৃষ্টি হবে? তাই বিবিএস উদ্ঘাটিত এই তথ্য অতীব উদ্বেগজনক।

গবেষণার প্রতি এমন উদাসীনতা প্রদর্শনকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নাম বিবিএস প্রকাশ না করলেও তাদের সমীক্ষা থেকে এটা জানা গেছে যে, ওই ২৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আটটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আর ১৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। অর্থাৎ গবেষণার প্রতি অবহেলা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশি দেখা যায়। এ ধারণাটা আরও বদ্ধমূল হয় যখন বিবিএসের ওই সমীক্ষায় বলা হয় যে, জমি কেনা বা ভবন নির্মাণের মতো উচ্চ ব্যয় গবেষণা খাতে দেখানোর প্রবণতা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেই বেশি। আমরা জানি, দেশের কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা কাজে ইতোমধ্যে শুধু জাতীয় নয় আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বেশ সুনাম অর্জন করেছে। তা সত্ত্বেও বিবিএসের সমীক্ষায় বর্ণিত গবেষণা কাজে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশি অমনোযোগী হওয়ার বিষয়টা এখানে তুলে ধরা হলো; কারণ এ অবস্থা যদি চলতে থাকে তাহলে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সম্পর্কে এ খাতের যাত্রা থেকেই প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার চেয়ে ব্যবসার প্রতি বেশি মনোযোগী বলে যে সাধারণ সমালোচনা আছে তা-ই আরও শক্তিশালী হবে। এমন অবস্থা উচ্চশিক্ষা বিস্তারে প্রচুর সম্ভাবনাময় এ খাতটির জন্য তো বটেই, দেশের সামগ্রিক উচ্চশিক্ষা খাতের জন্যও শুভকর হবে না।

একথা নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই যে, যেখানে শিক্ষার অন্যান্য স্তরে জ্ঞান বিতরণই মুখ্য কাজ সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ হলো জ্ঞান বিতরণের পাশাপাশি জ্ঞান সৃজন। আর গবেষণাই হলো জ্ঞান সৃজনের প্রধান উপায়। তাছাড়া যে কোনো দেশের সমাজ-অর্থনীতি-সংস্কৃতি তথা সামগ্রিক জনজীবনের চাকা সচল রাখতে হলে নতুন নতুন উদ্ভাবন ও গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। এ কাজে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেই নিতে হয়। এর পাশাপাশি এটাও মনে রাখা প্রয়োজন, বাংলাদেশ শুধু একটা উন্নয়নশীল দেশ নয়, এর অর্থনীতি বিশ্বের সবচেয়ে গতিশীল অর্থনীতিগুলোর একটি; স্বল্প সময়ের মধ্যে দারিদ্র্য বিমোচন করে ২০৪১ সালের মধ্যে একটা উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া তার লক্ষ্য। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এ লক্ষ্য অর্জন করতে হলে যে উন্নত জ্ঞান, প্রযুক্তি- সর্বোপরি জনবল প্রয়োজন তার জন্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখায় প্রচুর নিজস্ব গবেষণা দরকার। বলাবাহুল্য, বিশেষজ্ঞদের মতে, ওই জ্ঞান-প্রযুক্তি ও জনবল সৃষ্টি করতে না পারলে বাংলাদেশকে অন্য অনেক দেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের 'ফাঁদে' আটকে থাকতে হবে। তাই, বিবিএসের ওই সমীক্ষাকে একটা জেগে ওঠার আহ্বান হিসেবে নিয়ে এখনই রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের তৎপর হতে হবে। তাঁদের একদিকে গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ানোর জনদাবির প্রতি দ্রুত সাড়া দিতে হবে, আরেকদিকে এ অর্থের সঠিক ব্যবহারের বিষয়টিও নিবিড়ভাবে তদারকি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আমরা বিশেষভাবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) কথা বলব দেশের সব পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো-মন্দ দেখভাল করা যাদের দায়িত্ব।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com